ইরানি আরেফ ও সাহিত্যিক খাজা আবদুল্লাহ আনসারির অবদান
হিজরি পঞ্চম শতকের তথা খ্রিস্টিয় একাদশ শতকের প্রখ্যাত আরেফ, মুফাসসির ও সাহিত্যিক এবং 'হেরাতের পির নামে খ্যাত' খাজা আবদুল্লাহ আনসারির পুরো নাম হল আবু ইসমাইল আবদুল্লাহ বিন মানসুর আনসারি।
তার জন্ম হয়েছিল হিজরি ৩৯৬ সনের দোসরা শাবান তুসের কাছাকাছি কুহান্দেজ অঞ্চলে। জন্মের দিনটি ছিল শুক্রবার। তার মা ছিলেন বালখের অধিবাসী। খাজা আবদুল্লাহ আনসারির বাবা আবু মানসুর মুহাম্মাদ বিন আলী আনসারি ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তিনি ছিলেন খোদাভীরু ও আরেফ ব্যক্তিত্ব হিসেবে খ্যাত।
খাজা আবদুল্লাহ আনসারির পূর্বপুরুষ ছিলেন বিশ্বনবী (সা)'র প্রখ্যাত সাহাবি আবু আইয়ুব খালেদ বিন আনসারি। মহানবী (সা) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর প্রথমে এই সাহাবির বাড়িতেই উঠেছিলেন। খাজা আবদুল্লাহ শৈশবেই বাবাকে হারান। ফলে তার শৈশব কেটেছে দারিদ্র ও নিঃস্বতার মধ্য দিয়ে। বহুদিন মাদুর-পাতা ঘরে মাথার নিচে ইট দিয়ে ঘুমাতে হয়েছে তাকে ও খেতে হয়েছে লতা-পাতা।
খাজা আবদুল্লাহ আনসারি শৈশবেই পড়াশুনা শুরু করেন এবং হাদিস ও তাফসির শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জন করেন। ইয়াহিয়া বিন আম্মার শেইবানি ছিলেন তাঁর অন্যতম শিক্ষক। আম্মার শেইবানি শিরাজ থেকে হেরাতে আসেন এবং সেখানে ক্লাস নিতেন ও আলোচনা করতেন। তিনি আরেফদের প্রথাগুলোকে ইসলামী শরিয়তের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার বা সঙ্গতিপূর্ণ করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। আর এ বিষয়টি তার ছাত্র খাজা আবদুল্লাহ আনসারির চিন্তাধারায় স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল।
খাজা আবদুল্লাহ আনসারি প্রখর স্মরণ-শক্তির কারণে তার শিক্ষকদের কাছে সমাদ্রিত হয়েছিলেন বিশেষভাবে। প্রখর স্মরণ-শক্তির কারণেই প্রাথমিক নানা জ্ঞান অর্জন করা, কুরআনের হাফেজ হওয়া এবং কবিতা ও আরবি ভাষা শেখার ক্ষেত্রে তিনি সমবয়স্কদের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে যেতে সক্ষম হন। বলা হয় যে খাজা আবদুল্লাহ মাত্র চার বছর বয়সে পাঠশালায় গিয়েছিলেন ও নয় বছর বয়সে খুব ভালোভাবে কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং হাদিস শাস্ত্র-বিশারদদের কাছ থেকে বহু হাদিসও মুখস্ত করেছিলেন।
খাজা আবদুল্লাহ হাদিস লেখার জন্য অনেক ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করেছিলেন। তিনি নিজেই এ প্রসঙ্গে বলেছেন: একবার নিশাপুরে ব্যাপক বৃষ্টি হচ্ছিল। আর আমি সে সময় রুকু-অবস্থায় থেকে হাঁটতাম যাতে আমার পেটে সেঁটে রাখা হাদিসের খাতাগুলো বৃষ্টির পানিতে ভিজে না যায়।
খাজা আবদুল্লাহ আনসারির শিক্ষকরা ছিলেন শাফেয়ি মাজহাবের অনুসারী। কিন্তু খাজা নিজে কিছুকাল পর হাম্বালী মাজহাব গ্রহণ করেন। তিনি ৪১৭ হিজরিতে ২১ বছর বয়সে নিশাপুরে গিয়েছিলেন।
হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে যখন খোরাসান ছিল ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তাসাওউফের বড় কেন্দ্র তখন মধ্য-এশিয়ার ট্রান্স-অক্সিয়ানা অঞ্চলের ও ইরাকের সুফি নেতাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে পড়েছিল খোরাসানের সমৃদ্ধ শহরগুলো। তারা এই শহরগুলোর সমৃদ্ধ লাইব্রেরিগুলোতে এসে বিশেষ আধ্যাত্মিক ইসলামী জ্ঞান বা ইরফান ও অন্যান্য শা্স্ত্র বিষয়ের বই ব্যবহার করতেন।
