প্রখ্যাত ইরানি কবি নিজামির সাহিত্যকর্মের নানা দিক
হিজরি ষষ্ঠ শতকের তথা খ্রিস্টিয় দ্বাদশ শতকের অমর ইরানি কবি নিজামি গাঞ্জাভি ফার্সি কাব্য-সাহিত্যের এক জ্বলজ্বলে তারকা।
তাকে সেই সময়কার ফার্সি সাহিত্য ধারার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বও বলা যায়। ফার্সি কাব্য সাহিত্যে নিজামির অবদান কালোত্তীর্ণ হয়ে আছে এবং তা কখনও অবলুপ্ত হবে না। ফার্সি সাহিত্যের সমঝদার ও বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন: যতদিন এই পৃথিবী টিকে থাকবে ততদিন ফেরদৌসির মহাকাব্য শাহনামা, নিজামির পাঞ্জ গঞ্জ,জামির হাফত্ আওরঙ্গ আর রুমির‘মসনবি’ মহাকালের ঘর্ষণেও মুছে যাবে না।
ফার্সি সাহিত্যে নতুনত্ব ও অভিনবত্ব যোগ করে এক নতুন ধারার জন্ম দিয়ে গেছেন নিজামি। সৃজনশীল শব্দ ব্যবহার ও শব্দ চয়ন তার কবিতাকে দিয়েছে বিশেষ নান্দনিক সৌন্দর্য ও সুমিষ্টতা। বীরত্বগাঁথা ও প্রশংসাসূচক কবিতা রচনায় সৃজনশীলতার কারণে নিজামি ফার্সি সাহিত্যে এক অক্ষয় অবস্থান ও সম্মানের অধিকারী হয়েছেন।
কবিতা রচনার ক্ষেত্রে নিজামী প্রচলিত সব সাধারণ জ্ঞানের অভিজ্ঞতা ছাড়াও চিকিৎসা,দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা ও সঙ্গীত শাস্ত্রের অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগিয়েছেন। সূক্ষ্মদর্শিতা,সমৃদ্ধ ভাবধারা বা বিষয়বস্তু ও নজিরবিহীন ব্যাখ্যা নিজামির কবিতাকে করেছে অত্যন্ত উচ্চ মানসম্পন্ন। সুযোগ পেলেই কবিতায় পবিত্র কুরআনের বাণীর ভাবার্থ ব্যবহার করতেন তিনি। অন্যদিকে নিজামীর ভাষার স্টাইল ছিল সহজ-সরল,সাবলিল ও ঝরঝরে।
নিজামি তার কবিতায় চিত্রকল্প সৃষ্টিতে যেসব উপাদান ব্যবহার করেছেন তার আগের বড় বড় কবিরাও সেইসব উপাদান বা মাধ্যমই ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও নিজামির সাফল্য হল এটা যে তিনি তার কবিতার চিত্রকল্পগুলোতে দিতে পেরেছেন নতুন নতুন রং। উপমা, তুলনা ও চিত্রময়তা ব্যবহারে বিশেষ ধরনের সৃষ্টিশীল নৈপুন্য দেখিয়েছেন নিজামি। আর তাই নিজামির কবিতার চিত্রকল্প ও বর্ণনাগুলো হয়ে উঠেছে বাস্তব ঘটনার বর্ণনার মতোই বাস্তব।
অধ্যাপক গোলাম হোসেন ইউসুফির মত বিশ্লেষকদের মতে নিজামি বর্ণনার শিল্পে এতটাই দক্ষ ছিলেন যে তার হাতে কুৎসিততম দৃশ্যপটও হয়ে উঠত অনন্য সুন্দর। বিশেষ করে প্রকৃতির নানা দিকের বর্ণনায় নিজামি ছিলেন খুবই সুদক্ষ। নিজামির কবিতায় বসন্ত, শরৎ ও অভিনব রাতের কিছু চমৎকার দৃশ্যপট সবার দৃষ্টিকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
নিজামির বর্ণনার দক্ষতায় প্রতিটি বিষয় হয়ে উঠেছে অনুভবযোগ্য ও মূর্তমান এবং বৈশিষ্ট্যময়। এমনকি শুস্ক,নিরস ও প্রাণহীন বিষয়গুলোও তার ভাষাগত দক্ষতার গুণে যেন প্রাণময় ও সতেজ হয়ে পড়তো। মেঘ,বাতাস,আকাশ ও রাতের তারকারাজির মত নানা বিষয় কখনও কখনও নিজামির কবিতায় ব্যক্তিক বা মানবীয় চরিত্রে ভাস্বর হয়ে উঠেছে।
সাহিত্য সমালোচকদের মতে ফার্সি সাহিত্যে কিসসা-কাহিনী বর্ণনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার এবং উপস্থাপক ছিলেন কবি নিজামি। নিজামির কবিতার প্রতিটি গল্পই মানবিক আবেদন ও অনুভূতিতে ভরপুর। ফার্সি পদ্য সাহিত্যে গল্প বর্ণনায় দক্ষতার দিক থেকে নিজামিকে মহাকবি ফেরদৌসির সমমানের বলে মনে করেন বিশিষ্ট গবেষক ও সাহিত্য সমালোচক ডক্টর সায়িদ হামিদিয়ান।
নিজামির দ্বিপদী কবিতার পঞ্চ-রত্ন বা পাঞ্জগাঞ্জকে কেবল ফার্সি সাহিত্য-সম্ভারের ক্ষেত্রে নয় একইসঙ্গে বিশ্ব সাহিত্যেরও অমূল্য রত্ন হিসেবে ধরা হয়। ইউরোপসহ বিশ্বের নানা অঞ্চলে নিজামির এইসব কাব্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে এবং এমনকি এখনও নানা ধরনের গবেষণা,লেখালেখি,অনুবাদ ও বিশ্লেষণ হচ্ছে।
নিজামি বিষয়ক গবেষক, অনুবাদক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্রিটেনের উইলিয়াম জোনস, জার্মানির ফ্যান হ্যামার পারগেশতাল,উইলহ্যাম ব্যাচির ও হেলমুট রিটার, ইতালির ইতালো পিজ্জি এবং রাশিয়ার ইয়েভগেনি অ্যাডওয়ার্ডোভিচ বার্তেলসের নাম উল্লেখযোগ্য।
আবদুল মোনয়েম হাসানাইনও ইরানের বাইরে নিজামি বিষয়ক গবেষক ও লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন।
নিজামি গাঞ্জাভির পঞ্চ-রত্নের প্রথম কাব্যটি হল মাখজানুল আসরার বা রহস্যের খনি। নিজামি এ কাব্যটি এমন সময় রচনা করেছিলেন যখন তার বয়স যৌবনের সীমা অতিক্রম করেনি। সে সময় নিজামি আকল্ বা বুদ্ধিবৃত্তিকে প্রেমের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতেন। সে সময় তিনি এটা ভাবতেন না যে বুদ্ধিবৃত্তির পা কাঠের তৈরি বা দুর্বল। বরং ভাবতেন যে তা খোদায়ী জ্ঞান বা পরিচিতি তথা মারেফাত অর্জনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। নিজামি পরবর্তীকালে তার এই বিশ্বাস থেকে সরে আসেন এবং এটা মনে করতেন যে খোদায়ী বাস্তবতায় উপনীত হওয়ার একমাত্র পথ হল ইশক তথা প্রেম।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ নিজামির মাখজানুল আসরারকে হাকিম সানায়ির 'হাদিকাতুল হাকিকাত' বা সত্যের বাগান শীর্ষক কাব্যের সঙ্গে তুলনা করেন। নিজামির এই কাব্যের ওপর সানায়ির বিখ্যাত এই কাব্যের প্রভাব পড়েছে বলে তারা মনে করেন। তবে এই বিশ্লেষকর মতে মাখজানুল আসরার বিন্যাস ও বর্ণনাভঙ্গীর দিক থেকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সানায়ির হাদিকাতুল হাকিকাতের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। অন্যদিকে বিষয়বস্তুর দিক থেকে দেখলে দেখা যায় নিজামি তার এ কাব্যে ইতিবাচক নৈতিকতার পক্ষ নিয়ে জালিম ও জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। কিন্তু সানায়ির হাদিকাতুল হাকিকাতে ইরফানি দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে জুলুম সহ্য করার উপদেশ রয়েছে।
নিজামির মাখজানুল আসরারের গল্পগুলো মূলত নৈতিক উপদেশমূলক। আর মানুষই হচ্ছে এর কেন্দ্রীয় বিষয়। দ্বিপদী এই কাব্যে রয়েছে প্রশিক্ষণ ও ইরফানের সুর। কাব্যটি নিজামির সবচেয়ে স্বল্প-পরিসরের কাব্য এবং এর বেইত বা দুই পংক্তির শ্লোকের সংখ্যা দুই হাজার ৪০০। সূচনা বা ভূমিকার অধ্যায় ছাড়া নিজামির মাখজানুল আসরারে রয়েছে বিশটি অধ্যায়। আর এইসব অধ্যায়ের রয়েছে আলাদা নাম। এইসব অধ্যায়ের শুরুতে রয়েছে কিছু নৈতিক ও ইরফানি তথা খোদা-পরিচিত বা খোদাপ্রেম সম্পর্কিত নীতিবাক্য বা বিতর্ক। আর বিতর্কের শেষে রয়েছে এইসব নীতিবাক্য বা উপদেশকে আরও সহজভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য দৃষ্টান্তমূলক কিছু গল্প। শিক্ষণীয় এই গল্পগুলো উপমা-কেন্দ্রীক। এই গল্পগুলো কবিতার গল্পবিহীন অংশগুলোর চেয়ে কম জটিল বা সহজতর। এভাবে নিজামি সাধারণ মানুষের কাছে তাদের বোধগম্য ভাষায় নানা বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন।
নিজামির সাহিত্য-কর্মের নানা দিক সম্পর্কে আরও কথা বলব এই ধারাবাহিক আলোচনার আগামী পর্বগুলোতে। তখনও আমাদের সঙ্গ দিতে ভুলবেন না।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১০
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।