আগস্ট ১৪, ২০১৯ ১৩:০৫ Asia/Dhaka

গত পর্বের আলোচনায় আমরা হিজরি চতুর্থ শতকের তথা খ্রিস্টিয় দশম শতকের প্রখ্যাত ইরানি গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী আবুল ওয়াফায়ে বুযজানি'র জীবন ও নানা অবদান সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম।

এ প্রসঙ্গে শাসকদের সহায়তার কারণে সে যুগের ইরানে তথা বৃহত্তর ইরানে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার অনুকুল পরিবেশ এবং প্রখ্যাত মনীষী ও বিজ্ঞানীদের জন্ম নেয়ার কথা উল্লেখ করেছি।

আবুল ওয়াফায়ে বুযজানি'র বহুমুখি প্রতিভা সম্পর্কেও আমরা ইঙ্গিত করেছি। আর বিশেষভাবে ত্রিকোনোমিতি ও জ্যামিতিসহ গণিতের নানা শাখায় তার অবদানের আংশিক কিছু দিক আমরা তুলে ধরেছিলাম। 

বুযজানির লেখা ক্যালকুলাস ও পাটি গণিত বিষয়ক দু'টি বই 'শিল্পকলায় জড়িত ব্যক্তিদের জন্য জরুরি জ্যামিতিক কাঠামো বিষয়ক বই' এবং 'অঙ্কনশিল্পী ও ব্যবসায়ীদের জন্য জরুরি পাটিগণিত শাস্ত্র' শীর্ষক বই গণিতের ব্যবহারিক প্রয়োগ বিষয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বই হিসেবে স্বীকৃত।

বুযজানি'র ক্যালকুলাস বিষয়ক বইটির প্রথম দুই অধ্যায়ে রয়েছে মূল বা তাত্ত্বিক আলোচনা এবং তৃতীয় থেকে সপ্তম অধ্যায়ে রয়েছে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক আলোচনার মিশ্রন। বইটি বুযজানি লিখেছিলেন হিজরি ২৭২ সন থেকে ৩৬৭ হিজরির মধ্যে। বইটি তিনি আসাদুদৌলা দেইলামির জন্য লিখেছিলেন বলে নিজেই উল্লেখ করেছেন।

আবুল ওয়াফায়ে বুযজানি'র লেখা আরেকটি উল্লেখযোগ্য বইয়ের নাম 'ব্যবহারিক জ্যামিতি'। এ বইটির প্রথমেই বুযজানি এমন কিছু যন্ত্রপাতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন যেগুলো জ্যামিতিক ভবন নির্মাণের কাজে ব্যবহার করা জরুরি। এরপর তিনি ভবন নির্মাণ বিষয়ক খুব সাধারণ জ্যামিতিক-ব্যবহার বা প্রয়োগগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন।  আর এই ব্যাখ্যাগুলোর পর বুযজানি জটিলতর জ্যামিতিক কাঠামোর বিষয়ে আলোচনা করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি জ্যামিতিক সমস্যাগুলো সমাধানের কয়েক ধরনের পদ্ধতিও যুক্তি-প্রমাণসহ তুলে ধরেছেন এবং ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সেগুলোর বৈজ্ঞানিক গুরুত্বও ব্যাখ্যা করেছেন।  

বুযজানি তার ব্যবহারিক জ্যামিতি শীর্ষক বইয়ে মহাকাশ-বিষয়ক জ্যামিতিক কাঠামো নিয়েও আলোচনা করেছেন। পৃথিবীর ওপরে নানা জ্যামিতিক কাঠামো আঁকা, কার্পেট, টাইলস ও ফুলের নক্সা সংক্রান্ত নানা জ্যামিতিক কাঠামো আঁকার নানা দিক এবং এ সংক্রান্ত নানা সমস্যা ও সেসবের সমাধান নিয়ে আলোচনা করতেও ভুলেননি বুযজানি।

'আল ম্যাজিস্টি' গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ে বুযজানির এক অনন্য গুরুত্ববহ বই। বইটির একটি কপি প্যারিসে দেখা যায়। অনেক গবেষক বইটিকে টলেমির লেখা বইয়ের অনুবাদ বলতে রাজি নন। তারা বলেন বুযজানির 'যিজ আল ওয়াদিহ' নামের হারিয়ে-যাওয়া যে বইটির কথা বলা হয় 'আল ম্যাজিস্টি'ই হল সেই বইটি। কিন্তু আবু রায়হান বিরুনির মতে  'যিজ আল ওয়াদিহ' ও  'আল ম্যাজিস্টি' --দু'টি পৃথক বই।

'আল ম্যাজিস্টি' শীর্ষক বইয়ে মহাকাশের নানা গ্রহ-নক্ষত্রের গতি সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়েছেন বুযজানি এবং এ বইয়ের মাধ্যমেই মূলত তিনি ত্রিকোনোমিতি শাস্ত্রের গোড়া-পত্তন করেছেন।  এ বইয়ে বুযজানি কিবলার দিক নির্নয়ের পদ্ধতি ও বৃত্তিয় বা গোলকীয় ক্ষেত্রে তথা মহাকাশের ত্রিকোনোমিতি এবং সমতলের ত্রিকোনোমিতি নিয়েও অলোচনা করেছেন।  বলা হয় আলম্যাজিস্টি বইটির সাতটি অধ্যায়েরও অনেক বেশি অধ্যায় ছিল। কিন্তু বর্তমানে কেবল সাতটি অধ্যায় বা প্রব্ন্ধই টিকে আছে।

বুযজানি তার আলম্যাজিস্টি বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন যে তিনি জ্যামিতিক সমস্যাগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে জ্যামিতিক পদ্ধতি এবং সংখ্যাগত সমস্যাগুলোর সমাধানে সংখ্যাগত যুক্তি প্রমাণ ব্যবহার করেছেন যাতে যেসব ব্যক্তি এ দুই বিজ্ঞানের  উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষ নয় তাদের জন্য সমস্যা দেখা না দেয়। বইটি নানা জটিল গাণিতিক বিষয় সম্পর্কিত হওয়া সত্ত্বেও বুযজানি তা খুব সহজ ভাষায় লিখেছেন।

আবুল ওয়াফায়ে বুযজানি'র আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল 'ফি মারিফাতিল আবয়াদু বাইনাল মাসাকিন' তথা 'দুই শহরের দূরত্ব মাপা সংক্রান্ত আলোচনা' শীর্ষক পুস্তিকা। তিনি এ পুস্তিকায় বাগদাদ থেকে পবিত্র মক্কা পর্যন্ত শহরের দূরত্ব মাপার দুই পৃথক পদ্ধতি তুলে ধরেন। আর এ দুই পদ্ধতির মাধ্যমে অন্য শহরগুলোর ব্যবধানও বের করার পথ দেখিয়ে দেন। এ পুস্তিকা বুযজানির ব্যাপক জ্ঞান ও হিসাব বিজ্ঞান বা গণিতে তার অনন্য প্রতিভাও সবার কাছে স্পষ্ট করে দেয়।

বুযজানির অনেক বই ও প্রবন্ধ আজকাল আর পাওয়া যায় না। তবে তার এইসব বই ও প্রবন্ধের তালিকা দেখা যায় ইবনে নাদিমের আলফেহরিস্ত বা সূচিপত্র নামক বইয়ে।

এ সূচিপত্র অনুযায়ী 'জিযে কামিল' বা 'জ্যোতির্বিদ্যার পূর্ণাঙ্গ সারণী বা টেবিল' শীর্ষক বুযজানির একটি বই ছিল। বইটিতে ছিল তিনটি প্রবন্ধ। প্রথম প্রবন্ধটি ছিল গ্রহ-নক্ষত্রের গতি সঞ্চারণের আগের অবস্থা সম্পর্কিত। আর দ্বিতীয় প্রবন্ধে ছিল গ্রহ-নক্ষত্রের গতিশীল অবস্থা সম্পির্কত এবং তৃতীয় প্রবন্ধটি ছিল গ্রহ-নক্ষত্রের চলার পথে বাধা বিষয়ক।   

আবুল ওয়াফায়ে বুযজানি মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ ধরনের দেয়াল-চাঁদা নির্মাণ করেছিলেন। তিনিই প্রথমবারের মত এ ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করেন। বুযজানিই  সাইন টেবিল বা সারণী মাপার নতুন কিছু কৌশল আবিস্কার করেছিলেন। ফলে অতীতের বিজ্ঞানীদের টেবিলের চেয়ে তার টেবিল বা সারণী বেশি সঠিক বা যথাযথ হয়েছিল। গোলকীয় ত্রিভুজের সঙ্গে সম্পর্কিত গাণিতিক সমস্যাগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে বুযজানির ট্যানজেন্ট বা ট্যান কোনের ব্যবহার সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

খ্রিস্টিয় ৯৯৭ সনে বুযজানি তার ও আল-বিরুনির তৎকালীন আবাসস্থল কাথের স্থানীয় সময়ের ব্যবধান নির্ধারণের এক পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণে অংশ নেন এবং তার পরীক্ষা দেখা যায় যে তা ছিল দুই দ্রাঘিমাংশের ব্যবধান হিসেবে প্রায় এক ঘণ্টার পার্থক্য। তার ওই পরীক্ষার ফল আধুনিক যুগের হিসেবের খুব কাছাকাছি হয়েছিল। বুযজানির মহাকাশ পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত উপাত্ত বা ডাটা ব্যবহার করেছেন আলবিরুনি ও তার পরবর্তী যুগের অনেক জ্যোতির্বিদ।

জ্ঞান-বিজ্ঞানে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বর্তমান যুগে চাঁদের একটি প্রাকৃতিক খাদ বা গর্তের নাম রাখা হয়েছে বুযজানির নামে। বুযজানি ৩৮৮ হিজরির তেসরা রজব বা ৯৯৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জুলাই বাগদাদে  ইন্তেকাল করেন।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।