নভেম্বর ০৩, ২০১৮ ১৩:৫৫ Asia/Dhaka

রাসুল সা. এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেন আ. এর শাহাদাতের চেহলাম বার্ষিকীতে কারবালায় ছিলেন সৈয়দ মূসা রেজা। সেখান থেকে আরবাইনের দিনসহ সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়ে বলেছিলেন-কারবালাকে এককথায় কালো পোশাকের শহর বলা যায়। ইমাম হোসেন আ.এর প্রতি ভালোবাসা ও সংহতি জানাতে সেখানে মানুষের ঢল নামে।

হজরত হোসেইন (আ) মাজারের সামনে ছবি তুলছেন সৈয়দ মূসা রেজা

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ। 

ভূমিকা-রেডিও তেহরান: জনাব সৈয়দ মুসা রেজা, শহীদদের নেতা ইমাম হুসাইন (আ)’র শাহাদাতের চেহলাম বা আরবাইন বার্ষিকী পালনের জন্য আপনি এখন কারবালায় রয়েছেন। আপনার কাছে প্রথমে জানতে চাইব-কারবালার সার্বিক অবস্থা বিশেষ করে, আবহাওয়া, নিরাপত্তা ও জিয়ারতকারীদের নানা-ধরনের সেবামূলক তৎপরতা সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতার কথা কিছু বলুন।

সৈয়দ মূসা রেজা: কারবালাকে এখন এককথায় কালো পোশাকের শহর বলা যাবে।যেদিকেই তাকানো হোক না কেন কেবলই দেখা যাবে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ কালো পোশাক পরা মানুষ দলে দলে চলছেন। কেউ বা যাচ্ছেন ইমাম হোসেন আ. এর মাজারে জিয়ারতের জন্য অথবা কেউ জিয়ারত করে ফিরছেন। 

কারবালা নিয়ে কথা বলতে গেলে অবশ্যই নাজাফের দিকে ফিরে যেতে হবে।কারণ আমরা নাজাফ হয়ে কারবালায় এসেছি। নাজাফ থেকে কারবালায় আসার পথের অভিজ্ঞতা অসাধারন। নাজাফ থেকে কারবালার দূরত্ব প্রায় ৯৫ কিলোমিটার এবং রাস্তাটা খুবই ভালো। তাছাড়া আমরা যখন রওয়ানা হই তখন আবহাওয়াও খুবই ভালো ছিল। আমরা গাড়িতে করে এসেছি তা সত্ত্বেও নাজাফ থেকে কারবালা পৌঁছতে আমাদের ছয় ঘন্টার বেশি সময় লেগেছে। এত সময় লাগার কারণ হচ্ছে পুরো রাস্তা জুড়েই ব্যাপক পরিমাণে গাড়িতে জিয়ারতকারীরা কারবালার দিকে যাচ্ছিল। তাছাড়া বলা চলে পুরো রাস্তাজুড়ে আমরা দেখেছি জিয়ারাতকারীরা হেঁটে কারবালার দিকে যাচ্ছেন। গভীর রাতেও দলে দলে মানুষ পদযাত্রায় কারাবালার দিকে যাচ্ছেন।

তাছাড়া নাজাফ থেকে কারবালার পথে বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি জিয়ারাতকারীদের জন্য  তৈরি করা হয়েছে বিশ্রামাগার। তাদের জন্য খাদ্য, পানীয় এবং চিকিৎসার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। খাবারের ব্যবস্থা এত বেশি ছিল যে গাড়ি থামিয়ে জোর করে জিয়ারাতকারীদের খাবার দিতে চেয়েছেন। 

নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে বলতে পারি-চমৎকার নিরাপত্তা বলয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছিল পুরোটা পথ জুড়ে। আর আবহাওয়া ছিল  ভালো-মন্দ মেশানো। নাজাফে বৃষ্টি হয়েছিল। কারবালায় আসার পথে ধুলোঝড়ের মধ্যে পড়ি। তবে কারবালায় পৌঁছানোর পর দিন থেকে আবহাওয়া বেশ চমৎকার ছিল। তবে রাতের বেলায় বেশ খানিকটা ঠাণ্ডা ছিল।

রেডিও তেহরান: আপনি নাজাফ থেকে কারবালা আসার পথের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। তো আপনি নাজাফে আমিরুল মোমেনিন হযরত আলী আ. এর মাজারও তো জিয়ারত করেছেন..সেখানকার অবস্থা সম্পর্কেও বলুন..

