ইরানি পণ্য সামগ্রী: ভবন নির্মাণ সামগ্রী ও সিরামিক শিল্প
গত আসরে আমরা বলেছি ইরানের বিভিন্ন প্রদেশে ১৩০ টিরও বেশি ওয়াল টাইলস ও সিরামিক ফ্যাক্টরি রয়েছে।
ইরানে অবশ্য ওয়াল টাইলস শিল্পটির ইতিহাস বেশ প্রাচীন। পুরাতাত্ত্বিক গবেষকদের অনুসন্ধানী খননকাজ থেকে উঠে আসা প্রাচীন টাইলসের নমুনাগুলোর বিশ্লেষণ থেকে প্রমাণিত হয় যে ইরানে খ্রিষ্টপূর্ব চার শ বছর আগে এই টাইলস শিল্পের প্রচলন ছিল। বিশেষ করে শুশে পাওয়া মৃৎশিল্পের নিদর্শন কিংবা হাখামানেশিয় প্রাসাদে পাওয়া টাইলসের নিদর্শনগুলো পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞগণ ওই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। এ নিয়ে আমরা আজও কিছু কথা বলবো ইনশাআল্লাহ।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামের বিকাশের ফলে ইসলামি স্থাপত্যেরও বিস্তৃতি ঘটে। তারই পথ ধরে ইসলামি স্থাপনাগুলোতে টাইলস ব্যবহার করার প্রচলন দেখা দেয়। কারণ ইসলামি স্থাপত্যকলার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এই টাইলসের ব্যবহার। যেমন মসজিদের সদর দরোজা, গম্বুজ, মেহরাব ইত্যাদিতে টাইলসের ব্যবহার আজও লক্ষ্য করা যায়। ইরানে বিভিন্ন যুগে যেসব টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেইসব ব্যবহৃত টাইলসের যেটুকু নমুনা কালের ভাণ্ডারে অবশিষ্ট রয়েছে সেগুলো বিশ্লেষণ করলে ইরানি টাইলসের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। যেমন সাফাভি শাসনামলের বিভিন্ন পর্বে যে টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো রঙের দিক থেকে এবং সৌন্দর্যের দিক থেকে অনন্য সাধারণ আজও।

সাফাভি শাসনামলের টাইলসের নমুনা এখনো দেখতে পাওয়া যাবে ইস্ফাহানে। সেখানকার শেখ লুৎফুল্লা মসজিদ প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মসজিদ হিসেবে স্বীকৃত। প্রাচীন সেসব টাইলস এখনও এই মসজিদে অবশিষ্ট রয়েছে। এখানকার টাইলসে যেসব চকচকে উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে সৌন্দর্যের দিক থেকে আজও তা বিশ্বে সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে পরিগণিত। আজকাল অবশ্য টাইলস শিল্পে অনেক বৈচিত্র্য এসেছে। বিভিন্ন রকমের টাইলস পাওয়া যায় এখন। টাইলসে যেসব চকচকে উপাদান ব্যবহার করা হয় সেসব উপাদান কেবল সৌন্দর্যের জন্যই ব্যবহার করা হয় না বরং টাইলসের বিরুপ আবহাওয়াসহ বিচিত্র প্রতিকূল অবস্থা থেকে রক্ষা করে। প্রাকৃতিক রঙ তাই এক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো এবং সেগুলোর স্থায়িত্বও ছিল কৃত্রিম মানে রাসায়নিক রঙের তুলনায় অনেক বেশি।
চকচেকে নিকেল দেয়া টাইলসগুলোতে রঙের ব্যবহার যেমন বিচিত্র তেমনি ডিজাইনও বেশ রকমারি। সাধারণক চকচকে আবরণ না দেওয়া টাইলসের তুলনায় আবরণ দেওয়া টাইলসগুলোর বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো। নকশার ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। একটি কথা মনে রাখা দরকার যে যেসব টাইলসের সিরামিক জাতীয় নিকেল দেওয়া হয় সেগুলো সিরামিক কিংবা সিরামিক টাইলস বলা হয়। টাইলসের দাম এবং মানের বিষয় নির্ভর করে কতবার পোড়ানো হয় এবং কত ডিগ্রি তাপমাত্রায় পোড়ানো হয় তার ওপর। সাধারণত বিশ থেকে এক শ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে যেসব টাইলস সেগুলোকেই গুণগত দিক থেকে ভালো মানের বলে মনে করা হয়। ওই তাপমাত্রায় পোড়ানো হলে টাইলসের গায়ে যেমন ফাটল সৃষ্টি হওয়া যাবে না তেমনি তার গায়ে চকচকে প্রলেপও যেন ধূসর কিংবা ফ্যাকাশে না হয়ে যায়। বাড়ির ভেতরে এবং বাইরে টাইলসের ব্যবহার করা হয় সাধারণত স্বাস্থ্যগত সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে।
কারণ তাপমাত্রা প্রতিরোধ করাসহ বিদ্যুৎ প্রতিরোধ ক্ষমতাও রয়েছে টাইলসের। এ কারণেই টয়লেট, রান্নাঘর এমনকি পরীক্ষাগার ও রাসায়নিক কল-কারখানায় টাইলসের ব্যবহার হয় প্রচুর। ইরানে প্রথম আধুনিক মানের টাইলস তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অর্ধ শতাব্দিরও আগে। ১৯৫৭ সালে ইরানে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে টাইলস তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তার তিন বছর পর উৎপাদন শুরু হয়। আজ ইরানে অসংখ্য টাইলস তৈরির কারখানা রয়েছে। নামকরা কয়েকটি ব্রান্ডের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ইস্ফাহান, আলভান্দ, পার্স, হাফেজ, সিনা, নিলু, সাদি, বেহসেরাম গ্র্যানাইট, তাকসেরাম টাইলস এবং চিনা টাইলস ইত্যাদি এখন নামকরা টাইলস ব্র্যান্ড। এগুলো সবই ইরানি কোম্পানি। কারিগরি সুবিধা, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং স্থানীয় হবার কারণে, সেইসঙ্গে প্রচুর অর্থলগ্নির সুবিধা পাওয়ায় ইরান এখন বিশ্বে টাইলস নির্মাণের ক্ষেত্রে চতুর্থ পর্যায়ে রয়েছে। সত্তুর কোটি বর্গমিটারেরও বেশি টাইলস বছরে উৎপাদন হচ্ছে ইরানে।
টাইলসের সত্তুর থেকে এক শ ভাগ কাঁচামাল ইরানের অভ্যন্তরেই পাওয়া যায়। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ইরানের টাইলস এখন বাইরেও রপ্তানি হয়। এশিয়া মাইনরের দেশগুলো, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাকের উত্তরাঞ্চল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের টাইলস আমদানি করে। বছর তিনেক আগে টাইলস রপ্তানি থেকে আসা ইরানের আয়ের পরিমাণ ছিল চল্লিশ কোটি ডলারেরও বেশি। টাইলস সামগ্রি উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইরানের ইয়াজদ প্রদেশ সবচেয়ে প্রাচীন। অন্তত সাত শ বছর আগে এই প্রদেশে টাইলস শিল্পের কাজ শুরু হয়েছিল। সে সময় ছিল স্থানীয় প্রযুক্তি। এখন তো আধৃনিক প্রযুক্তি এসে গেছে। সেই আধুনিকতার ছোঁয়া টাইলসের গায়েও লেগেছে। এখন ইরানে উৎপন্ন টাইলসের শতকরা পঞ্চাশ ভাগই উৎপন্ন হয় ইয়াজদে।
টাইলস সংশ্লিষ্ট সকল কার্যক্রম এই প্রদেশেই হয়ে থাকে। চকচকে নিকেল প্রলেপ লাগানোর কাজ, নকশার কাজ, প্যাকেজিংসহ এ সংক্রান্ত সকল কাজ ইয়াজদেই হচ্ছে।#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ১৬