জুন ০২, ২০১৯ ১৫:২২ Asia/Dhaka

প্রখ্যাত ইরানি কবি নিজামি দর্শন ও ইসলামী ধর্মতত্ত্বের ব্যাপক জ্ঞান রাখতেন। তাই তার কাব্য বা সাহিত্য-কর্মে প্রজ্ঞা ও দর্শনের ব্যাপক প্রতিফলন দেখা যায়।

বিশেষ করে তার মাখজানুল আসরার, ইকবাল নামেহ ও মোকাদ্দমাহ-তে দর্শন আর প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্যের ব্যাপক প্রতিফলন দেখা যায়। তার এসব কীর্তিকে কেবল শিল্প ও কাব্য-রসের দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। নৈতিকতা, ইরফান বা ধর্মীয় রহস্যময় জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর দর্শনকে গল্পের ভেতর দিয়ে ও বিশেষ ভাষায় ফুটিয়ে তোলার জন্য নিজামি ফার্সি সাহিত্যে অমর ও অক্ষয় আসনের অধিকারী হয়ে আছেন।

নিজামি তার কোনো কোনো সাহিত্য কর্মে ইরানি দর্শন বা প্রজ্ঞা তুলে ধরেছেন। তিনি ফেরদৌসির পথ ধরে ইরানি দার্শনিক শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির ইশরাকি দর্শনকে তুলে ধরেছেন তার কোনো কোনো সাহিত্য কর্মে। সমাজের জনগণের জন্য নৈতিক ও শিক্ষামূলক বিষয়গুলো তুলে ধরতে উদগ্রীব ছিলেন নিজামি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন নিজামির বই মাখজানুল আসরার বা 'রহস্যের সম্পদ-ভাণ্ডার' শীর্ষক বইয়ে নৈতিক ও দার্শনিক বিষয়গুলো রয়েছে প্রকাশ্যে এবং 'হাফত্ পেইকার', লাইলি-মজনুন ও 'খসরু-শিরিন' শীর্ষক কাব্যগুলোতে এসব বিষয় রয়েছে সুপ্ত বা পরোক্ষভাবে।

হিজর ষষ্ঠ বা খ্রিস্টিয় দ্বাদশ শতকের ইরানি কবি নিজামি ছোট- বড় নানা গল্প ও দ্বিপদী কবিতা ব্যবহার করে সুন্দর আচরণ এবং উন্নত জীবনের শিক্ষা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। মানুষের সঙ্গে মানুষের আচরণ কেমন হওয়া উচিত এবং ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত তা উঠে এসেছে নিজামির গল্পগুলোতে। নিজামি তার কোনো কোনো সাহিত্য কর্মে সমাজের নানা সমস্যা এবং জনগণের সঙ্গে শাসকদের আচরণ বিষয়েও তার সমালোচনা ও মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। এভাবে তিনি দেখাতে চেয়েছে ন্যায়বিচার কী ও ন্যায়পরায়ন শাসক কারা। 

নিজামির লেখা এ ধরনেরই একটি শিক্ষামূলক গল্প হল সানজারের সুলতান ও বৃদ্ধার কাহিনী কিংবা নওশিরওয়ান ও তার মন্ত্রীর কিসসা। বৃদ্ধা ও সানজারের সুলতানের গল্পের মূল কথা হল ন্যায়বিচারকামী বৃদ্ধা সুলতানের কাছে কঠোর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন যে, জনগণ আপনার কাছ থেকে জুলুম ও অবিচার ছাড়া আর কিছুই পায়নি এবং তোমার কর্মকর্তা ও সেনারাও অপরাধযজ্ঞ আর জুলুম করছে। তিনি সুলতানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যদি মজলুমের ফরিয়াদের তির থেকে নিরাপদ থাকতে চাও তাহলে জুলুম বন্ধ কর।