সৈয়দ মূসা রেজা: দেখুন, হযরত আলী আ. এর মাজারে যখন আমরা যাই তখন সেখানে দেখেছি হাজার হাজার মানুষ। হাজার হাজার মানুষ বললে কম বলা হবে। আসলে লাখ লাখ মানুষ সেখানে জিয়ারত করেছেন। আসলে কারবালা যাত্রার অংশ হিসেবে তাঁরা নাজাফ হয়ে আসছেন। হযরত আলী আ. মাজারে লোক সবসময় গম গম করছে। নাজাফ শহরটি একটি অতিথিশালায় পরিণত  হয়েছে।

রেডিও তেহরান: জ্বি মূসা রেজা - কারবালাগামী জিয়ারতকারীদের সম্ভাব্য সংখ্যা তাদের জাতীয়ততা এবং মহিলা জিয়ারতকারীদের সংখ্যা সম্পর্কে আপনার কাছে কি কোনো তথ্য রয়েছে? এ সম্পর্কে কিছু বলুন..

সৈয়দ মূসা রেজা: দেখুন আরবাঈন উপলক্ষে কারবালায় মানুষ দলে দলে এসেছে এবং আসছে। লাখ লাখ মানুষ এখানে এসেছেন। আসলে শহরটিতে মানুষের ঢল নেমেছে একথা বলা যাবে। কারবালায় জিয়ারাতকারীদের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে মহিলা রয়েছেন। এখানে মহিলা বলতে আসলে গোটা নারী জাতিকে বোঝাতে চেয়েছি। এখানে একেবারে কয়েকমাসের কোলের বাচ্চা শিশু থেকে শুরু করে চলতে ফিরতে কষ্ট হয় এমন বয়স্ক নারীও রয়েছেন। এমনও অনেক নারী আছেন যারা হুইল চেয়ারে করে এসেছেন। একটু আগে আমার সাথে কথা হয়েছে ফিনল্যান্ড থেকে আসা একটি দলের সাথে। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন- আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ওমান, তুর্কমেনিস্তান, তুরস্কসহ ইরানের আশপাশের প্রায় সব দেশের নাগরিকরা এসেছেন আরবাঈনে অংশ নিতে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকেও দলে দলে মানুষ এসেছে। কারবালায় যারা এসেছেন সেখানে মুসলিম ছাড়াও ভিন্ন ধর্মের অনেক লোক রয়েছেন।

রেডিও তেহরান: কারবালাগামী মুসলমানদের পদযাত্রায় আপনি নিজে শরিক হয়েছেন কিনা বা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কারবালার দিকে আসা এ ধরনের পদযাত্রাকে আপনি দূর থেকে দেখেছেন কি? 

সৈয়দ মূসা রেজা:  জ্বি, নাজাফ থেকে যখন আমরা কারবালার দিকে আসছিলাম তখন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষ দলে দলে পায়ে হেঁটে কারবালার  দিকে আসছিল। গভীর রাতেও দলে দলে মানুষকে উৎসাহের সাথে হাঁটতে দেখেছি। তাঁদের সাথে কথাও হয়েছে কোনো কোনো জায়গায়। 

রেডিও তেহরান: তাছাড়া অন্যদের মাঝেও উৎসাহ-উদ্দীপনা ও শোকের তীব্রতা- আপনি কেমন দেখতে পেয়েছেন? 

আরবাইন

সৈয়দ মূসা রেজা: মানুষের ভেতরে শোকের যে তীব্রতা সেটি খুব সহজে বোঝা যায়। হযরত হোসেন আ. এর প্রতি যে কঠিন জুলুম করেছিল বর্বর ইয়াজিদ যে পৈশাচিক আচরণ করেছিল সেকথা ইতিহাস থেকে মুছে যায়নি। আর সেকথা মনে রেখেই মানুষের এই পদযাত্রা। কারণ নবী পরিবারের পবিত্র সদস্যদের গ্রেফতার করার পর পায়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ফলে সেই শোকের তীব্রতা এখনও কমেনি এবং কখনও কমবে বলেও মনে হয় না। যতদিন ইতিহাস থাকবে ততদিন এই শোকের তীব্রতা আরও বাড়বে।

