আগস্ট ১৬, ২০১৯ ১৫:৪০ Asia/Dhaka

ইরানি দার্শনিক শহীদ শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির পুরো নাম শেইখ শাহাবুদ্দিন আবুল ফাতুহ ইয়াহ্‌ইয়া বিন হাবাশ সোহরাওয়ার্দি।

তার উপাধি ছিল শেইখুল আশরাক্ব। ইসলামী দর্শনে ইশরাক্বি ধারা বা 'আলোকোজ্জ্বল' তথা ইলুমিনেশন ঘরানার প্রবর্তক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি। তাকে শেইখে শহীদ বা নিহত শেইখও বলা হয়। তাঁর জন্ম হয়েছিল যানজনের কাছে সোহরাওয়ার্দ নামক একটি গ্রামে আনুমানিক ৫৪৫ হিজরি থেকে ৫৫০ হিজরির কোনো এক সনে। অবশ্য সাইয়্যেদ হুসাইন নাসর ও হেনরি কোরবিনের মত গবেষকরা মনে করেন শেইখ সোহরাওয়ার্দির জন্ম হয়েছিল ৫৪৯ হিজরির কাছাকাছি সময়ে তথা খ্রিস্টিয় ১১৫৫ সনে।  অনেকেই ভুলবশত এই সোহরাওয়ার্দিকে হিজরি সপ্তম শতকের সুফি সাধক ও সোহরাওয়ার্দি তরিকার প্রবর্তক শাহাবুদ্দিন আবু হাফস ওমর সোহরাওয়ার্দির নামের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। ওমর সোহরাওয়ার্দি ছিলেন আওয়ারিফুল মাআরিফ গ্রন্থের লেখক।

শহীদ দার্শনিক শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির জীবনকে তিনভাগে বা তিন যুগে ভাগ করা যায়। প্রথম যুগটি হল সোহরাওয়ার্দে থাকাকালীন তার শৈশবকাল। তার এই সময়কার জীবন ও শৈশবের শিক্ষা-দীক্ষার অবস্থা সম্পর্কে তেমন বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। তার শৈশবের পড়াশুনার শুরু সোহরাওয়ার্দেই হয়েছিল এবং তিনি শেইখ আবদুর রহমানের মক্তবে সব ধরনের প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেছিলেন বলে বর্ণনা রয়েছে। এই মক্তবে পড়াশুনায় তিনি অন্য সহপাঠীদের চেয়ে এগিয়েছিলেন বলেও জানা যায়। সোহরাওয়ার্দের পর পড়াশুনার জন্য শেইখ শাহাবুদ্দিন  মারাগে শহরে যান এবং সেখানে মাজদ্‌উদ্দিন জিলির কাছে ইসলামী দর্শন শেখায় মশগুল হন। মনে করা হয় এ সময়ই তিনি বন্ধু ও শাগরেদদের অনুরোধে  'ইসলামী আইন শাস্ত্রের মূল নীতিমালার সংস্কার বা পুনর্মূল্যায়ন' শীর্ষক বইটি লেখেন।

মাজদ্‌উদ্দিন জিলি ছিলেন দর্শন ও কালাম বা ইসলামী নীতি শাস্ত্রের একজন বড় শিক্ষক। দার্শনিক ও পবিত্র কুরআনের মুফাসসির ইমাম ফাখরে রাজির শিক্ষক ছিলেন তিনি। ইরানি মনীষী ফাখরে রাজির জীবনকাল ছিল হিজরি ষষ্ঠ ও সপ্তম শতক তথা খ্রিস্টিয় দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতক। ইমাম ফাখরে রাজি দীর্ঘকাল ধরে মাজদ্‌উদ্দিন জিলির কাছে দর্শন ও কালাম শাস্ত্র পড়েছেন। আর শহীদ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দিও ছিলেন তারই সহপাঠী। বলা হয় ফাখরে রাজি দর্শন শাস্ত্রের সবচেয়ে কট্টর বিরোধী ছিলেন। কিন্তু তিনি সোহরাওয়ার্দির শাহাদাতের পর যখন তার এক সময়কার এই সহপাঠির লেখা দর্শন বিষয়ক বই 'টিকা বা ইশারা' ((تلویحات  পড়েন তখন তিনি বইটিতে চুমো খান এবং পুরনো সেই সহাপাঠির স্মরণে তার চোখ বেয়ে ঝরে পড়ে অশ্রু।

