মে ০৫, ২০১৯ ১৩:৫১ Asia/Dhaka

গত পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা হিজরি পঞ্চম শতকের প্রখ্যাত ইরানি আরেফ, মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও সাহিত্যিক খাজা আবদুল্লাহ আনসারির জীবন ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।

গত কয়েক পর্বে আমরা হিজরি পঞ্চম শতক তথা খ্রিস্টিয় একাদশ শতকের বিশিষ্ট ইরানি আরেফ ও সুফি কবি খাজা আবদুল্লাহ আনসারির নানা বই ও সাহিত্য-কর্ম এবং তার লেখার বিষয়বস্তু ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছি।  এ ছাড়াও পদ্যময় ফার্সি গদ্যে লেখা তার ধর্মীয় চিন্তাধারার অমর বই 'মুনাজাতনামেহ' বা 'এলাহিনামেহ'-'র নানা দিক সম্পর্কেও কথা  বলেছি।

আজ আমরা খাজা আবদুল্লাহ আনসারির চিন্তাধারা সম্পর্কে কিছু কথা বলব। প্রখ্যাত এই আলেম ও আরেফ দারিদ্র, প্রাচুর্য, জ্ঞান ও মারেফাত বা খোদায়ী জ্ঞান এবং আল্লাহর ওপর ভরসা বলতে কি চিন্তাধারা বা বিশ্বাস পোষণ করতেন তা তুলে ধরব আজকের এই আলোচনায়।

আভিধানিক অর্থে দারিদ্র বলতে অভাব ও দরবেশি বা ফকিরি এবং প্রাচুর্য বলতে ঠিক এর বিপরীত তথা শক্তিমত্তার অধিকারী হওয়া, অমুখাপেক্ষীতা ও সম্পদের অধিকারী হওয়াকে বোঝায়। কিন্তু ইরফানি দৃষ্টিতে প্রাচুর্য  হচ্ছে সত্যিকারের সম্পদ ও ক্ষমতার অধিকারী হওয়া যা কেবল মহান আল্লাহরই বৈশিষ্ট্য। আর মানুষের জন্য প্রাচুর্য হচ্ছে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী আত্মার অধিকারী হওয়া। আর শক্তিশালী আত্মার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই আত্মা নিজেকে গোটা বিশ্ব ও বিশ্ববাসী থেকে অমুখাপেক্ষী মনে করেন। কারণ এই আত্মা মহান আল্লাহর নৈকট্য পেয়েছে বলে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো চিন্তা তার মধ্যে স্থান পায় না।  

খাজা আবদুল্লাহ আনসারি তার 'সাদ মেইদন' বা 'শত ময়দান' শীর্ষক বইয়ে সুরা আদদোহা'র ৮নম্বর আয়াতের আলোকে সমৃদ্ধি বলতে মানুষের সক্ষমতাকে বুঝিয়েছেন। তিনি মানুষের সক্ষমতাকে সম্পদের সক্ষমতা বা সমৃদ্ধি, নাফস বা প্রবৃত্তির সমৃদ্ধি ও অন্তরের সমৃদ্ধি- এই তিন ভাগে ভাগ করেছেন। সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে সম্পদের সমৃদ্ধি অর্থ বিপুল পরিমাণ বস্তুগত সম্পদ থাকা। কিন্তু আরেফরা মনে করেন বস্তুগত সম্পদের প্রাচুর্য ফেতনা, দুর্নীতি ও খোদাদ্রোহীতার পরিবেশ সৃষ্টি করে। আর এ কারণেই আরেফরা সম্পদ ও পদের আকর্ষণ প্রতিরোধ করেন।

খাজা আবদুল্লাহ আনসারি মনে করেন- এমনকি হালাল পথে বিপুল সম্পদ অর্জনও বড় বিপদ-স্বরূপ। খোদা-প্রেমিকদের প্রতি তার পরামর্শ হল তারা যেন সম্পদ ও অর্থ জমা করার বিষয়ে সতর্ক হন ও নিজেদেরকে এই আপদের মধ্যে নিমগ্ন না করেন। খাজা আবদুল্লাহ'র মতে মানুষের জন্য দ্বিতীয় সমৃদ্ধি হল নাফস্ বা প্রবৃত্তির সমৃদ্ধি। খোদা-প্রেমিক হওয়ার পথে সবচেয়ে কঠিন বাধা হল নিজের নাফস বা প্রবৃত্তিকে গুরুত্ব দেয়া ও তার অনুসরণ করা। নাফস সব সময়ই মানুষকে কুমন্ত্রণা দেয়। তাই নাফসের আনুগত্যকারী কখনও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পা বাড়াতে পারে না।

খাজা আবদুল্লাহ আনসারির মতে নাফসের সমৃদ্ধি হচ্ছে নিজের অমুখাপেক্ষী এবং আল্লাহর মুখাপেক্ষী হওয়া। খোদার পথের প্রেমিক কেবল তখনই নিজ নাফসকে সমৃদ্ধ করতে পারে যখন তিনি পার্থিব নানা সম্পদের চাহিদা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেন এবং হৃদয়কে কেবলই খোদা-প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ রাখেন।

খাজা আবদুল্লাহ আনসারি মনে করেন অন্তরের সমৃদ্ধি আসে সম্পদ ও নাফসের সমৃদ্ধি থেকে। খোদা-প্রেমিক হতে ইচ্ছুক ব্যক্তি যখন সম্পদ ও নাফসের অমুখাপেক্ষী হন তখনই তার অন্তর শক্তিশালী হয় বা সমৃদ্ধি অর্জন করে। খোদা-প্রেমিকের হৃদয়ে খোদা ছাড়া অন্য কোনো কিছুরই স্থান থাকতে পারে না। তার অন্তর বিশ্বের সব কিছু হতেই অমুখাপেক্ষী। কারণ, তিনি পেয়ে গেছেন মহান আল্লাহকেই। খাজা আবদুল্লাহ'র মতে আল্লাহর দাসের হৃদয় কেবল এই সক্ষমতার মাধ্যমেই প্রশান্তি পায়। আর এই প্রশান্তি সাত আকাশ ও জমিনের চেয়েও প্রশস্ত।

সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে দারিদ্র মানে দরবেশি যা বস্তুগত সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের ঠিক উল্টো। কিন্তু  আরেফদের মতে দারিদ্র বা দরবেশি হল আল্লাহর মুখাপেক্ষী হওয়া। দরবেশের এই চাহিদা দুনিয়া ও এর সব আকর্ষণ থেকে মুক্ত। আরেফ দরবেশি ও ফকিরির মাধ্যমে মহান আল্লাহর প্রেমের মধ্যে নিজেকে বিলুপ্ত করেন তথা ফানা-ফিল্লাহ এবং প্রকৃত ক্ষমতা অর্জন করেন।  

কোনো কোনো আরেফ মনে করেন খোদা-প্রেমের নানা পর্যায় বা মন্জিলগুলো অতিক্রমের জন্য জ্ঞান নামক সম্পদ বা পাথেয় থাকা জরুরি। অজ্ঞতা ও অসচেতনতা হচ্ছে খোদাপ্রেমিকের পথ থেকে বিচ্যুতির অন্যতম প্রধান কারণ। এক শ্রেণীর কথিত সুফি বা দরবেশ খোদাপ্রেমের পথে চলার জন্য জরুরি জ্ঞান এবং নিয়ম-কানুন সম্পর্কে ধারণা অর্জন না করেই এ পথে প্রবেশ করেন। ফলে তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুল করেন। খাজা আবদুল্লাহ আনসারি মনে করেন ইলম বা জ্ঞান-বিহীন আরেফ বা দরবেশ শয়তান ছাড়া অন্য কিছুই নয়। তার মত অজ্ঞতা আরেফদের জন্য এমন এক বিষ যা সালেক বা খোদাপ্রেমের অভিসারীকে ধ্বংসের দিকে টেনে নেয়। তার মতে জ্ঞানের আলো ছাড়া খোদা-প্রেমের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তবে তিনি খোদাপ্রেমিকের জন্য জ্ঞান অর্জনের  পাশাপাশি ও খোদার পরিচয় বা মারেফাত অর্জনকেও গুরুত্ব দেন। তার মতে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের ক্ষেত্রে জ্ঞান ও মারেফাত হলো চেরাগ এবং মইয়ের মতো কল্যাণকর। চেরাগ অন্ধকার দূর করে এবং মারেফাত খোদা-অন্বেষীকে ওপরের দিকে বা উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে আসে।  তাই খাজা আবদুল্লাহ'র মতে জ্ঞান হচ্ছে মারেফাত তথা খোদাকে চেনার অন্যতম হাতিয়ার মাত্র। আর মারেফাত নামক মইয়ে চড়ে খোদাপ্রেমিককে নীচের স্তর বেয়ে বেয়ে উপরে উঠে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছতে হয়।

সাধারণ মানুষের মতে তাওয়াক্কুল বা ভরসা করতে বোঝায় কারো ওপর আস্থা বা বিশ্বাস রাখা বা নির্ভর করা এবং তার কাছে নিজের অক্ষমতার কথা স্বীকার করা। কিন্তু আরেফদের মতে তাওয়াক্কুল  বা ভরসা করা হচ্ছে এমন কারো ওপর নিজের নানা বিষয় সমর্পণ করা যার রয়েছে ক্ষমতা ও যিনি বিশ্বস্ত। আরেফরা মনে করেন তাওয়াক্কুলের পর্যায়ে খোদাপ্রেমিক আল্লাহর ওপর ভরসা করে নিজেকে অন্য সব কিছু থেকে গুটিয়ে নেন। খাজা আবদুল্লাহর মতে তাওয়াক্কুলের চেয়ে বড় পর্যায় হচ্ছে তাসলিম বা আত্মসমর্পণ; আর তা তখনই হয় যখন খোদাপ্রেমিক নিজেকেই আল্লাহর ওপর সঁপে দেন। অথচ তাওয়াক্কুল হচ্ছে কেবল নিজের নানা বিষয় আল্লাহর হাতে সঁপে দেয়া নিজেকেই সঁপে দেয়া নয়। অন্য কথায় খাজা আবদুল্লাহর মতে তাওয়াক্কুল আল্লাহকে পাওয়ার একটি পর্যায় মাত্র চূড়ান্ত পর্যায় নয়। যে নিজের ভাগ্য ও পরিণতি –এসবই আল্লাহর হাতে সঁপে দেয় সে নিজের সব বিষয়ে আল্লাহর সব পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা মেনে নিয়ে প্রশান্তি অর্জন করে। তাসলিমকারী মনে করে ভালো ও মন্দ –এসব মানুষের মনের তৈরি কৃত্রিম বিষয়। আল্লাহ মানুষের জন্য যা করেন তা দেখতে মন্দ মনে হলেও আসলে তা-ই ভালো। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ৫