হারামাইন নামে পরিচিত হজরত হোসেইন এবং আবুল ফজল আব্বাস(আ) মাজারের মাঝখানে

রেডিও তেহরান: আচ্ছা সেখানে ইমামদের মাজারে জিয়ারত সম্পর্কে কিছু বলুন।

সৈয়দ মূসা রেজা: কারবালায় ইমাম হোসেন আ.'র মাজারে মানুষের ভীড় কখনওই কমে না। আরবাইনের সময় পর্যন্ত মানুষের ভীড় প্রতিদিনই বাড়ছে। সেখানে নানা শোক অনুষ্ঠান হচ্ছে। সেখানে অংশ নিয়ে মানুষ কাঁদছে। জিয়ারাতকারীরা মাজারের বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে দোয়া- করছেন। দরুদ পড়ছেন আবার কেউ কেউ কুরআন শরীফ পড়ছেন। পুরা এলাক জুড়ে একটা চমৎকার ধর্মীয় আবহ সৃষ্টি হয়েছে। একটি অকল্পনীয় দৃশ্য। ঠিক না দেখলে এ দৃশ্যের বিষয় কথায় বলে বোঝানো যাবে না।

রেডিও তেহরান:  জ্বি- আচ্ছা এত মানুষ সেখানে কেন গেছেন...? 

সৈয়দ মূসা রেজা: দলে দলে মানুষ কারবালায় এসে কেন জমা হয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর একটাই সেটি হচ্ছে তাঁরা ইমাম হোসেন আ. এর প্রতি নিজেদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য এখানে এসেছেন। ইমাম হোসেন আ. এর প্রতি সংহতি প্রকাশের জন্য। জালিমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে নবীজীর পথকে অনুসরণ করতে হবে। আর সেই পথ অনুসরণ করে ইমাম হোসেন আ. মানুষকে শিখিয়ে গেছেন যে কীভাবে অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

রেডিও তেহরান:  জনাব মূসা রেজা সবশেষে-সেখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় বা দর্শনীয় কোনো বিষয় যদি থেকে থাকে আপনার দৃষ্টিতে সে বিষয়েও কিছু বলুন।

সৈয়দ মূসা রেজা: বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে বিষয়গুলো আমি দেখতে পেয়েছি সেগুলো হচ্ছে- কারবালায় যদি আরবাইনের সময় আপনারা জিয়ারাত করতে আসেন সেক্ষেত্রে আসা যাওয়ার জন্য কিছু খরচ লাগবে কিন্তু পৌঁছানোর পর থাকা ও খাওয়ার জন্য কোনোভাবেই পয়সা খরচ করার প্রয়োজন পড়বে না যদি আপনি খরচ করতে না চান। এখানে বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের খাবার তৈরি হচ্ছে। কাবাব থেকে শুরু করে সাধারণ খাবার। সেসব খাবার জিয়ারাতকারীরা খাচ্ছেন তাদের প্রয়োজন মতো। স্থানে স্থানে পানি রয়েছে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে এত লোকের সমাগম অথচ কোনোরকম বিশৃঙ্খলা নেই। প্রত্যেকের মধ্যে অসাধারণ সংযম লক্ষ্যণীয়। খাবারের ক্ষেত্রে যার যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু খবারই নিচ্ছেন। কেউ বেশি খাবার নিচ্ছেন না। অথবা এমনও দেখা গেছে একজন দুটো খাবার নিয়েছেন একটি অন্য একজনকে দিয়ে দিচ্ছেন।

আরেকটা বিষয় লক্ষ্যণীয় এখানে যারা সেবা করছেন, খাবার তৈরি করছেন, খাবার বিলি করছেন তারা কেউই পেশাদার নন। শুধু আরবাইন উপলক্ষে তারা এসব কাজ করছেন। অতিথিদের জন্য যেসব জায়গা তৈরি করা হয়েছিল তা পরিষ্কার করতে দেখেছি ছোটো ছোটো বাচ্চাদের। কারবালায় যারা এসেছেন তাঁরা ইমাম হোসেন আ. এর মেহমান হিসাবে এসেছেন। ফলে তাঁদের সেবাকরাসহ সামগ্রিক কাজে পরিবারের ছোটো শিশুটিও প্রবল আগ্রহ-উদ্দীপনার সঙ্গে অংশ নিয়েছে। এটি সত্যিই লক্ষণীয় বিষয়।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৩