এপ্রিল ২৪, ২০১২ ১০:৪৩ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসিরবিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা আন নিসার ৬৪ থেকে ৬৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৬৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَحِيمًا (64)

"আমরা সব নবী রাসূলকেই এ উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছি যে, আল্লাহর নির্দেশে মানুষ তার আনুগত্য করবে। যদি তারা নিজেদের ওপর জুলুম করার পর অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে আপনার কাছে তথা মুহাম্মদ(সা.)'র কাছে আসে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, আর রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে তারা আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও দয়াময়রূপে পাবে।" (৪:৬৪)

গত কয়েকটি পর্বে আমরা বলেছি, মোনাফিকরা বিচারক হিসেবে রাসূলকে মনোনীত না করে বিধর্মীদের কাছে বিচারের জন্য যেত৷ এ আয়াতে বলা হয়েছে বিভিন্ন বিষয়ে মহানবী (সা.)'র আনুগত্য করাই জনগণের দায়িত্ব। মহানবী (সা.) শুধু আল্লাহর বাণী প্রচারের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নন, তিনি একইসঙ্গে রাষ্ট্রেরও প্রধান৷ তাই মুসলমানদের উচিত সব বিষয়ে একমাত্র তাঁরই আনুগত্য করা, অন্যদের নয়।

উল্লেখ্য, রাসূল (সা.)'র আনুগত্য করা আল্লাহরই নির্দেশ। কারণ, আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কারো আনুগত্য করা হলে তা হবে শির্ক ও কুফুরী কাজ৷ অবশ্য নবীরা আল্লাহর নির্দেশের বিরোধী কোন নির্দেশ দেন না। এরপর বলা হয়েছে, রাসূলের নির্দেশ অমান্য করার গোনাহ মোচনের জন্য আগে মহানবী (সা.) এর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে, এরপর মহানবী (সা.) তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলে তখনই আল্লাহ ঐ ক্ষমা গ্রহণ করবেন। এ আয়াত শুধু যে রাসূল (সা.)'র যুগের জন্য প্রযোজ্য তা নয়, এই আয়াতের নির্দেশ সব যুগের জন্যেই প্রযোজ্য। এ যুগেও কেউ যদি আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ অমান্য করার কারণে অনুতপ্ত হয়ে মহানবী (সা.)'র মাজারে যায় এবং তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে মহানবীকে অনুরোধ করে তাহলে মহানবী (সা.)'র শাফায়াতের ওসিলায় তার তওবা কবুলের সম্ভাবনা রয়েছে৷

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,

প্রথমত : ধমীয় নেতাদের অনুসরণের মধ্যেই রয়েছে মানুষের মুক্তি৷ নামাজ ও মুক্তির জন্যে শুধু মৌখিক ঈমানই যথেষ্ট নয়, ধর্মীয় নেতাদের আনুগত্য করাও জরুরী।

দ্বিতীয়ত : নবীদের দেখানো শিক্ষা ও আদর্শ থেকে দূরে সরে গিয়ে জালেম বা বিজাতীয়দের শরণাপন্ন হওয়া নিজের ওপরই জুলুম মাত্র৷ এটা নবী বা ধর্মীয় নেতাদের প্রতি জুলুম নয়।

তৃতীয়ত : আল্লাহর প্রিয় বান্দা বা অলী আওলিয়াদের মাজার জিয়ারত করা এবং গোনাহ মোচন ও সুপারিশের জন্য তাঁদেরকে ওসিলা করা পবিত্র কোরআনেরই পরামর্শ।

সূরা নিসার ৬৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا (65)

"হে নবী আপনার প্রতিপালকের শপথ, তারা কখনও ঈমানদার হতে পারবেনা, যে পর্যন্ত তারা আপনাকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিচারক না করে এবং আপনার সিন্ধান্ত সম্পর্কে তাদের মনে কোন অনীহা বা দুঃখ না থাকে এবং যে পর্যন্ত তারা আপনার বিচারকে সম্পূর্ণরূপে মনে প্রাণে মেনে নেয়৷" (৪:৬৫)

আগের আয়াতে বিজাতীয়দের কাছে বিচারপ্রার্থী না হতে মুমিনদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং বিচারের জন্য মহানবীর কাছেই যেতে বলা হয়েছে৷ এই আয়াতে বলা হচ্ছে, বিচারের জন্য শুধু রাসূলের কাছে গেলেই চলবে না৷ তিনি বিচারের যে রায় দিবেন, সে ব্যাপারে মুখে কোন বিরোধীতা তো দূরে থাক অন্তরেও কোন ব্যথাও অনুভব করা যাবে না ৷ কারণ, ন্যায় বিচারের রায় যে পক্ষের জন্য ক্ষতিকর হয় সে পক্ষ প্রায়ই অন্তরে ব্যাথা অনুভব করে থাকে৷ ইতিহাসে এসেছে, একবার মহানবীর দুই সাহাবীর মধ্যে খেজুর বাগানে পানি সেচ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। তারা ঘটনার বিচার করতে রাসূল (সা.)'র কাছে আসেন। কিন্তু রাসূলের বিচারের রায় ওই দুই সাহাবীর মধ্যে যে সাহাবীর বিপক্ষে গেল সেই সাহাবী রাসূল (সা.) কে এই বলে অভিযুক্ত করল যে, আত্মীয়তার কারণেই তিনি অন্য সাহাবীর পক্ষে রায় দিয়েছেন৷ উল্লেখ্য, অন্য সাহাবী সত্যিই রাসূল (সা.)'র আত্মীয় ছিলেন। মহানবী (সা.) সাহাবীর এই কথা শুনে অত্যন্ত ব্যথিত হলেন এবং তাঁর চেহারার রং পাল্টে যায়। আর এ সময়ই এই আয়াত নাজেল হয় মুসলমানদের প্রতি সাবধানবাণী নিয়ে।

সূরা নিসার ৬৬ থেকে ৬৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,

وَلَوْ أَنَّا كَتَبْنَا عَلَيْهِمْ أَنِ اقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ أَوِ اخْرُجُوا مِنْ دِيَارِكُمْ مَا فَعَلُوهُ إِلَّا قَلِيلٌ مِنْهُمْ وَلَوْ أَنَّهُمْ فَعَلُوا مَا يُوعَظُونَ بِهِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ وَأَشَدَّ تَثْبِيتًا (66) وَإِذًا لَآَتَيْنَاهُمْ مِنْ لَدُنَّا أَجْرًا عَظِيمًا (67) وَلَهَدَيْنَاهُمْ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا (68)

"যদি আমি তাদের আদেশ দিতাম যে তোমরা নিহত হও অথবা নিজ আবাসস্থল ত্যাগ কর, তাহলে তাদের অল্প সংখ্যকই তা করত। যে বিষয়ে তাদের বলা হয়েছিল, তা যদি তারা করত, তাহলে তা নিশ্চয়ই তাদের জন্য বেশী কল্যাণকর হত ও তাদের ঈমানও সুদৃঢ় হতো।"(৪:৬৬)

"এ অবস্থায় আমরা তাদেরকে আমার কাছ থেকে বৃহত্তর পুরস্কার দিতাম।"(৪:৬৭)

"এবং নিশ্চয়ই তাদেরকে মুক্তির পথ প্রদর্শন করতাম।"(৪:৬৮)

আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এসব আয়াতে সেইসব লোকদের উদ্দেশ্যে কথা বলা হয়েছে, যারা মহানবীর ন্যায় বিচারে মনে কষ্ট পেয়েছে। তাদেরকে বলা হচ্ছে আমরা তো তোমাদের কাঁধের ওপর কষ্টকর দায়িত্ব ও সমস্যার বোঝা চাপিয়ে দেইনি যে, তোমরা দুঃখ বা ক্ষোভ অনুভব করছ! অতীতে অন্য নবীদের উম্মতকে যেমন ইহুদীদেরকে বাছুর পূজার কাফফারা হিসেবে মৃত্যুর বিধান দিয়েছিলাম এবং তাদের বলেছিলাম নিজ মাতৃভূমি বা স্বদেশ থেকে বেরিয়ে যাও যাতে তোমরা গোনাহ থেকে পবিত্র হতে পার। যদি এমন নির্দেশ তোমাদের দেয়া হত তাহলে তোমাদের মধ্যে কম লোকই তা পালন করতে৷ এরপর মুসলমানদের বলা হচ্ছে যদি আল্লাহর নির্দেশ মান, তাহলে তাতে তোমাদেরই কল্যাণ হবে। কারণ, এতে একদিকে যেমন সঠিক সরল তথা মুক্তির পথ পাবে, তেমনি তাতে আরো অটল থাকবে এবং কিয়ামতেও তোমরা আল্লাহর কাছ থেকে মহাপুরস্কার লাভ করবে। #