ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮ ১৬:০১ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই গ্রীসের বিখ্যাত গল্পকার ঈশপের নাম শুনেছ। ঈশপ ছিলেন মিশরের ফারাও বাদশাহ আমাসিসের সময়কার লোক। সামস দ্বীপে তিনি বাস করতেন। ইয়াডমন নামে এক নাগরিকের ক্রীতদাস ছিলেন তিনি। ঈশপ দেখতে ছিলেন কদাকার কিন্তু বুদ্ধি ও হাস্যরসে ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তাঁর শিক্ষাপ্রদ অমর কাহিনীগুলো মানুষকে শোনাতেন।

বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস থেকে শুরু করে সব শ্রেণীর মানুষ ছিলেন ঈশপের গল্পের ভক্ত। তার মৃত্যুর পর গ্রীসের দার্শনিক জিমট্রিয়াস তার গল্পগুলো সংগ্রহ করে রাখেন। সেই থেকে ঈশপের গল্প আজও সারা বিশ্বের অমূল্য সম্পদ। ঈশপের গল্পগুলোতে নানা জন্তু, গাছ ও প্রকৃতি মানুষের মতো কথা বলে, কখনোবা মানুষদের মতো আচরণ করে। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে রচিত এই গল্পগুলো স্থান-কালের সীমানা পেরিয়ে আজও আমাদের চেনা জগতের কথা বলে যায়। রংধনু আসরের আজকের পর্বে তোমাদেরকে ঈশপের কয়েকটি ছোট গল্প শোনাব। গল্পের পর থাকবে ইরানপ্রবাসী এক ছোট্টবন্ধুর সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন সহকর্মী আশরাফুর রহমান। তো প্রথমেই গল্প শোনা যাক।

(বাবা ও ঝগড়াটে ছেলের দল)

এক দেশে একজন বাবার অনেকগুলো ছেলে ছিল। তার ছেলেরা প্রায় প্রতিদিনই ঝগড়া করতো। তিনি সবার বিবাদ মিটিয়ে ঝগড়া থামানোর চেষ্টাও করতেন। কিন্তু প্রত্যেকবারই ছেলেদের ঝগড়া থামাতে ব্যর্থ হতেন তিনি।

এভাবে অনেকদিন চলার পর ভিন্নরকম এক পদক্ষেপ নিলেন ওই বাবা। ঝগড়া যে কতো ভয়ঙ্কর হতে পারে তার শিক্ষা দিতে করলেন পরিকল্পনা।

তারপর পরিকল্পনা অনুযায়ী একদিন সবাইকে ডেকে পাঠালেন। সবাই উপস্থিত হওয়ার পর অদ্ভুত এক আদেশ দিলেন। তিনি তার ছেলেদের বললেন এক বান্ডিল লাঠি নিয়ে আসতে।

লাঠি নিয়ে আসার পর সবাইকে এক সারিতে দাঁড় করালেন। এরপর একে একে সবাইকে বললেন লাঠির বান্ডিলটি ভাঙতে। কিন্তু কেউ ভাঙতে পারলে না। এরপর বান্ডিল থেকে প্রতিটি লাঠি আলাদা করতে বললেন। বান্ডিল থেকে লাঠি আলাদা করার পর আবারও সবাইকে ভাঙতে বললেন। কি আশ্চর্য! এবার সবাই ভেঙে ফেললেন লাঠিগুলো।

এবার তিনি তার ছেলেদের উদ্দেশে বললেন, শোন, আমার ছেলেরা তোমাদের যদি ঐক্য থাকে তবে তোমরা লাঠির বান্ডিলের মতো এক থাকবে। কেউ তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। কিন্তু তোমাদের যদি ঐক্য না থাকে তবে যে কেউ খুব সহজেই তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে।

 'একতাই শক্তি একতাই বল' এ গল্পের মাধ্যমে আমরা তার প্রমাণ পেলাম।

 (মানুষ ও সাপ)

একটি বাড়ির উঠানের ঠিক পাশেই এক গর্তে একটি সাপ থাকত। বাড়ির মালিকের শিশু সন্তানটি একদিন সাপটার তীব্র ছোবলে মারা গেল। এই ভয়ানক ঘটনায় শিশুটির বাবা মার দুঃখের সীমা রইল না। শিশুটির বাবা ঠিক করল যে সাপটাকে সে মেরে ফেলবে। পরের দিন খাবারের খোঁজে যেইমাত্র সাপটা গর্ত থেকে বেরিয়েছে, সে লোক তার কুড়াল দিয়ে সাপটার মাথায় দিল এক কোপ। কিন্তু, তাড়াহুড়োয় কোপটা পড়ল গিয়ে সাপের লেজের দিকে। কাটা পড়া লেজ ফেলে সাপ পালিয়ে গর্তে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর লোকটার মনে হল, হায় হায়, সাপটা তো এইবার তাকেই কামড়াবে। তখন সে সাপটার সাথে একটা বোঝাপড়ায় আসতে চাইল।

 ক্ষুধার্ত সাপটার খাওয়ার জন্য একটা রুটি আর খানিকটা লবন নিয়ে গিয়ে সে ওই গর্তটার সামনে রেখে দিয়ে এল। কিন্তু কোনো লাভ হল না। সাপটা তাকে বলল, “তোমার আমার মধ্যে কোনোদিনই সমঝোতা হবে না। তোমাকে দেখলেই আমার মনে পড়বে আমার লেজ কাটা যাওয়ার ব্যথা। আর আমায় দেখলেই তোমার মনে পড়ে যাবে তোমার ছেলেটির মৃত্যুর কথা। "

এ গল্প থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, যার কারণে কোনো যন্ত্রণা পেতে হয়েছে, তার উপস্থিতিতে সেই যন্ত্রণার কথা ভোলা খুবই কঠিন।

(ছাগল ও গাধা)

একটি লোকের পোষ্যদের মধ্যে ছিল এক ছাগল আর এক গাধা। গাধাটার বড়সড় চেহারা, খেতেও পেত বেশী। তার খাবারের পরিমাণ দেখে ছাগলটা ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে যেত। আর থাকতে না পেরে একদিন সে একটা ফন্দী আঁটল। গাধাটাকে ডেকে বলল, “ছিঃ ছিঃ, কি খাটুনিটাই না তোমাকে দিয়ে খাটায় এরা! এই পেষাই করার যন্ত্রে জুড়ে দিচ্ছে তো এই আবার কাঁড়ি কাঁড়ি বোঝা টানাচ্ছে। তুমি এক কাজ করো। মৃগীরোগীর মতো ভান করে পড়ে থাকো, তাহলে আর এত কষ্ট করতে হবে না।"

ছাগলের পরামর্শ গাধার খুব মনে ধরল। কিন্তু খাদে গড়িয়ে পড়তে গিয়ে চোট লেগে নানা জায়গায় কেটে-ছড়ে গেল তার। গাধার মালিক খবর পাঠাল সেখানকার হাতুড়ে চিকিৎসককে। সেই লোক হুকুম দিল ছাগলের রক্ত যোগাড় করার জন্য - গাধার ক্ষতের উপর ঢালতে হবে। ওই ছাগলটাকেই তখন সবাই কেটেকুটে গাধাকে সারিয়ে তুলতে লেগে গেল।

এ গল্পের শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- অন্যের ক্ষতি করতে চাইলে নিজের আরো বড় ক্ষতি হয়ে যায়।

 (গাধা, শিয়াল ও সিংহ)

এক বনে নানা রকম জীব-জন্তু বাস করত। একদিন এক গাধা ও শিয়াল বনের রাজা সিংহের সঙ্গে একটি চুক্তি করল। চুক্তিতে বলা হল, এখন থেকে তিন পশু একসঙ্গে শিকার করবে। শিকার যা পাওয়া যাবে তারা তা সমান ভাবে ভাগ করে নেবে। তিনজন একসঙ্গে শিকার করলে কাউকে না খেয়ে থাকতে হবে না।

সিদ্ধান্ত হল- গাধা শিকারযোগ্য প্রাণির ওপর তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখবে। কাউকে দেখতে পেলে সে তার দিকে এগিয়ে যাবে এবং নিজের পরিচয় দেবে। অন্য দু’জন আড়াল থেকে গাধার দিকে নজর রাখবে। গাধা পরিচয়পর্ব শেষ করার পর শিয়াল আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে গর্জন করে উঠবে। প্রাণিটি স্বাভাবিকভাবেই তখন ভয় পেয়ে যাবে। দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করবে সে। তখন শিয়াল তাকে ধাওয়া করবে। প্রাণিটি তখন শিয়ালকে এড়াতে সোজা দৌড় দেবে, আর গিয়ে পড়বে সিংহের কবলে। সিংহ তখন এক আঘাতে তার দফারফা করবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী সারাদিন ধরে শিকারের পর সন্ধ্যাবেলায় গাধা, শিয়াল, সিংহ সব শিকাল ভাগবাটোয়ারা করতে বসল। সিংহ গাধাকে বলল তার অংশ ভাগ করে দিতে। বনের রাজা সিংহের এ প্রস্তাব শুনে গাধা খুব খুশি হল। মনে মনে ভাবল- শিকার ভাগ করার দায়িত্ব দিয়ে সিংহ তাকে বিরাট সম্মান দেখিয়েছে। যাইহোক, গাধা খুব সাবধানতার সাথে সমস্ত শিকারকে সমান তিন ভাগে ভাগ করে। এরপর শিয়াল ও সিংহের উদ্দেশে বলল: ভাগের কাজ শেষ। এখন আপনারা দু’জন দয়া করে নিজেদের ভাগ গ্রহণ করুন।

গাধার কথা শুনে সিংহ ভাগগুলোর দিতে তাকিয়ে দেখল। তারপর বলল: তাহলে তোর মতে আমাদের তিনজনের ভাগই সমান হওয়া উচিত, তাই না? তুই কি মনে করিস যে, শিকারের সাথে তোর ইনিয়ে বিনিয়ে গল্প করা আর তাকে আমার হত্যার কাজটা একই সমান?

