হিজরি ষষ্ঠ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি নিজামির সাহিত্য-কর্ম
নিজামির কাব্য-সাহিত্য এবং তার বিশ্বাস ও চিন্তাধারা নিয়ে আমরা কথা বলছিলাম গত কয়েক পর্বে। নিজামি তার সমস্ত কবিতায় চেয়েছেন এমন এক সমাজের সন্ধান যেখানে থাকবে না অবিচার,পেরেশানি;বরং থাকবে সব সৎগুণের সমাহার ও বিবেকের কর্তৃত্ব।
আর মুক্তির এই চূড়ান্ত মঞ্জিলে পৌঁছার জন্য নিজামি একে একে অতিক্রম করেছেন সাধনার বহু মঞ্জিল বা সোপান। তার এক একটি কবিতাই যেন সেইসব সোপান বা সাধনা ও গবেষণার অগ্রযাত্রার পথে এক একটি স্তর যা ক্রমেই তাকে পৌঁছে দিয়েছে তার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের দেশ বা আদর্শ রাষ্ট্রের দোরগোড়ায়।
ইরানের ফার্সী-ভাষী মহাকবি নিজামি তার চিন্তাধারা ও বিশ্বাস তুলে ধরার জন্য রচনা করেছিলেন মাখজানুল আসরার বা রহস্যের খনি শীর্ষক কাব্যসহ আরও অনেক কাব্য। মাখজানুল আসরার রচনার মাধ্যমে তিনি তার কাব্য রচনা শুরু করেন। এই কাব্যে বিধৃত নিজামির চিন্তাধারা ছিল যুক্তি ও দলিল-প্রমাণ-ভিত্তিক। কাব্যটির নানা গল্পই তার প্রমাণ। কিন্তু এরপর থেকে নিজামির কাব্য-সাহিত্য চর্চা অব্যাহত থেকেছে প্রেমের-বাণী তুলে ধরার মাধ্যমে। এ সময়ে তিনি উপহার দেন লাইলি ও মাজনুন এবং খসরু ও শিরিন শীর্ষক প্রেম-কাহিনী-ভিত্তিক দুই অমর কাব্য। এ দুই অমর প্রেম কাহিনীতে দেখা যায় দুই প্রেমিক যুগলের মধ্যে এক যুগল পরস্পর মিলনে সক্ষম হন আর অন্য যুগল হৃদয়-বিদারক চির-বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়েছেন। অবশ্য এ উভয় প্রেম কাহিনীই শেষ হয়েছে প্রধান চরিত্রগুলোর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
নিজামির খসরু ও শিরিন শীর্ষক কাব্যের কাহিনীতে দেখা যায় তারা পরস্পরকে বিয়ে করেন। কিন্তু বিয়ের পর খসরু তারই পুত্র শিরুইয়ের হাতে নিহত হন এবং গল্পটি দুই প্রধান চরিত্র খসরু ও শিরিনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
আর নিজামির 'লাইলি ও মাজনুন' শীর্ষক কাব্যের গল্পে দেখা যায় লাইলি ও মজনুর মধ্যে কখনও মিলন ঘটেনি এবং তাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই কাহিনী।
নিজামির লেখা প্রেম-কাহিনী ভিত্তিক এ দুই কাব্যেরই দুই প্রধান চরিত্রে স্থান পেয়েছে দুই নারী। আর এ দুই কাব্যের পুরো কাহিনীই মূলত আবর্তিত হয়েছে এ দুই নারীর ব্যক্তিত্ব, জীবন ও তাদের নৈতিক বৈশিষ্ট্যগুলোর বর্ণনার মধ্য দিয়ে। নিজামি যে আদর্শ মানব সমাজের ছবি আঁকতে চেয়েছেন তার প্রথম পদক্ষেপ শুরু হয়েছে এখান থেকেই। নিজামি এ দুই কাব্যেই নারীকে দিয়েছেন উচ্চ মর্যাদা।
নিজামির দৃষ্টিতে নারী উচ্চ পর্যায়ের মানুষ। তিনি নারীর মধ্যে খুঁজেছেন মানুষকে ও মানুষের পূর্ণতাকে। নিজামির দৃষ্টিতে শিরিন এক আদর্শ ও পরিপূর্ণ নারীর দৃষ্টান্ত। তিনি নারীর সমস্ত ভালো গুণ ও যোগ্যতাগুলোর সমাবেশ ঘটিয়েছেন শিরিনের মধ্যে। পরিপূর্ণ সতী ও পবিত্র নারী শিরিনের মৃত্যুতে চমৎকার শোক-গাঁথাও রচনা করেছেন নিজামি। তিনি বিশ্বাস করতেন এই রূপকথার কাহিনীর অন্যতম মূল চরিত্র শিরিনের মৃত্যুতে শোকাহত হবে যে কোনো পাঠক।
নিজামি 'লাইলি ওয়া মাজনুন' এবং 'খসরু ওয়া শিরিন' শীর্ষক দুটি কাব্য লেখার পর নিজের লক্ষ্য অর্জনে স্বপ্নের জগতে পা রাখেন এবং হাফত পেইকার নামক কাব্য রচনার মাধ্যমে নিজের আশা ও আকাঙ্ক্ষাগুলো তুলে ধরেন।
নিজামির হাফত পেইকার বা সাত রাণীর মুখ শীর্ষক কাব্য ইরানের সাসানীয় বংশের সম্রাট বাহরাম গুরের কাহিনী নিয়ে রচিত। তার জন্ম থেকে মৃত্যুর ঘটনা রয়েছে এই কাব্যে। এ কাব্য বাহরামনামেহ নামেও পরিচিত। এই কাব্য-কাহিনীতে তুলে ধরা হয়েছে সাসানিয় সম্রাট বাহরাম ও তার সাত স্ত্রীর কাহিনী। তার সাত রাণীর একজন ছিলেন ভারতের,একজন চীনের,একজন খাওয়ারেজমের,একজন রাশিয়ার ও পারস্যের এবং বাকিরা ছিলেন পশ্চিমা দেশগুলোর। আর প্রত্যেক রাণীর জন্যই সম্রাট বাহরাম তাদের নিজ নিজ দেশের অনুকরণে প্রাসাদ তৈরি করে দিয়েছিলেন। সম্রাট প্রত্যেকের ঘরে এক রাত করে থাকতেন এবং সেই রাতে রাণী তার নিজের তৈরি গল্প সম্রাটকে শোনাতেন। সংক্ষেপে এই হচ্ছে হাফত্ পেইকারের কাহিনী। কাহিনী শেষে থাকত বাহরামের নিষ্ঠুর ও অবিচারপূর্ণ শাসনের বর্ণনা এবং তার মৃত্যুর পরিণতি। সাত রাণীর কাহিনীর সাতটি কাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে রোমান্টিক ও আকর্ষণীয় কাহিনী ভারতীয় রাজকন্যার কাহিনী। এই কাহিনীগুলো আরব্য উপন্যাসের হাজার রাতের কাহিনী তথা আলিফ-লায়লার কাহিনীগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
অধ্যাপক জাররিনকুবের মতে নিজামির কাব্য-প্রতিভা, গল্প বর্ণনা ও রচনার নৈপুন্য সর্বেচ্চ মাত্রায় প্রকাশ পেয়েছে হাফত পেইকার শীর্ষক কাব্যে। হাফত পেইকার পড়লে মনে হবে তা যেন অনেক মানুষের প্রাণচাঞ্চল্য ও উদ্দামতায় ভরপুর এক জীবন্ত জগত। কিন্তু সক্রিয় এই মানুষেরা পূর্ণতা ও ভবিষ্যতমুখী নয়। নিজামি মানুষকে মানবীয় পূর্ণতায় ও আদর্শ রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য রচনা করেছেন ইস্কান্দারনামেহ শীর্ষক কাব্য। নিজামি প্রাচ্যের একজন কবি হিসেবে ম্যাসিডোনিয়ার আলেক্সান্ডারকে যেভাবে দেখেছেন তা-ই তুলে ধরেছেন তার এই কাব্যে। গ্রিকরা আলেক্সান্ডারকে যেভাবে দেখে তাকে সেভাবে দেখেননি নিজামি। তার মতে আলেক্সান্ডার কেবল একজন দ্বিগিজয়ী বা বিশ্বজয়ী ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, একইসঙ্গে তিনি ছিলেন একজন চিন্তাবিদ যিনি সাধক ও দার্শনিকদের সঙ্গে আলোচনা করতেন।
নিজামির আলেক্সান্ডার ধর্ম সম্পর্কে জানতেন ও হজব্রতও পালন করতেন। তিনি বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়াতেন এবং বিশ্বের নানা বিষয় থেকে উপদেশ গ্রহণ করতেন। আলেক্সান্ডার তথা ইস্কান্দার অবশেষে আবে-হায়াত তথা চিরঞ্জীব হওয়ার বিশেষ পানীয়ের সন্ধান শুরু করেন এবং এমন এক দেশে পৌঁছেন যা তারই কাঙ্ক্ষিত আদর্শ রাষ্ট্র।
ইরানি কবি নিজামি তার ইস্কান্দারনামেহ শীর্ষক কাব্যে আলেক্সান্ডারকে এমন এক রাষ্ট্র খুঁজে পেতে দেখেন যা আসলে নিজামিরই কাঙ্ক্ষিত আদর্শ বা স্বপ্নের রাষ্ট্র। এ এমন এক দেশ যেখানে নেই যুদ্ধ, ষড়যন্ত্র, মিথ্যাচার ও প্রতারণা। সেখানে সব মানুষই প্রাকৃতিক অন্য যে কোনো সম্পদের মত শক্তির ক্ষেত্রেও ভারসাম্যের অধিকারী এবং সেখানে বিরাজ করে সততা ও প্রশান্তি। আসলে নিজামি চেয়েছেন মানুষ যেন এ ধরনের একটি আদর্শ রাষ্ট্রের অধিকারী হওয়ার বিদ্যা বা যোগ্যতা অর্জন করে। তার মতে এ জন্য মানুষকে নৈতিক দিক থেকে হতে হবে উন্নত এবং মানুষের প্রকৃতিগত সৎ-গুণগুলোর প্রতি আস্থাশীল।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।