শেইখ শাহাবুদ্দিন  সোহরাওয়ার্দি প্রায় ৫৭৪ হিজরিতে মারাগে ছেড়ে ইস্ফাহানে যান।  সেখানে তিনি জাহিরউদ্দিন ফার্সির কাছে যুক্তিবিদ্যা সম্পর্কিত বই 'মানতেকে শেফা'র ব্যাখ্যা সম্পর্কিত একটি বই পড়েন। বইটির নাম ছিল আলবাসায়েরুন নাসিরিয়াহ। ওমর বিন সাহলান সাভি ছিলেন বইটির লেখক। শেইখ শাহাবুদ্দিন  সোহরাওয়ার্দি ইস্ফাহানেই পরিচিত হন ইবনে সিনার চিন্তা ও দর্শনের সঙ্গে। তিনি তখন ইবনে সিনার মাশরেকি দর্শনের খুব অনুরক্ত হন । বলা হয় এ সময় তিনি ফার্সি ভাষায় ইবনে সিনার রিসালাহ আততাইর-এর অনুবাদ করেন এবং নিজেও দুটি বই লেখেন।

বলা হয় শেইখ শহীদ সোহরাওয়ার্দি ফার্সি ও আরবিতে ৫০টিরও বেশি বই লিখেছিলেন। এসব বইয়ের মধ্যে ফার্সি ভাষায় লেখা তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বইয়ের নাম হল: পার্তুনামেহ বা আলোকময়তা বিষয়ে পুস্তিকা, হায়াকাল আন নুর আসসুহরাওয়ার্দি বা আলোর মিনার বা পিরামিড, রিসালাত আততাইর বা পাখির পুস্তিকা, সাফিরই সিমুরগ্ বা সিমোরগের ডাক, ইয়েক রুজ বা জামায়াতে সুফিয়ান বা সুফিদের সঙ্গে একদিন, আকল ই সুরখ বা লাল বুদ্ধিবৃত্তি, ফি হাকিকাত আল ইশক বা প্রেমের বাস্তবতা এবং বুস্তান আল কুলুব বা হৃদয়গুলোর বাগান ইত্যাদি।

শেইখ শহীদ সোহরাওয়ার্দির কয়েকটি আরবি বইয়ের নাম হল: কিতাব আতাতালউইহাত, কিতাব আল মুকাওউমাত, কিতাব আল মাশারি ওয়াল মুতাহ্হারাত এবং দর্শন বিষয়ক বই কিতাব হিকমাত আল ইশরাক।

সোহরাওয়ার্দি তুরস্ক ও সিরিয়াসহ বহু অঞ্চল সফর করে অনেক বিখ্যাত ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সান্নিধ্য অর্জন করেছিলেন।  তার অগাধ জ্ঞান, উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং রহস্যের ওপর গুরুত্বারোপ অনেক ব্যক্তিকে তার শত্রুতে পরিণত করে। তারা সোহরাওয়ার্দিকে জব্দ করার জন্য বিতর্কের মজলিসের আয়োজন করে এবং তাকে কাফির বলে মিথ্যা অপবাদমুলক ফতোয়া দেয়। এই শত্রুরা মালিক জাহেরের কাছে তার বিরুদ্ধে নালিশ করে ও তাকে হত্যা করতে বলে। কিন্তু মালিক জাহের নামের স্থানীয় শাসক তাদের অপবাদে কান দেননি।

এরপর একদল দরবারি আলেম তার বিরুদ্ধে চিঠি পাঠায় সালাহউদ্দিন আইয়ুবির কাছে যাতে এই দার্শনিককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। সালাহউদ্দিন তার অল্প কিছু আগে ক্রুসেডারদেরকে সিরিয়া থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। তাই কথিত আলেমদের দাবি অমান্য করার সাহস তার ছিল না। এ অবস্থায় তিনি সোহরাওয়ার্দিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ফলে তারই ছেলে মালিক জাহির সোহরাওয়ার্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। সোহরাওয়ার্দি শাহাদত বরণ করেন কারাগারে ৫৮৭ হিজরির জিলহজ মাসের শেষের দিকে কোনো এক শুক্রবারে।

ভাইবোনেরা, সোহরাওয়ার্দির জীবন ও অবদান সম্পর্কে আমরা কথা বলব আগামী আসরে। আশা করছি তখনও আমাদের সঙ্গ দিতে ভুলবেন না। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।