জানুয়ারি ১৯, ২০১৯ ১৭:৩৪ Asia/Dhaka

বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদের নতুন মন্ত্রিসভাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্যকার রোবায়েত ফেরদৌস। তবে তিনি বলেছেন এখনও আসলে সেভাবে মন্তব্য করার সময় আসেনি।

রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে একদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সটি ভেঙ্গে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে ফলে সমূহ সম্ভাবনা আছে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার। আর সে কারণেই এটিকে পাহারা দিতে হবে এবং চেক দিয়ে রাখতে হবে।

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব রোবায়েত ফেরদৌস, বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল। নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে কিন্তু জোটের কোনো শরীক দলের সদস্যকে এবার মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেয়া হয় নি। বিষয়টি নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। আপনি কীভাবে দেখছেন বিষয়টিকে?

বাংলাদেশের নতুন মন্ত্রিসভা

অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস: দেখুন, বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদের নতুন মন্ত্রিসভাকে আমি ইতিবাচকভাবে দেখছি। কারণ পুরনো যারা মন্ত্রী ছিলেন তাদের অনেকের সম্পর্কে অনেক রকম বিতর্ক ছিল। কারও কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও ছিল। অনেকে নিজস্ব কাজের বাইরে বেশ কিছু বাচলতা করেছেন সেরকম নমুনাও আমরা পেয়েছি। তো এখন নতুন মন্ত্রিসভাকে দেখার বিষয় রয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভায় যারা এসেছেন তাদের অনেকেই নতুন এবং তাদেরকে নবীন বলা হচ্ছে। তবে তাদের গড় বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছরের কাছাকাছি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে চতুর্থ বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। নিশ্চয়ই তাঁর কাছে  উন্নয়নকেন্দ্রীক নতুন পরিকল্পনা আছে। আর সেগুলো তিনি বাস্তবায়ন করতে চান। আর প্রকৃতিগতভাবে সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রীসভাকে সাজাবেন। তিনি যেভাবে সাজাবেন সেভাবেই হবে। তিনি যাদেরকে নিয়ে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন তাদেরকে তিনি নিয়ে আসবেন মন্ত্রিসভায় সেটাই স্বাভাবিক।

আর পুরনো মন্ত্রীদের ব্যাপারে বক্তব্য হচ্ছে-নামের কারণে অনেকে অনেক বড়। তাদেরকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেয়াটা অনেক সাহসের ব্যাপার। আর সেটাও কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার করেছেন। বড় বড় নামের মন্ত্রীদেরকে বাদ দিয়ে তিনি নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের সাহস দেখিয়েছেন। তো সামগ্রিক বিষয়টিকে আমি ইতিবাচকভাবে দেখতে চাই। আর নতুন এই মন্ত্রিসভা নিয়ে এখনই মূল্যায়নের সময় আসেনি। তাদের কাজ-কর্ম কেমন হবে সেটা আমরা সামনে দেখতে পাব। তবে এই নতুন মন্ত্রিসভার দুই একজনকে আমরা চিনি যাদের সম্পর্কেও অনেক নেতিবাচক কথা আছে। তাদের সম্পর্কে আপত্তিকর বক্তব্য আছে এবং  পত্র-পত্রিকার পাতায় রিপোর্ট হয়েছে। সেগুলো খুব বেশি বিবেচনা করা হয়নি বলেও আমার কাছে মনে হয়েছে। এর ফলে সমস্যা হতে পারে। আর জোটের ব্যাপারে আমার মনে হয় যেহেতু জোটগতভাবে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করেছে সেক্ষেত্রে জোটের কাউকে নিশ্চয়ই সরকারে রাখা দরকার ছিল। তারমানে এই না আগে জোটের যারা মন্ত্রী ছিলেন যেমন ইনু বা মেনন তাদেরকে রাখতে হবে। ইনুর দলের শিরিন আপা আছেন তাকে রাখা যেতে পারে। মেনন ভাইয়ের দলের বাদশা ভাই আছেন, তাকে রাখা যেতে পারে। আমার মনে হয় আরো কিছুদিন পর তাদেরকে যুক্ত করা হতে পারে। এটিই শেষ না।

রেডিও তেহরান: কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন, আওয়ামী লীগ দুর্বল সময় পার করে এসেছে; এখন আর শরীকদের তেমন একটা প্রয়োজন নেই। আপনার কী তেমন কিছু মনে হয়?

রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনু

অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস: দেখুন, জোট থেকে গতবার যারা মন্ত্রী ছিলেন তারা মন্ত্রী হবেন বলে আমার মনে হয় না। যে কারণে আমরা দেখেছি ২৭ জন জীবনে প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হয়েছেন। সেখানে ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাসদও যুক্ত হতে পারে এই মন্ত্রিসভায়। রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনুর যে বয়স ও তাদের কাজ-কর্মের যে নমুনা তাছাড়া তাদের সম্পর্কে নানা বাচলতার ও দুর্নীতির অভিযোগ  আছে। সুতরাং তাদের পরিবর্তে তাদের দল থেকে যোগ্যতমদের মন্ত্রিসভায় যোগ করাটা হবে যৌক্তিক। তবে সেই সিদ্ধান্তটি এত অল্প সময়ের মধ্যে নেয়াটা ঠিক হবে না। সেজন্য আরও অপেক্ষা করা দরকার।

রেডিও তেহরান: মহাজোটের অন্য দল থেকে মন্ত্রী গ্রহণ না করায় শরীক দলগুলো বেশ হতাশ- গত কয়েকদিনে তা বোঝা গেছে। এটা কী আওয়ামী লীগের জন্য কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবে বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস: দেখুন, জোট থেকে আগে যারা মন্ত্রী ছিলেন এবং বাদ পড়েছেন পরবর্তীতে ক্ষোভ প্রকাশের বিষয়টি তাদের দীনতা বলেই আমার কাছে মনে হয়ছে। তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিলেন এবং দুই টার্মে মন্ত্রী হয়েছেন। তারা আজীবন মন্ত্রী থাকবেন এবং সরকারে থাকবেন এমনটি হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী নিজে যেমন তার দলের অনেক সিনিয়র নেতাদের বাদ দিয়ে নতুনদের স্থান করে দিয়েছেন। ঠিক তেমনি জোটের অন্যদের উচিত হবে নিজেদের নাম বাদ দিয়ে কিংবা যারা একবার তাদের দল থেকে মন্ত্রী হয়েছেন তাদেরকে বাদ দিয়ে নতুনদের নাম প্রস্তাব করতে পারেন কিনা যদি আগামীতে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত হয়। সেটিই দেখার বিষয়। আমরা সেটা দেখার অপেক্ষায় আছি। 

রেডিও তেহরান: দেখুন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রায় একচেটিয়া সংসদ গঠন হলো। গণতান্ত্রিক রেওয়াজে এই সংসদকে কীভাবে কার্যকরী করে তোলা সম্ভব হবে বলে মনে হয়?

বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস: দেখুন, আমার কাছে যেটা মনে হয় পশ্চিমা সমস্ত গণতন্ত্র বা সংসদীয় গণতন্ত্র ঠিকে থাকার মূল জায়গা সম্পর্কে রাষ্ট্র দার্শনিকরা যে বিষয়টি বলেছেন সেটি হচ্ছে ক্ষমতার একটি ঝোঁকই হচ্ছে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা। একনায়ক তন্ত্রের দিকে যাওয়া। আর সেজন্য ক্ষমতাকে সারাক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখতে হয়। ক্ষমতাকে চোখে চোখে রাখতে হয়। যে কারণে সব রাষ্ট্র দার্শনিকদের চিন্তা ছিল কিভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। বাংলাদেশে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার সেই চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সটি ভেঙ্গে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে ফলে সমূহ সম্ভাবনা আছে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার। আর সে কারণেই এটিকে পাহারা দিতে হবে এবং চেক দিয়ে রাখতে হবে। 