সেযুগে খোরাসানের বেশ কয়েকজন সুফি সাধক ও লেখক সুফি জগতের তারকা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। যেমন, আবু নাসর সেরাজ, আবু বকর মুহাম্মাদ কালাবাজ, আবু আবদুর রহমান সুল্লামি ও ইমাম আবুল কাসেম কুশাইরি প্রমুখ। খোরাসান ঘরানার সুফি নেতারা নানা বিচ্যুতি ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতেন। তারা শরিয়তের সঙ্গে তরিকতের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। আর এক্ষেত্রে এগিয়েছিল নিশাপুর শহর। হেরাতের পির নামে খ্যাত খাজা আবদুল্লাহ আনসারি খোরাসান ঘরানার সুফি আদর্শ মেনে চলতেন একনিষ্ঠভাবে।
খাজা আবদুল্লাহ আনসারি খোরাসানি ঘরানার এরফানে তরিকত ও এরফানি খোদাপ্রেমের নানা স্তর বা পর্যায়কে চমৎকারভাবে বিন্যস্ত করেন এবং এক্ষেত্রে শ্রেণী-বিন্যাসের মানদণ্ডেও নতুনত্ব উপহার দেন। বৈষয়িক জীবন ও জগতের সাথে সম্পর্ক রেখেও কোনো সুফি বা আরেফ যদি তার আধ্যাত্মিক উন্নয়ন বা উৎকর্ষতা ধরে রাখতে পারেন তাহলে তাকে অপেক্ষাকৃত বড় সাধক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া উচিত বলে তিনি মনে করতেন। তার মতে এটাই হচ্ছে শরিয়ত ও তরিকতের মধ্যে সমন্বয়।
খাজা আবদুল্লাহ আনসারি তার প্রখর মেধার সুবাদে খুব কম সময়ে অনেক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন এবং নানা বিষয়ে তার ব্যাপক পড়াশুনা থাকায় একজন বিজ্ঞ আরেফ হিসেবে তিনি অনেক অনুরাগী ও দরবেশকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন।
খাজা আবদুল্লাহ আনসারি কখনও তার মূল্যবান সময়কে বৃথা নষ্ট করতেন না। তিনি খুব ভোরবেলা থেকে মধ্যরাতেরও কিছু বেশি সময় পর্যন্ত পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং কুরআনের আয়াতের অর্থ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতেন কিংবা আলেমদের পাশে থেকে তাদের ওয়াজ-নসিহত ও বক্তব্য শুনতেন। খাজা আবদুল্লাহ নিজেই একবার বলেছেন, কুরআন ও হাদিস চর্চার পেছনে তিনি এত বেশি সময় দিতেন যে কখনও কখনও খাবার খাওয়ার সময়ও পেতেন না। ফলে তার মা তাকে রুটি টুকরো করে খাইয়ে দিতেন। মহান আল্লাহর অনুগ্রহে কোনো কিছু কলম দিয়ে লিখলেই তা তার মুখস্ত হয়ে যেতো বলেও তিনি জানিয়েছেন।
খাজা আবদুল্লাহ আনসারি ৪২৩ হিজরিতে হজ করতে যান এবং পথে বাগদাদে যাত্রা-বিরতি করেন যাতে আবু মুহাম্মাদ খালাল বাগদাদির ক্লাস যোগ দিতে পারেন। হজ থেকে ফেরার পথে তিনি তুস, বোস্তাম ও খারাকানে যান। খারাকানে তিনি প্রখ্যাত সুফি আবুল হাসান খারাকানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাৎ তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। খাজা আবদুল্লাহ আনসারি তার সমসাময়িক যুগের আরেক জন প্রখ্যাত সুফি সাধক আবু সায়িদ আবুল খাইরের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে তার কাছ থেকে অনেক বরকত বা ফায়েজ হাসিল করেছিলেন।
খাজা আবদুল্লাহ আনসারি ইসলামী বিষয়ের প্রখ্যাত শিক্ষক ও আরেফদের কাছ থেকে নানা বিষয়ে দীক্ষা ও শিক্ষা তথা ফায়েজ হাসিলের পর নিজেও প্রশিক্ষক, প্রচারক ও পিরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এরপর তিনি জন্মভূমিতে ফিরে যান। খাজা আবদুল্লাহ হেরাতে অনেক ছাত্রকে প্রশিক্ষণ দেন এবং শাইখুল ইসলাম উপাধি পান। জীবনের শেষের দিকে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। খাজা আবদুল্লাহ আনসারি ৪৮১ হিজরির ২২ জিলহজ শুক্রবার ৮৫ বছর বয়সে মারা যান। হেরাত থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে তাকে দাফন করা হয়। তার কবরের ওপর গড়ে তোলা হয় মাজার। এই মাজার তার অনুরাগী ও ছাত্রদের জিয়ারতকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১৩
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন