সূরা আন নিসা; আয়াত ৮৩-৮৫ (পর্ব ২৩)
পবিত্র কুরআনের তাফসিরবিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা আন নিসার ৮৩ থেকে ৮৫ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৮৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَإِذَا جَاءَهُمْ أَمْرٌ مِنَ الْأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُوا بِهِ وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنْبِطُونَهُ مِنْهُمْ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لَاتَّبَعْتُمُ الشَّيْطَانَ إِلَّا قَلِيلًا (83)
"মোনাফিকদের কাজের ধরন হলো, যখনই শান্তি ও নিরাপত্তা এবং পরাজয় বা ভয়ের কোন সংবাদ তাদের কাছে পৌঁছে তখনই তারা তা রটনা করে, অথচ যদি তারা রাসূলের কাছে কিংবা নেতৃস্থানীয় মুসলমানদের কাছে এসব সংবাদ পৌঁছে দিত, তাহলে বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ লোকেরা সংবাদগুলোর সত্যতা বুঝতে পারত। তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা না হতো, তাহলে তোমাদের অল্প ক'জন ছাড়া সবাই শয়তানের অনুসরণ করতে।" (৪:৮৩)
আগের কয়েকটি আয়াতে ইসলামের প্রাথমিক যুগে মহানবী (সা.) ও মুসলমানদের সঙ্গে মোনাফিকদের বিদ্বেষী আচরণ সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে। এই আয়াতেও মোনাফিকদের অন্য একটি অন্যায় আচরণের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বিভিন্ন গুজব রটনা করা বিশেষ করে যুদ্ধের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে গুজব রটনা ছিল মোনাফিকদের অন্যতম কাজ৷ এ ধরনের গুজব প্রচারের ফলে অনেক সময় মানুষ অযথাই ভীত হয়ে পড়তো, অথবা অবাস্তব ধরনের নিরাপত্তা অনুভব অনুভব করতো বা অতিরিক্ত আশাবাদী হয়ে উঠতো। এরপর ইসলামী সমাজের নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে জনগণকে একটি সামগ্রিক নির্দেশ দিয়ে বলা হচ্ছে, রাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয়ে মুসলিম জনগণের উচিত নেতৃবৃন্দের শরণাপন্ন হওয়া এবং গুজব জাতীয় সংবাদও তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া যাতে তারা সঠিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জনগণকে সত্য বা বাস্তবতা জানাতে পারেন।
এরপর এই আয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে বলা হয়েছে, মোনাফিকদের এই পদ্ধতি মানুষকে খোদাদ্রোহীতা ও শয়তানের অনুসরণের দিকে টেনে নিচ্ছিল এবং আল্লাহর অনুগ্রহ ও মহানবী (সা.) এর পথ নির্দেশনা না থাকলে অধিকাংশ মানুষই পথভ্রষ্ট হতো। অর্থাৎ যে কোন সংকট বা সমস্যার সময় তারা শয়তানের কু-মন্ত্রণার শিকার হতো।
এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে,
প্রথমত: মানুষের মধ্যে গুজব ছড়ানো মোনাফিকদেরই কাজ। তাই গুজব সম্পর্কে সাবধান থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত: মুসলমানদের সামরিক বিষয় সম্পর্কিত সংবাদ তাদের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত।
তৃতীয়ত: শুধুমাত্র সুবিবেচক ও গভীর দৃষ্টির অধিকারী মানুষই সত্য উপলদ্ধি করতে পারে। সাধারণ মানুষের উচিত তাদের অনুসরণ করা।
সূরা নিসার ৮৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,
فَقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا تُكَلَّفُ إِلَّا نَفْسَكَ وَحَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ عَسَى اللَّهُ أَنْ يَكُفَّ بَأْسَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَاللَّهُ أَشَدُّ بَأْسًا وَأَشَدُّ تَنْكِيلًا (84)
"হে নবী! আল্লাহর পথে যুদ্ধ করুন, মুমিনদেরকেও এ ব্যাপারে উৎসাহ দিন, আপনাকে শুধু নিজের কাজের জন্যই দায়ী করা হবে। অচিরেই আল্লাহ কাফেরদের শক্তি সংযত করবেন। আল্লাহ শক্তিতে প্রবল এবং শাস্তিদানে কঠোর।" (৪:৮৪)
ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, ওহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের পর আবু সুফিয়ান পরবর্তী হামলার সময় নির্ধারণ করে৷ নির্দিষ্ট সময়ে মহানবী (সা.)ও মুসলমানদেরকে অগ্রসর হবার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু ওহুদ যুদ্ধে পরাজয়ের তিক্ত স্মৃতির কারণে বহু মুসলমান এই নির্দেশ পালন করেনি। আর এই পটভূমিতেই নাজেল হলো এ আয়াত। এ আয়াতে রাসূল (সা.)কে বলা হলো, ‘এমনকি কেউ না আসলেও আপনি সেনাবাহিনী সংঘবদ্ধ করা ও যুদ্ধ ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। একইসঙ্গে আপনি মুসলমানদেরকে জিহাদে অংশ নেয়ার আহ্বান জানানোর কাজও অব্যাহত রাখুন।' মহানবী (সা.)ও তাই করলেন। অল্প সংখ্যক মুসলমানও তাঁর সাথে অগ্রসর হলেন। কিন্তু নির্দিষ্ট যুদ্ধ ক্ষেত্রে শত্রু বাহিনী উপস্থিত হল না এবং কোন সংঘর্ষও হয়নি। এভাবে মুসলমানদের উপর কাফেরদের আঘাত প্রতিরোধ করার খোদায়ী ওয়াদা বাস্তবায়িত হয়েছিল। এই আয়াতে শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে,
প্রথমত: সংগ্রাম ও বিপদের সময় সমাজের নেতাকেই সবার আগে অগ্রসর হতে হবে। এমনকি তিনি যদি এ পথে সম্পূর্ণ একাকীও হন, তাহলেও তাকে সংগ্রাম করতে হবে।আর এ অবস্থায় আল্লাহর পক্ষ থেকেও তার কাছে সাহায্য পৌঁছবে।
দ্বিতীয়ত: নবীগণের দায়িত্ব হলো, জনগণের কাছে ধর্ম ও ধর্মীয় বিধানের দায়িত্ব পৌঁছে দেয়া। তাদের উপর কিছু চাপিয়ে দেয়া নবীগণের দায়িত্ব নয় ৷
তৃতীয়ত: প্রত্যেকেই তার নিজের কাজের জন্য দায়ী। এমনকি নবীগণও মানুষের কাজ কর্মের জন্য দায়ী নন। নবীগণ শুধু তাদের নিজ দায়িত্বের ব্যাপারেই দায়ী।
চতুর্থত: খোদায়ী শক্তি সবচেয়ে বড়, অবশ্য এই শক্তির সাহায্য পাবার শর্ত হলো, মানুষকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
সূরা নিসার ৮৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,
مَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً حَسَنَةً يَكُنْ لَهُ نَصِيبٌ مِنْهَا وَمَنْ يَشْفَعْ شَفَاعَةً سَيِّئَةً يَكُنْ لَهُ كِفْلٌ مِنْهَا وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ مُقِيتًا (85)
"যে কেউ ভালো কাজের সুপারিশ করবে, এর পুরস্কারে তার অংশ থাকবে৷ আর যে মন্দ কাজের উৎসাহ দেয়, তাতেও অর্থাৎ ঐ কাজের শাস্তিতে তার অংশ থাকবে। আল্লাহ সব কিছুর ওপর নজর রাখেন।" (৪:৮৫)
আগের আয়াতে মুমিনদেরকে জিহাদের দিকে আহ্বানের ব্যাপারে মহানবী (সা.)কে দায়িত্বশীল বলে উল্লেখ করার পর এ আয়াতে একটি সার্বজনীন বিধানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শুধু মহানবী নয়, প্রত্যেকেই অন্যদেরকে ভালো কাজের দিকে আহ্বানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং এ আহ্বান হতে হবে ভালো পন্থায়। অবশ্য প্রত্যেকেই শুধু তার নিজ কাজের জন্যই দায়ী। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, সমাজের ভালো মন্দ বা অন্যদের ব্যাপারে উদাসীন থাকতে হবে ৷
ইসলাম ব্যক্তি কেন্দ্রীক ধর্ম নয় যে, সবাই শুধু নিজের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত থাকবে এবং অন্যদেরকে সত্যের দিকে আহ্বান করা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ব্যাপারে উদাসীন থাকবে। সৎকাজের আদেশ দেয়া ও অসৎকাজের ব্যাপারে নিষেধ করা প্রত্যেক মুসলমানেরই দায়িত্ব। প্রত্যেকেরই উচিত নিজের জীবনে, পরিবারে, নিজ কর্মস্থলে, নিজ মহল্লায় এবং নিজের আওতাভুক্ত এলাকায় এই দায়িত্ব পালন করা। মানুষ শুধু নিজ কাজেরই পুরস্কার বা শাস্তি পাবে না, অন্যদের ভালো বা মন্দ কাজের উৎসাহদাতা হিসাবে তাদের পুরস্কার ও শাস্তিরও অংশ বিশেষ তার প্রাপ্য।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে,
প্রথমত: দু'জন মুসলমানের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টি, সমবায়, সমাজে ভালো কাজে সহায়তা করা, কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধে মুসলমানদের সাহায্য করা-এসব হলো সৎকাজের কিছু দৃষ্টান্ত।
দ্বিতীয়ত: মানুষ স্থান ও সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় সব ভালো কাজে অংশ নেয়ার সুযোগ পায় না কিন্তু ঐসব ভালো কাজের ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েও পুরস্কারের অংশ বিশেষ লাভ করতে পারে।#