নিজামির কবিতায় রয়েছে ইশ্‌ক বা চূড়ান্ত প্রেম, দয়ার অনুভূতি, তেজস্বিতা ও স্টাইল। আর এইসব দিক থেকেও নিজামির কবিতাগুলো খুবই সুসজ্জিত ও সমৃদ্ধ। ইরফানি ভাবধারা অনুযায়ী মুহাব্বাত বা ভালবাসার পরিপূর্ণতাই হচ্ছে ইশ্‌ক। আরেফ বা উচ্চতর ইসলামী আধ্যাত্মিক জ্ঞানের চর্চাকারীরা বিশ্বদৃষ্টি তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই ইশ্‌ককেই মানদণ্ড বা ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন। তারা মনে করেন গভীর প্রেম বা ইশকই হচ্ছে বাস্তবতা ও সৃষ্টি জগতের স্রস্টাকে চেনার মাধ্যম। এই ইশক বা গভীর ভালবাসার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে মানুষ। আর একজন আরেফ হিসেবে নিজামিও মনে করতেন জীবন আর অস্তিত্ব জগতের ভিত্তি হল ইশ্‌ক। 

নিজামি খসরু ও শিরিন কাব্যে লিখেছেন:

فلک جز عشق محرابی ندارد

جهان بی‌خاک عشق آبی ندارد.....

کسی کز عشق خالی شد فسرده است
گرش صد جان بود بی عشق مرده است

বিশ্ব চরাচরের একমাত্র আসন সেতো প্রেমই কেবল

শুকনো নীরস ভূমিতে জন্মে না প্রেমের নীলোৎপল ...

যে হৃদয়ে প্রেম নেই তা জরাজীর্ণ

শত প্রাণ থাকলেও প্রেমহীণ হৃদয় মৃত-সংকীর্ণ।

মধ্যযুগের ইরানি আরেফ কবি নিজামি গাঞ্জাভির মতে কেবল বুদ্ধিবৃত্তি আর প্রজ্ঞা দিয়ে সঠিক পথের দিশা মেলে না এবং জানা যায় না খোদায়ী জ্ঞান। নিজামি তার রহস্যের সম্পদ-ভাণ্ডার শীর্ষক কাব্যে আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, বুদ্ধিবৃত্তি বা আকল্‌ হচ্ছে কল্পনারই শ্রেণীভুক্ত এবং খোদায়ী বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাও কল্পনা, ভাবনা আর অনুভূতির মতই অক্ষম। তার মতে গভীর প্রেম বা ইশকের মদদ ছাড়া মহান আল্লাহকে উপলব্ধি করা ও খোদা-প্রেমের পথে হাঁটা সম্ভব নয়। আর এ জন্যই নিজামি তার সাহিত্য-কর্মের নানা অধ্যায়ে মাঝে-মধ্যেই উল্রেখ করেছেন যে খোদায়ী বাস্তবতা খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তি আর প্রজ্ঞা পথ চলে খোঁড়া পায়ের মতোই।

বিশেষজ্ঞরা নিজামিকে বিশেষ কোনো দার্শনিক ও ইসলামী ধর্মতাত্ত্বিক ঘরানার অনুসারী বলতে চান না। তিনি এমন এক দর্শন খুঁজে বেড়াতেন যার মূল রয়েছে পবিত্র কুরআনে।  

নিজামি মহান আল্লাহর সত্তা, তাঁর নাম ও গুণাবলী এবং মানুষের উৎস বিষয়ে বিশেষভাবে কথা বলেছেন। এসব বিষেয়ে তার গভীর জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা এমন এক ব্যক্তির মতই প্রকাশ পেয়েছে যিনি আধ্যাত্মিকভাবে বা হৃদয়ের চোখে দেখেছেন বিশ্বজগত আর আধ্যাত্মিকতাকে। এসব বিষয়ে নিজামির ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গী প্রখ্যাত আরেফদের ভাষার মতই।  আরেফদের মতই তিনি বলেছেন যে আল্লাহ কেবলই স্রষ্টা নন, তিনি সব অস্তিত্বের সুচনাকারী এবং সব প্রকাশিত বিষয়ের উৎস। অস্তিত্বধারী সব কিছুই  মহান আল্লাহর নাম ও গুণেরই প্রকাশ।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।