প্রখ্যাত ইরানি কবি নিজামির চিন্তাধারা
গত পর্বের আলোচনায় আমরা হিজরি ষষ্ঠ বা খ্রিস্টিয় দ্বাদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি নিজামির কাব্য ও কবিতার বিষয়বস্তু, স্টাইল, ভাষা ও শব্দের মান সম্পর্কে কিছু কথা বলেছি।
আমরা তার বিখ্যাত পঞ্চ রত্নের অন্যতম কাব্য মাখজানুল আসরার বা রহস্যের খনির নানা দিক নিয়েও কথা বলেছিলাম। রহস্যের খনিতে রয়েছে নানা ধর্মীয় উপদেশ। মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে ভাবতে এবং পরকালের জন্য প্রস্তুতি নিতেও উৎসাহ দেয়া হয়েছে এই কাব্যে। নিজামির মতে দুনিয়া এমন এক স্থান যা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অতিক্রম করতে হবেই। আর এ জন্য দরকার উপযুক্ত বাহন। নিজামির দৃষ্টিতে এই বাহন হল ধর্ম। আর এ বিষয়টি বোঝাতে নিজামি মাখজানুল আসরার বইয়ের নবম অধ্যায়ে একটি গল্পের অবতারণা করেছেন। গল্পে দেখা যায় একজন সাধক বা দরবেশ মসজিদ ছেড়ে দিয়ে নিকৃষ্ট স্থানে এসেছেন এবং এরপর তওবা করে দূষণমুক্ত হয়ে পুনরায় ধর্ম ও ইবাদতে মনোনিবেশ করেন।
নিজামির দৃষ্টিতে মানুষের রয়েছে অশেষ প্রতিভা। মানুষ যদি ফেরেশতাসুলভ আচরণ করতে পারে এবং উপলব্ধি ও অনুভূতিতে খোদামুখী হয় তাহলে তারা সৃষ্টি জগতের গর্ব হতে পারে বলে নিজামি মনে করতেন। মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও শিল্প-প্রতিভায় গভীর আস্থা ছিল তার। অন্যান্য সৃষ্টির তুলনায় মানুষের মূল শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই। আর তাই রহস্যের খনি শীর্ষক বইয়ে জ্ঞানের নানা কল্যাণ ও মানুষের মর্যাদার জয়গান গেয়েছেন নিজামি। তিনি মানুষকে এটা স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন যে তারা হচ্ছে সৃষ্টির সেরা জীব। নিজামি বিশ্বাস করতেন যে মানুষের দেহ ও মনের গঠনে রয়েছে পার্থিব ও আসমানি উপাদানের সংমিশ্রণ। আর তাই মানুষের রয়েছে দুই ধরনের বৈশিষ্ট: পার্থিব ও আসমানি তথা উচ্চ ও নীচ প্রকৃতির বৈশিষ্ট। নিজামি মনে করেন মানুষের বাহ্যিক অস্তিত্ব খুবই তুচ্ছ। কারণ তাতে রয়েছে কিছু মাটি ও পানি মাত্র। তাই তিনি মানুষের উচ্চতর প্রকৃতির ছবিগুলো তুলে ধরতে চেয়েছেন।
কবি নিজামির চিন্তাধারার কেন্দ্রস্থলে রয়েছে মানুষ। তাই নিজামির কাব্যের সব ঘটনা-প্রবাহ ও বিষয় মানুষের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এবং সরাসরি সম্পর্ক রেখে আবর্তিত হয়। আসলে নিজামি মানুষকে তার আত্মিক দিকের বিষয়ে সচেতন করতে চেয়েছেন এবং তাদেরকে প্রকৃত পূর্ণতায় পৌঁছাতে চেয়েছেন।
নিজামির দৃষ্টিতে মানুষের মন হচ্ছে আয়নার মত। দুনিয়ার লোভ, প্রবৃত্তির পূজা বা ইন্দ্রিয়-পূজা এবং নানা ধরনের পাপ এই আয়নায় নানা ধরনের ময়লা বা আবর্জনা জমিয়ে ফেলে। ফলে মানুষ তার প্রকৃতি অনুযায়ী কাজ করতে পারে না। নিজামি তার মাখজানুল আসরার বইয়ের মাধ্যমে মানুষের মন থেকে এসব ময়লা ও আবর্জনা দূর করার চেষ্টা চালিয়েছেন।
মাখজানুল আসরার বা রহস্যের খনি শীর্ষক কাব্য রচনার ক্ষেত্রে নিজামি হাকিম সানায়ির কাব্যগুলো বিশেষ করে সানায়ির হাদিকাতুল হাকিকাত বা সত্যের বাগান শীর্ষক কাব্যের স্টাইল ও পদ্ধতির ধারায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। আসলে সে যুগে সানায়ি ছিলেন বেশ জনপ্রিয়। তাই খাকানি, নিজামি ও জাহিরউদ্দিন ফারইয়াবির মত বড় বড় সমসাময়িক কবি সানায়ির কাব্য-স্টাইলের অনুসরণ করেছেন। এই বিখ্যাত কবিরা সানায়ির পথ ধরেই এগুনোর সিদ্ধান্ত নেন। মূলত এ কারণেই তাদের কাব্য ও কবিতায় সানায়ির গবেষণা ও শিক্ষণ-পদ্ধতির ছায়া বা প্রতিফলন দেখা যায়।
নিজামি মাখজানুল আসরার শীর্ষক কাব্য-রচনা শেষ করার পর নতুন কাব্য-রচনার ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের পদ্ধতি ও স্টাইল প্রয়োগ করেছেন। ফলে তার বক্তব্য উপস্থাপনার পদ্ধতি পুরোপুরি বদলে যায়।
নিজামির কাব্যগুলোর মধ্যে খসরু ও শিরিন,লাইলি ও মাজনুন,হাফত্ পেইকার ও ইস্কান্দারনামেহ’র দিকে দৃষ্টি দিলে তার এই কাব্যগুলোর ভাষা,শব্দ ও কাঠামোর সঙ্গে তারই রচিত এর আগের কাব্য মাখজানুল আসরারের ভাষা,শব্দ ও আঙ্গিক-অবয়ব বা কাঠামোগত রূপের ব্যাপক পার্থক্য বোঝা যায়। এক্ষেত্রে তুলনামূলক দৃষ্টি দিলে সবার কাছেই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে নিজামি মাখজানুল আসরার কাব্য লেখার পর থেকে নতুন কাব্যগুলো রচনায় শিক্ষণ বা যোগাযোগের প্রত্যক্ষ পদ্ধতি বাদ দিয়ে পরোক্ষ পদ্ধতি ব্যবহারকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
নিজামি শিক্ষণ বা যোগাযোগের নতুন পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে চেয়েছেন তার চিন্তাধারা ও বিশ্বাসকে সর্বোত্তম ভাষা বা বার্তার মাধ্যমে তুলে ধরতে।
ইরানি কবি নিজামির সর্বশেষ ভাবনার সারাংশ ছিল এটা যে জীবন ও সৃষ্টি জগতের মূল অক্ষ বা কেন্দ্র হল খোদা-প্রেম বা খোদায়ী ইশক। আর এই প্রেম হল প্রজ্ঞাপূর্ণ ও দর্শন-সমৃদ্ধ।
তাইতো তিনি লিখেছেন:
ز سوز عشق بهتر در جهان چیست؟
که بی او گل نخندید، ابر نگریست
گر اندیشه کنی از راه بینش
به عشق است ایستاده آفرینش
گر از عشق آسمان آزاد بودی
کجا هرگز زمین آباد بودی
প্রেমের দহনের চেয়ে বিশ্বে ভালো কি কিছু আছে আর?
প্রেম না থাকলে ফুটতো না ফুল নামতো না বৃষ্টি বরষার।
যদি খিল খুলে প্রজ্ঞার,মেলে দাও পাখা ভাবনার
দেখবে সৃষ্টি-জগতের বৃন্তভার বইছে খোদায়ী প্রেম-উদার।
যদি আসমানি ওই প্রেমের বাঁধন হত ছিন্ন
মর্তের কোথাও দেখতে পেতে কি সমৃদ্ধির কোনো চিহ্ন?
মাখজানুল আসরার বা রহস্যের খনি শীর্ষক কাব্য রচনা শেষ করার পর নিজামি তার বাদবাকি জীবনকে উৎসর্গ করেছেন স্বপ্নের বা আদর্শ রাষ্ট্রের সন্ধানে অশেষ ধৈর্য নিয়ে। এ সময় তিনি যেসব কবিতা লিখেছেন তার সবই যেন ছিল মুক্তির এক একটি সোপান যা তাকে মুক্ত রাখত চলমান কষ্ট-সহিষ্ণু জীবনের ক্লান্তি থেকে এবং মানব-সমাজের নানা সংকটের ধকল, অজ্ঞতা ও শাসকদের বল্গাহীনতা বা উচ্ছৃঙ্খলা থেকে। এভাবেই তিনি উপহার দিয়েছেন তার কবিতার পাঠকদের কাছে উন্নততর বিশ্বের কিছু চিত্র।
নিজামির সাহিত্য ও তার ভাবনা নিয়ে আমরা আরও কথা বলব আগামী আসরে। আশা করছি তখনও আমাদের সঙ্গ দিতে ভুলবেন না। #
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।