সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৯ ১৬:৩৩ Asia/Dhaka

হিজরি ষষ্ঠ শতক তথা খ্রিস্টিয় দ্বাদশ শতকের ইরানি দার্শনিক ও আরেফ শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির জীবন ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে গত পর্বে আমরা বলেছিলাম ইরানী এই মনীষীর লেখনী সম্পর্কে যারা গবেষণা করেছেন তাদের মধ্যে বার্কলম্যান, অধ্যাপক লুইস ম্যাসিনিওন, হেনরি কোরবিন ও সাইয়্যেদ হুসাইন নাস্‌র সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত।

ইশরাকি শেইখ তথা শেইখ শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দী তার সংক্ষিপ্ত জীবনে অনেক বই লিখেছিলেন। বলা হয় শেইখ শহীদ সোহরাওয়ার্দি ফার্সি ও আরবিতে ৫০টিরও বেশি বই লিখেছিলেন। হিকমাতুল ইশরাক বা ‘ইশরাকি দর্শন’ তার অন্যতম প্রধান কীর্তি। তার লেখা অনেক বই এখন আর পাওয়া যায় না। অতীতে তার কোনো লেখা পাশ্চাত্য অনূদিত হয় নি। ফলে পাশ্চাত্যে খুব একটা পরিচিতি পাননি সোহরাওয়ার্দী। কিন্তু প্রাচ্যের দর্শনে তার প্রভাব ইবনে সিনার প্রভাবের প্রায় সমান। ইসলামী দর্শনে ইশরাকি ধারার প্রবক্তা হিসেবে চির অমর হয়ে আছেন সোহরাওয়ার্দি।

গবেষক ও লেখকরা সব সময়ই সোহরাওয়ার্দির লেখার স্টাইলের প্রশংসা করে এসেছেন। ফার্সি গদ্য লেখার ক্ষেত্রে অভিনবত্বের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। আরবি গদ্য লেখার ক্ষেত্রেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন সোহরাওয়ার্দি। তাঁর আরবি গদ্য লেখাগুলোয় কুরআন ও হাদিসের ব্যাপক উদ্ধৃতি দেখা যায়।

শেইখ সোহরাওয়ার্দির ফার্সি রচনাগুলো সম্পাদনা করেছেন ডক্টর সাইয়্যেদ হুসাইন নাস্‌র্‌। এসব বই ছাপাও হয়েছে। ডক্টর নাস্‌র্‌ মনে করেন দর্শন বিষয়ক ফার্সি গদ্যের সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন হল সোহরাওয়ার্দির লেখাগুলো। তার মতে ফার্সি গদ্যের গত এক হাজার বছরের ইতিহাসে সোহরাওয়ার্দি ছাড়া আর কেউই এমন সাবলিল ও সূক্ষ্মভাবে দর্শন বিষয়ক আলোচনা উপস্থাপন করতে পারেননি।

ডক্টর নাস্‌র্‌ দৃষ্টান্ত হিসেবে সোহরাওয়ার্দির লেখা দর্শন বিষয়ক ফার্সি বই 'পারতুনামেহ' বা 'আলোর ঝলকানি',  'হায়াকাল আননুর' বা 'আলোর পিরামিডগুলো' শীর্ষক বইয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। সোহরাওয়ার্দি এ বইগুলো লিখেছেন মূলত ইবনে সিনার মাশায়ি বা অ্যারিস্টটোলিয় দর্শনের অনুসরণে। অবশ্য আত্মা ও খোদাতত্ত্ব বা ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে তিনি ইশরাকি বা আলোকিত তত্ত্বই তুলে ধরেছেন। এইসব তাত্ত্বিক আলোচনাকে বোধগম্য করতে সোহরাওয়ার্দি রূপক বা প্রতীকি গল্পও ব্যবহার করেছেন। তিনি ইরফানি বিষয়েও ছোট গল্প  ব্যবহার করেছেন। এসব গল্প ইশরাকি বা আদর্শ আলোকিত জীবনের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে।

শেইখ শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দীর ইশরাকি দর্শনের মূল বৈশিষ্ট্য হল তিনি অস্তিত্ব বিষয়ের আলোচনাগুলোকে যুক্তির পাশাপাশি খোদাপ্রেমের আধ্যাত্মিক পরিক্রমার সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। সোহরাওয়ার্দির ইশরাকি দর্শনের ভিত্তি হিসেবে ইবনে সিনার মাশায়ি বা অ্যারিস্টটোলীয় দর্শন, ইসলামী সুফিবাদ এবং প্রাচীন ইরান ও গ্রীসের দর্শন ব্যবহৃত হয়েছে। ইশরাকি দর্শনে যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিকে জ্ঞান অর্জনের পথে প্রথম পূর্ণতার স্তর হিসেবে ধরা হয়। অনেকেই মনে করেন খানকাগুলোর তাসাওউফ বা সুফি-তত্তাবলী ও দর্শন এবং ইসলামী কালাম বা ধর্মীয় ব্যাখ্যা-ভিত্তিক আলোচনা শাস্ত্রের একটা মাঝামাঝি রূপ হল সোহরাওয়ার্দীর ইশরাকি তথা আলোকিত দর্শন।  সোহরাওয়ার্দী মনে করেন আলোকিত দার্শনিক যুক্তি, মতামত ও বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে  যা যা খুঁজে পান আত্মিকভাবেও সেসবের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তার মতে কেবল যুক্তি দিয়ে দার্শনিক গবেষণা করা যেমন অর্থহীন তেমনি যুক্তি ও প্রমাণ বাদ দিয়ে কেবল খোদাপ্রেমের আধ্যাত্মিক পরিক্রমার মাধ্যমেও দার্শনিক গবেষণা করা বিপথগামীতা ছাড়া অন্য কিছু বয়ে আনে না।

সোহরাওয়ার্দী মনে করেন দর্শন এমন এক প্রাচীন বিষয় যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হেরমেস। এরপর পিথাগোরাস, বায়েজিদ বোস্তামি, মনসুর হাল্লাজ ও আবুল হাসান খারাকানি এর আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি হয়েছেন।  

ডক্টর সাইয়্যেদ হুসাইন নাসর সোহরাওয়ার্দির ফার্সি রচনার ভূমিকায় লিখেছেন: সোহরাওয়ার্দি নিজেকে গ্রিক ও ইরানি প্রথার উত্তরসুরি বলে মনে করেন। তার মতে প্লেটো, জরাথ্রুস্ত, প্রাচীন ইরানের দার্শনিক সম্রাটবৃন্দ এবং সক্রেটিসের আগের গ্রিক দার্শনিকরা একই আধ্যাত্মিক বাণী ও বাস্তবতার নির্যাস কিংবা ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। আর সোহরাওয়ার্দি নিজে সেই বাণীরই পুনরুজ্জীবন ঘটানোর দাবি করেছেন। তার মতে প্রাচীন যুগের ইরানি মনীষীরা বিশ্বকে ব্যাখ্যা করতেন আলো ও অন্ধকারের তত্ত্ব এবং আত্মিক পরিশুদ্ধির তত্ত্ব দিয়ে। অন্যদিকে আলোর জায়গায় অস্তিত্বের তত্ত্ব ব্যবহার করে সোহরাওয়ার্দি নিজ দার্শনিক তত্ত্বকে প্রাচীন গ্রিসের প্লেটো ও অ্যারিস্টোটলের তত্ত্ব থেকে আলাদা করেছেন এবং তাতে নব্য-প্লেটোনিক ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার ছোঁয়া মিশিয়ে এনেছেন ইরানি ও পূর্ব-দেশীয় রং। তিনি চিন্তাগত বিষয়ে নিজেকে  যতটা না গ্রিক মনীষীদের কাছে ঋণী মনে করতেন তার চেয়েও বেশি মাত্রায় নিজেকে ঋণী বলে মনে করতেন ইসলামী ও প্রাচীন যুগের ইরানি দার্শনিক এবং আরেফদের কাছে ।

ডক্টর নাস্‌র্‌-এর মতে প্রাচীন ইরানি দর্শনের সঙ্গে ইরফান ও ইসলামী দর্শনের সংমিশ্রন সোহরাওয়ার্দির ইশরাকি দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট। ডক্টর নাস্‌র্‌ বলেছেন, সোহরাওয়ার্দির লেখনীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর্শনীয় অধ্যায় হল 'নাফস্‌' বা প্রবৃত্তি সম্পর্কিত অধ্যায় যাকে বিশেষভাবে ইশারাকি বা আলোকিত দর্শন দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন সোহরাওয়ার্দি। বস্তু বা প্রকৃতি সম্পর্কিত আলোচনায় সোহরাওয়ার্দি কথা বলেছেন অ্যারিস্টটলীয় ধারার দার্শনিকদের মতই। কিন্তু নাফ্‌স্‌ বা প্রবৃত্তি সম্পর্কিত আলোচনায় তিনি কথা বলেছেন ভিন্ন দৃষ্টি দিয়ে।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।