আগস্ট ০৩, ২০১৯ ১৩:৫১ Asia/Dhaka

গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যায় নানা আবিস্কার ও উদ্ভাবনের জন্য খ্যাত ইরানি বিজ্ঞানী আবুল ওয়াফায়ে বুযজানি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ৩২৮ হিজরির পয়লা রমজান। তার জন্মস্থান বুযজান শহরটি ইরানের বর্তমান খোরাসান অঞ্চলের তোরবাত জাম শহরের কাছে। তার আসল নাম মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ বিন ইয়াহ্‌ইয়া।

আবুল ওয়াফায়ে বুযজানির নাম দেখা যায় ইবনে নাদিমের আলফেহরেস্ত নামক বইয়ে বড় বিজ্ঞানীদের নামের তালিকায়। কারণ তিনি ছিলেন প্রখ্যাত মনীষী ও বিজ্ঞানী ইবনে নাদিম  এবং আবু রায়হান বিরুনির সমসাময়িক।

বুযজানি গণিতের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেছিলেন তার মামা ও চাচার কাছ থেকে। তারা দু'জনই ছিলেন সে যুগের বিখ্যাত গণিতজ্ঞ। ৩৪৮ হিজরিতে মাত্র ২০ বছর বয়সে উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের জন্য বুযজানি বাগদাদে যান।  তিনি শারাফ আদদৌলার কাছে যান। এই বিজ্ঞানীর নির্মিত মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা মানমন্দিরে কাজ করেন বুযজানি। সেখানে তার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন আবু সাহল বিজ্বান।

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক জর্জ সার্টনের মতে হিজরি চতুর্থ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ ছিল আবুল ওয়াফা বুযজানির জ্ঞানগত কর্তৃত্ব বা খ্যাতির যুগ। এ যুগে ইউরোপ ছিল দ্বন্দ্ব-সংঘাতে নিমজ্জিত। সামন্ত প্রথা ও শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর কুসংস্কারাচ্ছন্ন গির্জার কর্তৃত্বের কারণে সে যুগে ইউরোপে জ্ঞানের সব ধরনের অগ্রগতির পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

অন্যদিকে এ যুগে বাগদাদের কথিত খেলাফত দুর্বল ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। জনগণ দারিদ্র ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাত। চীন, ভারত ও জাপানেও জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে তখন চলছিল প্রবল মন্দা।  অথচ এ সময় ইরানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অবস্থা ছিল বেশ রমরমা।

আবুল ওয়াফা বুযজানির জন্মের যুগে খোরাসানের ওপর কর্তৃত্ব চলছিল সামানিয় শাসকদের। সামানিয়রা ফার্সি ভাষা ও ইরানি কৃষ্টি আর প্রথাকে গুরুত্ব দিত। অন্য মাজহাব বা ধর্মগুলোর ব্যাপারেও তারা ছিল না কঠোর। এ স্থিতিশীল অবস্থায় ইরান ও খোরাসান হয়ে পড়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা এবং জ্ঞান-পিয়াসীদের বেহেশত। এ অবস্থায় বই বিক্রির দোকান ও লাইব্রেরির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছিল ইরানে। ফলে সে সময় এ অঞ্চলে জন্ম নেন আবু রায়হান বিরুনি ও ইবনে সিনার মত জগত-বিখ্যাত বিজ্ঞানী এবং পণ্ডিত। আর ইরানি গণিতবিদরাও এ যুগে গণিত শাস্ত্রের উন্নয়নে মৌলিক ভূমিকা রাখেন।

আবুল ওয়াফা বুযজানি গণিতের নানা শাখায় যেমন, ত্রিকোনোমিতি, ক্যালকুলাস, ব্যবহারিক জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যা, পাটি গণিত ও বীজ গণিতের উন্নয়নে ব্যাপক অবদান এবং উদ্ভাবনী ও সৃষ্টিশীল ভূমিকা রাখেন। বুযজানি সঙ্গীতেও দক্ষতা রাখতেন। তবে এক্ষেত্রে তার খ্যাতি গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার মত অত ব্যাপক ছিল না। জ্যামিতি ও ক্যালকুলাসে দক্ষতার জন্য বুযজানিকে 'হাসেব বা হিশাববিদ' এবং 'মুহান্দেস বা প্রকৌশলী' উপাধি দেয়া হয়েছিল।

জ্ঞান চর্চার জন্য বাগদাদে আসার পর কয়েক বছর না যেতেই আবুল ওয়াফা বুযজানি তার যুগের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী ও পণ্ডিত হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি বাগদাদে জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত গবেষণায়ও জড়িত ছিলেন। বুযজানি কিছুকাল বাগদাদের একটি হাসপাতালেরও তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন।

দেশ-বিদেশের পণ্ডিত ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে জ্ঞান-বিজ্ঞান বিষয়ে লিখিত যোগাযোগও রাখতেন আবুল ওয়াফা বুযজানি। যেমন, প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ আবু আলী হুবুবি, আবু রায়হানি বিরুনি প্রমুখের সঙ্গে পত্র যোগাযোগ রাখতেন তিনি। ইরাকের আবু হাইয়ান তাওহিদি ও আবু নাসর বুযজানিকে 'শেইখ' বলে সম্বোধন করতেন। আবু রায়হান বিরুনি ও বুযজানি পরস্পরকে বিজ্ঞান গবেষণার বিষয়ে সহযোগিতা করতেন। বিরুনি যখন খাওয়ারেজমে ও বুযজানি যখন বাগদাদে ছিলেন তখন একবার এক চন্দ্রগ্রহণ পর্যবেক্ষণের বিষয়ে তারা পরস্পরকে নিজ নিজ অঞ্চলের পর্যবেক্ষণের ফলাফল জানানোর পদক্ষেপ নেন যাতে উভয়ের ফলাফলের মধ্যে তুলনা করা সম্ভব হয়।

আবুল ওয়াফা বুযজানি অতীতের ইরানি ও গ্রিক বিজ্ঞানীদের অনেক বইয়ের ব্যাখ্যা লিখে গেছেন। যেমন, ইউক্লিডের 'প্রিলিমিনারিস' বা 'এলিমেন্টস' তথা প্রাথমিক বিষয়াদি ও উপাদান, খাওয়ারিজমির আল জাবর ওয়াল মুকাবেলা, টলেমির 'আলম্যাজেস্ট' ও  দাওফান্তাসের 'যাব্‌র'  শীর্ষক বইগুলোর অনুবাদসহ ব্যাখ্যা লিখেছেন বুযজানি।

ইরানি গণিতজ্ঞ বুযজানি ত্রিকোনোমিতি ও জ্যামিতিতে অনেক নতুন বিষয় যুক্ত করেছেন তথা আবিস্কার ও উদ্ভাবন উপহার দিয়েছেন। যেমন, বৃত্তিয় বা গোলকীয় ত্রিভূজের ক্ষেত্রে সাইন কোনগুলোর সমীকরণ তথা সূত্র আবিস্কার করেছিলেন বুযজানি।

আবুল ওয়াফা বুযজানির লেখা বইগুলোর কোনো কোনোটি এখন আর দেখা যায় না। তার এরকম একটি বইয়ের নাম ছিল যিজ আল ওয়াদিহ। বইটি ছিল জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত।

বুযজানির অনূদিত উল্লেখযোগ্য বইগুলোর একটি হল গ্রিক বিজ্ঞানী টলেমির লেখা গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক বইয়ের অনুবাদ কিতাব আল ম্যাজিস্টি। তিনি এর ব্যাখ্যাও লিখেছেন। বর্তমানে বইটির কেবল প্রথম সাতটি প্রবন্ধ বা অধ্যায় টিকে আছে।

বুযজানির লেখা আরও দু'টি বিখ্যাত বই হল 'শিল্পকলায় জড়িত ব্যক্তিদের জন্য জরুরি জ্যামিতিক কাঠামো বিষয়ক বই' এবং 'অঙ্কনশিল্পী ও ব্যবসায়ীদের জন্য জরুরি পাটিগণিত শাস্ত্র' শীর্ষক বই। প্রথমোক্ত বইটিতে রয়েছে সপ্তকোণ-ক্ষেত্র বা হেপ্টাগনসহ একশ'রও বেশি জ্যামিতিক কাঠামো। এইসব কাঠামোর ব্যাখ্যা দেয়া ছাড়াও তিনি সেগুলোকে অন্যান্য গাণিতিক বাখ্যার সঙ্গে তুলনা করেছেন। আর বুযজানির লেখা দ্বিতীয়ক্ত বই তথা পাটিগণিত বিষয়ক বইটি এ জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে এ বইয়েই প্রথমবারের মত ঋনাত্মক সংখ্যাগুলো ব্যবহার করা হয়েছে যা মধ্যযুগের ইসলামি টেক্সটে ব্যবহার করা হত।  #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।