আর সেটি কিভাবে সম্ভব? একটা হচ্ছে সরকার বিচার বিভাগের কাছে জবাবদিহি থাকবেন। আর বিরোধী দলে যারা থাকবেন সরকারের বিরুদ্ধে তাদের আনা অভিযোগের কারণে বিরোধীদের দমন না করে সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে তা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। মূলত ভার্টিকাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি এবং হরাইজানটাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি- এই দুটোর মধ্য দিয়ে আসলে সরকার কিংবা সংসদীয় গণতন্ত্র টিকে থাকে বা কার্যকর হয়। আমি মনে করি গণতন্ত্র একটি সরকার ব্যবস্থা না। গণতন্ত্র হচ্ছে একটি মূল্যবোধ, একটি দৃষ্টিভঙ্গি, একটি জীবন ব্যবস্থা। আর সেই জীবন ব্যবস্থার মূল কথা হচ্ছে টলারেন্স, পরমতসহিষ্ণুতা। দ্বিমতকে সহ্য করা অন্যের মতকে সম্মান দেয়া। সেই ডেমোক্রেটিক ভ্যালুস যদি সরকারের মধ্যে আনা যায় তাহলে হয়তো একটা কার্যকর সংসদ কিংবা একটা দায়িত্বশীল সরকার আমরা পাব।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস সবশেষে আপনার কাছে যে বিষয়টি জানতে চাইব সেটি হচ্ছে আন্দোলনে ব্যর্থতা ও যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন করার কারণে নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তো প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস: প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের সাথে আংশিকভাবে একমত হওয়া যায়। বিএনপির গত দশ বছরের রাজনীতির হিসাব করলে দেখা যায় তাদের কারাবন্দি নেত্রীকে কারামুক্ত করা কিংবা তার মামলাগুলো নিয়ে যতটা আন্দোলন সংগ্রাম তারা করেছে জনগণের দাবি নিয়ে যেমন ধরুন রামপালের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, সড়ক দুর্ঘটনা, কোটা আন্দোলন-এসব বিষয়ে আন্দোলন করতে বিএনপিকে আমরা দেখিনি। তাছাড়া বিএনপি জামায়াতকে নিয়ে নির্বাচন করেছে। আদালতের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে দল হিসাবে তারা মানবতা বিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। সেই তাদেরকে সঙ্গে নিয়েই বিএনপি  জোট করেছে। এগুলো যেমন আছে একইভাবে এ নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগকে অনেক সমালোচনা করছেন। সেসব সমালোচনায় বলা হচ্ছে- পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশনসহ অন্যসবকিছু মিলিয়ে একধরনের বাড়তি সুবিধা নিয়ে নির্বাচন করেছে। তারা কেউ আসলে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। আর আওয়ামী লীগের সেইসব সুবিধা নেয়ার কারণে বিএনপির ভরাডুবি হয়েছে নির্বাচনে। তাছাড়া বিএনপি নিজেও কার্যকর কোনো ইস্যু তৈরি করতে পারেনি।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

বিএনপি নির্বাচনের আগে বলেছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা  হোক তখন আমরা মাঠে নামব। মানুষ তাদের কথা বিশ্বাস করেছে। কিন্তু তফসিল ঘোষণার পর বিএনপি মাঠে নেই। তারপর বলা হলো ২৪ তারিখ সেনা মোতায়েনের পর তারা মাঠে আসবে। কিন্তু না কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। তারা এভাবে একের পর মানুষকে কথা দিয়েছে যার কোনো ভিত্তি নেই। তারা একটা দৈব্য বা অলৌকিক কিছু একটা ঘটবে এমন প্রত্যাশা করেছে। অথচ সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ হয়নি। রাজনীতিতে বাস্তববাদি চিন্তার ব্যাপারে বিএনপির ঘাটতি ছিল বলে আমার মনে হয়েছে। আর সেকারণে মানুষ তাদের কর্মসূচিকে বিশ্বাস কিংবা আস্থায় নিতে পারেনি। আর এটাও কিন্তু বিএনপির ভরাডুবির একটা বড় কারণ বলে আমি মনে করি।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৯