অক্টোবর ০৭, ২০১৮ ১৪:৩০ Asia/Dhaka

‘পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব’ শীর্ষক আলোচনার এ সপ্তাহর পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। গত দুই পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা বিশিষ্ট ইরানি কবি ও সুফি সাধক হাকিম আবুল মাজদ মাজদউদ্দিন ইবনে অ’দাম সানায়ি গজনাভির জীবন ও তার অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।

গত দুই পর্বে আমরা বিখ্যাত ইরানি মরমী কবি হাকিম সানায়ির জীবন ও অবদান সম্পর্কে কিছু আলোচনা শুনেছি। আজ একই বিষয়ে আরও কিছুটা আলোক-সম্পাত করবো।  ইরফানি নানা বিষয় ছাড়াও কবি হাকিম সানায়ি তার কবিতায় সামাজিক ও নৈতিক বিষয়েও কথা বলেছেন। নিজ যুগের সামাজিক নানা অসঙ্গতি ও অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন তিনি। কিন্তু তার ওই প্রতিবাদ এতই বাস্তব, সার্বজনীন ও জীবন্ত যে এর আবেদন কোনো নির্দিষ্ট দেশ ও কালের গণ্ডিতে সীমিত থাকেনি। যেমন, সানায়ি তার কবিতায় লিখেছেন:


این چه قرن است اینکه در خوابند بیداران همه
وین چه دور است اینکه سرمستند هوشیاران همه 

এ কোন্ অদ্ভুত যুগ এলো যে তাতে জেগে-থাকা সবাইও ঘুমন্ত-বেসামাল?

এ কোন্ খেয়ালী যুগ এলো যে তাতে সব সতর্করাও হয়ে আছে উম্মাতাল?

 

আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে লেখা সানায়ির কবিতাগুলো এইসব বিষয়ে ফার্সি সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ সারির কবিতা হিসেবে স্বীকৃত। ফার্সি ক্লাসিক্যাল সাহিত্যে সামাজিক কবিতার সবচেয়ে বড় রূপকার হিসেবে অমর হয়ে আছেন কবি হাকিম সানায়ি।  

সানায়ির কবিতায় আছে ঝড়-তুফানের মত প্রলয়ংকরী ঘুর্ণি হাওয়া ও আছে প্রবল আক্রোশ। তার বেশিরভাগ কাসিদায় তিনি দুনিয়া-পূজা ও ভোগবাদকে তীব্র কশাঘাত হেনেছেন। কপট সংযম-সাধক ও জালিম শাসককে পরস্পরের সহযোগী ও সাফাইদাতা বলে বর্ণনা করেছেন হাকিম সানায়ি। আর এ ধরনের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে লড়াকু সেনা হিসেবে  সত্যকে তুলে ধরতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত ছিলেন না তিনি।

ধর্মীয় নানা বিষয় ও নিজ যুগের সামাজিক অসঙ্গতিগুলো ছাড়াও সাধারণ মানুষের ব্যথা-বেদনা মূর্ত হয়েছে হাকিম সানায়ির কবিতায়। জালিম শাসক ও ভোগবাদিদের ওপর কথার চাবুক হানতে অভ্যস্ত এই কবি বহুবার তার কবিতায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইত ও সাহাবিদের সংযমী জীবনের ছবি তুলে ধরেছেন। এভাবে তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন আদর্শ সমাজের ছবি।

মৃত্যু সম্পর্কিত ভাবনা,লাগামহীন প্রত্যাশা ও দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা ত্যাগের গুরুত্ব ও প্রকৃত সংযম আর প্রকৃত আত্মসমালোচনা কবি হাকিম সানায়ির ইরফান বা ধর্ম বিষয়ক কবিতার কিছু প্রধান বিষয়বস্তু।

নাসের খসরু ও ফেরদৌসিকে বাদ দিলে কবি হাকিম সানায়ি হচ্ছেন ফার্সিভাষী প্রথম কবি যার কবিতা  ইরাফানি চিন্তা-কেন্দ্রীক। তার প্রবর্তিত এই ধারা পরবর্তী কয়েক শতক পর্যন্ত ফার্সি কবিতায় প্রভাব বিস্তার করেছিল। ফার্সি কবিতার আঙ্গিক বা কাঠামো ও ভাবধারা – এ দুয়ের মধ্যেই পরিবর্তন এনেছিলেন হাকিম সানায়ি। শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও কবিতার ভাষার ওপর দখল এবং অভিনব ভাবধারা বা চিন্তাধারার মাধ্যমে সানায়ি ফার্সি কবিতায় ঘটিয়েছেন যুগান্তর যা ভেঙ্গে দিয়েছে রাজাবাদশাহদের গুণ-গান ও প্রকৃতির রূপ বর্ণনার একপেশে ও একঘেয়ে ফার্সি কবিতার কর্তৃত্ব।