এ কথা বলেই সিংহ গাধার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাকে হত্যা করল। তারপর শিয়ালকে শিকার ভাগ করতে বলে। গাধার পরিণতি দেখে শিয়াল ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। অনেক কষ্টে সে নিজেকে সামলে নিয়ে ভাগ করতে বসল। যা কিছু তারা একসাথে শিকার করেছিল তার প্রায় সবই একভাগে রাখল। আরেক ভাগে রাখল সামান্য একটু অংশ। বড় ভাগটা নেয়ার জন্য সিংহকে অনুরোধ করল। শিয়ালের ভাগ করা দেখে সিংহ বেজায় খুশি হয়ে বলল: আচ্ছা, এত চমৎকার আর ন্যায্য ভাগের কৌশল তোকে কে শিখিয়েছে?

শিয়াল বিনয়ের সাথে বলল: একটু আগে গাধার পরিণতি দেখেই এভাবে ভাগ করা শিখেছি, জনাব।

একথা বলে শিয়াল সিংহের সামনে থেকে চলে গেল। আর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল যে, ভবিষ্যতে আর কোনো কাজে সে কখনোই সিংহকে সাথে নেবে না।

(গাধা, মোরগ ও সিংহ)

এক গাধা আর এক মোরগ এক সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। খাবারের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে এক সিংহ সেখানে এসে হাজির। ক্ষুধার্ত সিংহ যেই গাধাটার উপর লাফিয়ে পড়তে গেল, ঠিক তখনই মোরগটা বিকট চিৎকার দিয়ে কোঁকর-কোঁ করে ডেকে উঠল। লোকে বলে, সিংহ মোরগের ডাক একেবারে সহ্য করতে পারে না। হ’লও তাই, মুহূর্তে মুখ ঘুরিয়ে সিংহটা সেখান থেকে পালিয়ে গেল। তুচ্ছ এক মোরগের ডাকেই সিংহটাকে এমন কেঁপে যেতে দেখে গাধার খুব সাহস এসে গেল। সিংহটাকে আক্রমণ করার জন্য সে ওটার পিছু ধাওয়া করল। বেশীদূর যাওয়ার আগেই অবশ্য সিংহটা ঘুরে দাঁড়িয়ে গাধাটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে টুকরো টুকরো করে ফেলল।

এ গল্প থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, ফালতু সাহস প্রায়ই বিপদ ডেকে আনে।

(একজন মানুষ ও একটি সিংহ)

একটা সিংহ আর একজন লোক একসাথে বনের মধ্য দিয়ে গল্প করতে করতে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ঘুরতে ঘুরতে দুজনেই যার যার শক্তি আর ক্ষমতার কথা বলে নিজেকে অপরের থেকে বড় বলে দাবি করতে লাগল। তর্ক-বিতর্ক চলতে চলতে একসময় তারা পাথরে খোদাই করা একটা মূর্তির পাশে এসে হাজির হল। মূর্তিটাতে দেখা যাচ্ছে একজন মানুষ একটা সিংহকে গলা টিপে মেরে ফেলছে। এই দেখে তর্ক করা লোকটা ঐ মূর্তির দিকে আঙ্গুল তুলে চেঁচিয়ে উঠল, “এই দেখো! দেখতে পাচ্ছ কত জোর আমাদের, এমনকি পশুদের রাজাকেও আমরা কি রকম হারিয়ে দিয়েছি!”

সিংহটা তখন তাকে বলল, “মূর্তিটা তো বানিয়েছে তোমাদের মানুষদেরই কেউ। আমরা সিংহরা যদি জানতাম কি করে মূর্তি বানাতে হয়, তা হলে দেখতে ঐ মানুষটার জায়গা হয়েছে ঐ সিংহটার থাবার নীচে। ”

(পাখীরা, জন্তুরা এবং বাদুর)

কোনো এক সময় পাখীদের সাথে জন্তুদের জোর লড়াই চলছিল। একবার পাখীরা জিতছিল, একবার জন্তুরা। এক বাদুড়, যুদ্ধের ফল ঠিক কি হতে চলেছে বুঝতে না পারায় যখন যেদিকটা বেশী শক্তিশালী মনে হচ্ছিল সেই দিকে হাজির থাকছিল। এক সময় যুদ্ধ শেষ হয়ে শান্তি এল।

ক) এদিকে যুদ্ধের সময় বাদুর-এর ছল-চাতুরি সবার-ই নজরে পড়েছিল। এবার সবাই মিলে তাকে শাস্তি দিল। দিনের আলোয় তার ঘর থেকে বের হওয়া নিষেধ হয়ে গেল। সেই থেকে বাদুড় সারাদিন কোনো অন্ধকার কোণায় গিয়ে লুকিয়ে থাকে আর রাতের আকাশে উড়ে বেড়ায় একেবারে একা একা।

এ গল্পের শিক্ষণীয় হচ্ছে- ছল-চাতুরি করে সব দিক রাখতে গেলে শেষ পর্যন্ত কোথাও কারও সাথে আর জায়গা মেলে না।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৬

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন