মে ১৯, ২০১৯ ১৫:৩৬ Asia/Dhaka

এমন কোনো শিক্ষিত ইরানি বা ফার্সিভাষীর কথা কল্পনাও করা যায় না যিনি নিজামির লায়লা ও মাজনুন কাব্যের ভূমিকা বা প্রথম দিকের কয়েকটি পংক্তির সাথে সুপরিচিত নন।

এই কাব্যের প্রথম দুই লাইনে তিনি বলেছেন:

 ای نام تو بهترین سرآغاز

بی نام تو نامه کی کنم باز

ای یاد تو مونس روانم

جز نام تو نیست بر زبانم

(এই না'মে তো বেহতারিন সারআগ'জ বিনামে তো নামে কেই কুনাম ব'জ

এই ইয়'দে তো মুনেসে রাভানাম জুয না'মে তো নিস্ত বর জবানাম।)

হে তুমি! সব কাজের শ্রেষ্ঠ সূচনা হয় তোমার নামেই / তোমার নাম ছাড়া আদৌ হয় কি কোনো কাজ?

হে তুমি! যাঁর স্মরণই প্রেম আমার হৃদয়ের/ওই  নাম ছাড়া আমার ঠোটে নেই কিছু জগতের!

গত পর্বে আমরা জেনেছি গঞ্জ বা গাঞ্জ অঞ্চলে বসবাস করতেন কবি নিজামি। বর্তমানে এ অঞ্চলটি আজারবাইজানের অংশ হলেও অতীতে এটি ছিল উত্তর ইরানের অংশ। গঞ্জে বা ক'ঞ্জ'চ'য়ি নদীর দুই তীরে অবস্থিত এই শহর বিখ্যাত ইরানি কবিদের জন্মস্থান হিসেবে বিশেষ ঐতিহ্যের অধিকারী। নিজামি ছাড়াও খাকানি, শেরওয়ানি, নারী কবি মাহসাতি ও আবুল আলা'র মত বিখ্যাত কবিদের আবাসস্থল ছিল এই গঞ্জ শহর। তাই এই শহরকে ফার্সি কবিতার গুরুত্বপূর্ণ এক কেন্দ্রও বলা যায়।

নিজামি গঞ্জ শহরে বসবাস করেছিলেন প্রায় সত্তুর বছর ধরে। এখানেই তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন হিজরি ৫৯৯ সনে। পরে তার কবরকে ঘিরে গড়ে ওঠে ছিদ্রযুক্ত ধাতব প্রাচীর ও জিয়ারত কেন্দ্র। নিজামির কবরটি নতুন গঞ্জ শহরে অবস্থিত। পুরনো গঞ্জ শহরটি যখন বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল তখনই গড়ে ওঠে নতুন গঞ্জ শহরটি। বর্তমানে নিজামির মাজারটি এক সুদৃশ্য সমাধি ও অপূর্ব স্থাপত্য-শৈলীর নিদর্শন হিসেবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

কবি নিজামির ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন সম্পর্কে খুব কম তথ্যই জানা যায়। নানা সূত্রে জানা যায় নিজামি এক সভ্রান্ত ও উচ্চ-বংশীয় পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন। তার পরিবার ছিল গঞ্জের এক নেতৃস্থানীয় পরিবার।  শৈশবে প্রচলিত নানা বিষয়ে পড়াশুনা করেছিলেন তিনি। নিজামির কবিতা থেকেই জানা যায় তিনি কৈশর এবং যৌবনে ফার্সি কবিতা ও গদ্য ছাড়াও রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন ও ধর্মীয় বিষয়েও বেশ জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।

নিজামির পরিবার যথেষ্ট সম্পদশালী পরিবার ছিল বলে তাকে অর্থ উপার্জন করতে হয়নি বা পেশাজীবী হওয়ারও দরকার হয়নি। ফলে যৌবনের শুরু থেকেই নিজামি নিজেকে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে নিয়ে কেবল পড়াশুনায়  ব্যস্ত থাকতেন। এ অবস্থায় বয়স চল্লিশের কোঠা পার না হতেই নিজামির আচার-আচরণে ও কথা-বার্তায় উচ্চ মানের পাণ্ডিত্য বা মীনীষার দীপ্তি দেখা যেত। 

নিজামি ছিলেন তার সময়ের অন্যতম প্রধান কবি। কিন্তু তিনি কবিত্বকে পেশা হিসেবে বেছে নেননি।  ফলে রাজা-বাদশাহদের গুণ-কীর্তণ ও তোষামুদি করার কোনো ছাপ তার কবিতায় কখনও দেখা যায়নি।   

নিজামি মসনাভি বা দ্বিপদী কবিতা ছাড়াও অনেক কাসিদা ও গজলও রচনা করেছেন। খামসেয়ে নিজামি বা নিজামির পঞ্চ-রত্ন ফার্সি সাহিত্যের অনন্য ও গৌরবময় সম্পদ।  গল্পকে ছন্দময় কাব্য ও কবিতার রূপ দিয়ে নিজামি ফার্সি কবিতা-সাহিত্যে এক অভিনব ধারার স্রস্টা হিসেবে অমর হয়ে আছেন।

সুললিত ও প্রাঞ্জল ভাষার জন্য নিজামি ফার্সি পদ্য সাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। আর এ কারণেই অন্য অনেক লেখক, কবি ও সাহিত্যিক নিজামির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন।

প্রখ্যাত ইরানি ইতিহাসবিদ অউফি'র মতে নিজামি তার মোহনীয় ভাষা ও কবিতার মাধ্যমে নানা গুণের সম্পদ ছড়িয়ে দিয়েছেন ফার্সি সাহিত্যে এবং সূক্ষ্মদর্শীতা ও অভিনবত্বের মত নানা সম্পদ উপহার দিয়েছেন বিশ্ববাসীকে।  

হিজরি নবম শতকের তথা খ্রিস্টিয় পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি জামি ছিলেন নিজামির সাহিত্য-ধারার অনুসারী। তিনি লিখেছেন, নিজামির পঞ্চ-রত্ন বা 'পাঁচ গঞ্জ' নামে খ্যাত মসনভি বা দ্বিপদী কাব্য-সিরিজকে বাহ্যিক দিক থেকে কিংবদন্তী বা রূপকথা বলে মনে হলেও আসলে তিনি রূপকথার গল্পচ্ছলে ধর্মীয় নানা জ্ঞান ও বাস্তবতাই তুলে ধরেছেন।   

'হাবিব আসসিইর' নামক বইয়ের লেখক খান্দমির নিজামির প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছেন, নিজামি যৌবনের শুরু থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত প্রশংসাসূচক কবিতা বা গজল লিখেছেন। কিন্তু তিনি কখনও অন্য অনেক কবির মত বৈষয়িক স্বার্থের পেছনে ছোটেননি এবং রাজা-বাদশাহ ও রাজ-অনুচরদের পাশে থাকতে চাননি।

নিজামির শক্তিশালী ও মোক্ষম ভাষা অন্য অনেক কবির ওপর ব্যাপক প্রভাব রেখেছিল। তাদের অনেকেই নিজামির অনুসরণে দ্বিপদী কাব্য লিখেছেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে জামি, আমির খসরু দেহলাভি, খাজু কেরমানি, ওয়াহশি বফকি এবং ওরফি শিরাজি'র মত প্রখ্যাত কবিদের কথা উল্লেখ করা যায়। 

ইরানি কবি ও ফার্সি কবিতার ওপর নিজামি গাঞ্জাভি'র কাব্য-সাহিত্যের প্রভাব তুলে ধরতে গিয়ে বিশিষ্ট গবেষক মুজতবা মিনুভি  লিখেছেন: এতে কোনো সন্দেহ নেই যে  নিজামির অনুসারী বা ছাত্রদের সংখ্যা তার শিক্ষকদের চেয়ে ছিল বেশি। যাদের মধ্যে কাব্য-প্রতিভা ছিল ও যারা পদ্যে গল্প লিখতেন তাদের জন্য নিজামির পাঁচ গঞ্জ  বা 'পঞ্চ-রত্ন' ছিল প্রিয় আদর্শ। এমনকি মহাকবি হাফেজও তার কবিতায় নিজামির অনুসরণ করেছেন এবং সাকিনামেহ ও মুগনিনামেহ  নামের কাব্য রচনা করেছেন নিজামির শারাফনামেহ ও ইকবালনামেহ'র অনুসরণে। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।