সানায়ি ছিলেন সেইসব কবিদের অন্যতম যারা ফার্সি কাসিদায় ইরফান,সংযম সাধনা ও আধ্যাত্মিক হিকমাতের মত বিষয়বস্তুগুলোর প্রচলক পথিকৃত কবি হিসেবে খ্যাত। সানায়ির  বেশ কিছু কাসিদাকে এক্ষেত্রে ফার্সি সাহিত্যের উৎকৃষ্ট কাসিদা হিসেবে গুরুত্ব দেয়া হয়।

ফার্সি গজল সাহিত্যও সানায়ির আধ্যাত্মিক ও ইরফানি ঔজ্জ্বল্যে ভাস্বর। দ্বিপদী বা মাসনাভি কবিতায় তিনি আধ্যাত্মিক হিকমাত বা শিক্ষণীয় বাণী ও মহানবীর (সা) প্রশংসা তুলে ধরেছেন চমৎকার কিছু উপমা ব্যবহার করে। তার এই কবিতাগুলো পরবর্তী যুগের অনেক ইরানি কবির জন্য হয়েছিল অনুপ্রেরণার আদর্শ। এইসব কবির মধ্যে রয়েছেন খাকানি,নিযামি, আত্তার ও রুমি। খাকানি নিজেই সানায়ির কবিতার আদর্শ অনুসারী বলে গৌরব অনুভব করতেন।

ফার্সি কবিতার ইতিহাসে হাকিম সানায়ি হলেন একমাত্র কবি যিনি নানা ধরনের কল্পিত গল্পের মাধ্যমে ইরফানি ভাবধারাকে সবার আগে ব্যবহার করতে পেরেছেন সফলভাবে। ফলে ফার্সি কবিতায় ইরফানি ভাবধারা ও গল্পের ব্যবহার বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে|। আর এ বিষয়কেই পূর্ণতা দেন আত্তার নিশাপুরি ও মাওলানা রুমি।

মাওলানা রুমি আত্তার ও সানায়ির প্রশংসা করে লিখেছেন: ‘আত্তার হচ্ছেন প্রাণ আর সানায়ি এর দুই চোখ। আমি এসেছি সানায়ি ও আত্তারের পরে।’

যৌবনে যে ঘটনাটি সানায়ির চিন্তাজগতে পরিবর্তন এনেছিল তা ছিল এরকম:

গজনির সুলতানের দরবারি কবি হিসেবে সানায়ি সুলতানের প্রশংসায় কবিতা লিখতেন। সুলতানের ভারত অভিযানের প্রশংসাসূচক কবিতা লেখার জন্য তাকে ওই অভিযানের সময় ভারতে নেয়া হয়। ভারতে ‘লাইখুর’ নামের কথিত এক মাতাল ফকিরের সঙ্গে সানায়ির দেখা হত চারদিকে প্রাচীর ঘেরা এক বাগানে। ওই ফকির ভারতে সুলতানের ওই অভিযানের নিন্দা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘গজনি এতো সুন্দর হওয়া সত্ত্বেও লোভই সুলতানকে টেনে এনেছে ভারতে। আর তোমার মত দূরদৃষ্টি-সম্পন্ন একজন কবি বা বক্তা  এমন এক বোকা সুলতানের প্রশংসা করে কবিতা লিখছ! আর এটা যে অর্থহীন তাও বিবেকের অন্ধত্বের কারণে তুমি বুঝতে পারছো না!’  ফকিরের বাস্তব মন্তব্য সানায়ির হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে ভূমিকম্প। ফলে সানায়ি ছেড়ে দেন দরবারি-কবির পেশা। এমনকি তিনি সুলতানের বোনকে বিয়ে করার প্রস্তাবও নাকচ করেন। এরপর ইউসুফ হামদানি নামের এক সুফি মুর্শিদের তত্ত্বাবধানে তিনি ইরফানি বিষয়ে পড়াশুনা শুরু করেন এবং হজব্রত পালন করেন। হজ থেকে ফিরে এসে সানায়ি লেখেন তার বিখ্যাত ইরফানি কাব্য ‘প্রাচীর-বেষ্টিত সত্যের স্বর্গ-উদ্যান’ তথা  ‘ আল হাদিক্বাতুল হাক্বিক্বাহ ওয়া শারিয়াতু ত্বারিক্বাহ ’।# 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ৩০

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন