মে ০৪, ২০১৯ ১৩:৩৫ Asia/Dhaka

হিজরি পঞ্চম শতকের প্রখ্যাত ইরানি আরেফ, মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও সাহিত্যিক খাজা আবদুল্লাহ আনসারির জীবন ও অবদান।

গত পর্বে আমরা একাদশ শতকের বিশিষ্ট ইরানি আরেফ ও সুফি কবি খাজা আবদুল্লাহ আনসারির নানা বই ও সাহিত্য-কর্ম এবং বিশেষ করে পদ্যময় ফার্সি গদ্যে লেখা তার ধর্মীয় চিন্তাধারার অমর বই 'মুনাজাতনামেহ' বা 'এলাহিনামেহ' নিয়ে আলোচনা করেছি। হিজরি পঞ্চম শতকের এই কবির জীবনের আরও কিছু প্রাসঙ্গিক দিক সম্পর্কে আমরা আজ কথা বলব।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)'র বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু আইউব আনসারি (র.)'র এর নবম বংশধর ছিলেন খাজা আবদুল্লাহ আনসারি। 'হেরাতে পির' নামে খ্যাত এই মনীষীর সংস্পর্শ ও চিন্তাধারা পুতঃপবিত্র করেছে বহু বিভ্রান্ত মানুষকে। তার সবচেয়ে জনপ্রিয় বই মুনাজাতনামেহর হৃদয়-ছুঁয়ে যাওয়া ভাষা আজও মানুষের হৃদয়কে করে খোদামুখি ও ধর্মমনা। তার এ বইটি বাংলা ভাষায়ও হয়েছে অনূদিত। অনুবাদ করেছেন প্রিন্সিপ্যাল এ.এ রেজাউল করিম চৌধুরীজনাব চৌধুরীর অনুবাদে আনসারির মুনাজাতনামেহ'র একটি প্যারায় মহান আল্লাহর প্রতি তার কৃতজ্ঞতাকে ফুটে উঠেছে এভাবে:

তোমার ইচ্ছা পালনেই আমি বেঁচে থাকি
তোমার বন্দনায় রসনা মোর সদা সঞ্চালিত
প্রভূ হে,যে জন তোমায় জেনেছে 
তুমি ছাড়া সব কিছুই ছেড়েছে সে। 

অধ্যক্ষ চৌধুরী দয়া প্রসঙ্গে আনসারির আরেকটি উপদেশ তুলে ধরেছেন এভাবে:

খোঁড়া কুকুর পায় যদি 
তোমার দুয়ারে আশ্রয়
ক্লান্ত শ্রান্ত আর্তজন 
তোমাতে যদি পায় শান্তি 
হতাশ হবার নেই কারণ। 

খাজা আবদুল্লাহ আনসারির মুনাজাতনামেহ একদিকে যেমন তুলে ধরে খোদাপ্রেমের রহস্যময় ধর্মীয় জ্ঞান ও প্রজ্ঞা তেমনি তা তুলে ধরে মানবিকতার শিক্ষা।

খাজা আবদুল্লাহ আনসারি ছিলেনএকাধারে মুফাসসির,মুহাদ্দিস,আরবি ও ফার্সি ভাষার কবি। তাঁর তাফসি গ্রন্থ কাশফুল আসরার ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। মহানবী (সা.)-এর ৩০ হাজার হাদীস খাজা আবদুল্লাহ আনসারী রহ.-এর মুখস্ত ছিল। ইতিহাস খ্যাত সাধক ও কবি মাওলানা আবদুর রহমান জামী রহ. তাঁকে শায়খুল ইসলাম উপাধিতে ভূষিত করেন। হেরাতের গভর্ণর হাউজের দেয়ালে উৎকীর্ণ ছিল আনসারির কবিতা।  

ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত বুযুর্গ হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী আজমিরী রহ. হেরাতে আসার পর খাজা আবদুল্লাহ আনসারীএর মাযারে রাত কাটাতেন আল্লাহ তায়ালার দরবারে দুআ ও মুনাজাতের মাধ্যমে

বলা হয় এক লাখ ফার্সী কবিতা খাজা আবদুল্লাহ'র মুখস্থ ছিল। তিনি নিজে ৬০০০ ছত্র কবিতা রচনা করেন। আল্লাহর পরিচয়, মানুষের সাথে আল্লাহর সম্পর্ক,সৎ চিন্তা,সৎ কর্ম, পাপ পরিহার,পরোপকার, মানব সেবা, তওবা,আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও সুন্নাতে রাসূলের (সা) পুনরোজ্জীবন হল তাঁর রচনার মূল প্রতিপাদ্য।

খাজা আবদুল্লাহ'র মুনাজাতনামে'র অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় তাওহিদ বা একত্ববাদ। মহান আল্লাহর সত্তার মূল বৈশিষ্ট্য বোঝা যে সম্ভব নয় তা তিনি তুলে ধরেছেন মুনজাতনামে'র বক্তব্যে। মহান আল্লাহর সত্তাগত বৈশিষ্ট্য বা গুণগুলো যে সব কিছু থেকে বিযুক্ত ও পবিত্র এবং বর্ণনাতীত ও বোধগম্যতার অতীত তা তিনি খুব সুন্দরভাবে ব্যক্ত করেছেন এ বইয়ে। মহান আল্লাহর সত্তা কোন্ ধরনের বা কেমন প্রকৃতির তা কখনও কোনো মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। আনসারি এ প্রসঙ্গে মুনাজাতনামেহ-তে লিখেছেন, হে এলাহি! ভাবতাম যে তোমাকে চিনতে পেরেছি, কিন্তু এখন সেইসব বোধ ও উপলব্ধিকে পানিতে ফেলে দিলাম।

কেউ যদি আল্লাহর বন্ধুদের চিনতে পারেন তাহলেই সে সত্যকে তথা আল্লাহকে চিনতে পারবে বলেও দাবি করেছেন খাজা আবদুল্লাহ আনসারি। তিনি লিখেছেন, আল্লাহকে এক জানাই একত্ববাদ নয় বরং তাঁর সঙ্গে এক হয়ে যাওয়াই একত্ববাদ।

আবদুল্লাহ আনসারি বেহেশত পাওয়ার জন্য ইবাদত করাকে নিকৃষ্ট ইবাদত বা মজুরের ইবাদত বলে মনে করতেন। তিনি কিয়ামত ও পরকালের ভয়কে গুরুত্ব দিলেও আল্লাহর দয়ার তুলনায় মানুষের পাপকে তুচ্ছ বলে মনে করতেন।

ইংরেজি ভাষায় খাজা আবদুল্লাহ আনসারির মুনাজাত ও নসীহতের অনুবাদ প্রকাশ হলে ভারতের জাতীয় নেতা মোহন দাশ করম চাঁদ গান্ধী অনুবাদ আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন বলে জানা যায়সরদার স্যার যোগেন্দ্র সিংহ খাজা আনসারির মুনাজাতনামেহ ও নসীহত ইংরেজীতে অনুবাদ করেন এবং The Wisdom of the East Series গ্রন্থমালায় ১৯৫১ সালে তা লন্ডনে মুদ্রিত হয়। সরদার স্যার যোগেন্দ্র সিংহ খাজা আবদুল্লাহ আনসারী'র মুনাজাত ও নসীহতের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন : শান্তির আলয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণের পথে এ মুনাজাত সঠিক পথ নির্দেশনা। অন্তর হতে উত্থিত এ মুনাজাত তাঁর অভিজ্ঞতাসঞ্জাত। তাঁর অন্তর যা চেয়েছে, তা তিনি পেয়েছেন। অন্যদের কাছে যা লুকানো, তা প্রত্যক্ষ করেছেন আনসারী। তাঁর আবিষ্কার প্রমাণ করে সত্য অপরিবর্তনীয়। সকল যুগের সত্যপ্রাপ্ত সাধকেরা একই সূরে কথা বলেছেন। ইন্দ্রিয় আচ্ছন্ন চেতনায় আনসারীর উক্তির মর্ম অগম্য। লালসার ঝড় হতে উত্থিত কুজ্ঝটিকা ভেদ করতে পারে আত্মিক সাধনা  

যোহ্দ্‌ বা দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ পরিত্যাগের সাধনাকে গুরুত্ব দিতেন খাজা আবদুল্লাহ আনসারিতার মতে দুনিয়া ও এর মধ্যকার সব কিছুর প্রতি আকর্ষণ প্রতিরোধ করাই হচ্ছে প্রকৃত যোহদ্‌। তিনি বিখ্যাত সুফি সাধক মনসুর হাল্লাজের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। তবে খোদায়ী রহস্যের গোপন জ্ঞান গোপন রাখাই উচিত বলে মনে করতেন আনসারি।

খাজা আবদুল্লাহ আনসারির মুনাজাতনামেহ'র মধ্যে ওমর খাইয়ামের চিন্তাধারার প্রভাবও দেখা যায়। ওমর খাইয়াম খাজা আবদুল্লাহর মৃত্যুর অল্প কিছুকাল পরই হিজরি ৫১৮ সনে ইন্তেকাল করেছিলেন। বস্তুগত দিক থেকেও দুনিয়ার জীবনকে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগানোর যে কথা ওমর বলতেন সে ধরনের কথা বলেছেন খাজা আবদুল্লাহও।

মুনাজাতনামেহ'র বিষয়বস্তুর মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রতি বস্তুগত উপদেশ ও সামাজিক বিষয়ও স্থান পেয়েছে। এদিক থেকে মুনাজাতনামেহ'র সঙ্গে হিজরি সপ্তম শতকের কবি শেখ সাদি শিরাজির অমর সাহিত্য-কর্ম গোলেস্তানের মিল রয়েছে। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ৪