ইরানের পভে শহরের শহু পর্বতের চূড়া ও অধোমুখি টিউলিপ
বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য, পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান।
গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দর প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ শহর কেরমানশাহে। গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম কেরমানশাহ প্রদেশের পভে শহরের শহু পর্বতের চূড়ায়। সেখানকার প্রাচীন অতাশগহ বা অগ্নিমন্দিরের পাশাপাশি চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশও দেখেছি আমরা। বিশেষ করে পর্বতের ওই উচ্চতায় ললে ভজগুন মানে অধোমুখি টিউলিপ প্রচুর পরিমাণে দেখতে পাওয়া গেছে।
কেবল পভের চূড়াতেই নয় বরং পভের অতাশগহ’তেও এই শ্রেণীর টিউলিপ ব্যাপক দেখা যায়। অতাশগহে শত সহস্র ললেহ মানে টিউলিপের সমারোহ বিরাজ করে বসন্তের আগমনে। দর্শনীয় সুন্দর এই ফুল তাও সবুজ প্রকৃতিময় পার্বত্য চূড়ায়, যে কেউই দেখবে, চোখ লেগে যাবে। সহজে ওই সৌন্দর্য থেকে চোখ ফেরানো মুশকিল। অধোমুখি যেই টিউলিপের কথা বললাম এতোক্ষণ এই টিউলিপ দেখতে লাল বলা হলেও আসলে কমলা কিছুটা বেগুণি রঙের দিকে ধাবিত হলে যেরকম রঙ দাঁড়ায় ঠিক সেরকমই রঙ তার। এই টিউলিপের হৃদয়ে লুকিয়ে রয়েছে চমৎকার একটি রূপকথা।
রূপকথাটি এসেছে ফেরদৌসির মহাকাব্য শাহনামাতেও। রূপকথাটি হলো: গার্সিভাজ নামের এক লোক ছিল তুরানের সেনা কমাণ্ডার। তুরান হলো এশিয়া মাইনর মানে স্মল এশিয়া। সে ছিল ফাশাঙ্গের সন্তান। আফ্রসিয়াব ও আগ্রিরাসের ভাই ছিল সে। কেইকাউস এবং আফ্রসিয়াবের মধ্যে একবার যুদ্ধ বেধেছিল। তখন আফ্রসিয়ব যুদ্ধের এক পর্যায়ে সিয়ভাশের সঙ্গে সমঝোতার প্রস্তাব দেয়। সিয়'ভাশ হলো শাহনামা কাব্যের একটি আলোচিত এবং জনপ্রিয় বীর চরিত্র। ইরানের এক সম্রাট ছিল কাভুস নামে। সিয়ভাশ ছিল সেই কাভুসের সন্তান। জন্মের পরই তাকে রুস্তম এর কাছে পাঠানো হয়। রুস্তম হলো এক মহা পালোয়ান। রুস্তমের তত্ত্বাবধানে সাত বছর থেকে,যুদ্ধবিদ্যাসহ শিকারে দক্ষতা অর্জন করে সিয়ভাশ। সে বীরত্বপূর্ণ নানা গুণও অর্জন করে। যে-কোনো মহাকাব্যে এ ধরনের বীরত্বপূর্ণ চরিত্র থাকে।

তো গার্সিভাজকে পাঠানো হয় সিয়ভাশের সঙ্গে সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে। প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার সময় গার্সিভাজের সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল অসংখ্য ঘোড়া, মূল্যবান সব উপহার সামগ্রি এবং দুই শ জন যুদ্ধ উপদেষ্টা। তারা গিয়ে সিয়ভাশকে সমঝোতার প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাব পাবার পর সিয়ভাশ এক সপ্তা ধরে রুস্তমের সঙ্গে শলা পরামর্শ করে শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় রাজি হয়। কিন্তু সিয়ভাশের ব্যাপারে প্রেমঘটিত কারণে ঈর্ষান্বিত ছিল গার্সিভাজ। সে তার ভাই আফ্রাসিয়াবকে ইরানের তরুণ রাজকুমার সিয়ভাশের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে সমর্থ হয়। এক পর্যায়ে গার্সিভাজ, নিষ্পাপ সিয়ভাশকে কাপুরুষের মতো নির্দয়ভাবে একেবারে ছুরি দিয়ে মাথা কেটে খুন করে। তো জনগণের বদ্ধমূল বিশ্বাস হলো-গার্সিভাজ যখন নিষ্পাপ সিয়ভাশের মস্তক কেটে ফেললো নিজের ছুরি দিয়ে,তখন এই ভজগুন ললেহ ফুলটিই ছিল সেই দুর্ঘটনার একমাত্র সাক্ষী। নীরব সাক্ষী।
এই মর্মান্তিক ঘটনা সহ্য করতে না পেরে ভজগুন দু:খে শোকে ভেঙে পড়লো। তার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়লো দু:খজনক হত্যাকাণ্ডটির। তার চেহারা লাল হয়ে গেল এবং মাথানীচু করে সিয়ভাশের জন্য কান্নকাটি করতে করতে সেই যে তার ঘাড় বেঁকে নীচে নেমে গেল,আর উপরে ওঠে নি কোনোদিন। এই পভেহ এবং এখানকার উরামানাত এলাকায় ভজগুন ফুলকে এখনও ‘সিয়ভাশের অশ্রু ফুল’ বলে অভিহিত করা হয়। ইরানের কুর্দিস্তানের অধিবাসীদের বিশ্বাস এই ফুল যে ছিঁড়বে আল্লাহর রহমত ও বরকতের দরোজা তার জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। এ কারণে এই ভজগুন ললেহ’কে ‘নন বোর’ও বলে তারা। ফার্সিতে ‘নন’ মানে হলো রুটি বা খাদ্য আর “বোর” মানে হলো কাটা। ‘নন-বোর’ মানে হলো ফুল ছিঁড়লে রিজিক (খাদ্য) বন্ধ হয়ে যায়।
এই হলো ভজগুন নিয়ে রূপকথার গল্প। সঙ্গেই থাকুন। ফিরছি খানিক মিউজিক বিরতির পর।

রূপকথাটি শুনলেন। এই গল্পের সার সংক্ষেপ হলো ভজগুন টিউলিপ সিয়ভাশের শোকেই ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে। এই শোক ইরানের ওপর ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সময়ও অব্যাহত থাকে। পভে'র মাটিও প্রতিরক্ষা যুদ্ধের সময় শহীদদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। প্রত্যেক বসন্তে ভজগুন ফুলের উপস্থিতিতে সেই দৃশ্য স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে। এই প্রেমের ফুল, শোকের ফুল ভজগুন তার সৌন্দর্য মেলে ধরে রসিক দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিমেষে। কীরকম নিষ্পাপ কীরকম শোক জাগানিয়া তার রূপ-না দেখলে বোঝা কঠিন। এই পভে শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে রয়েছে আরো একটি চমৎকার প্রাকৃতিক নিদর্শন। এটি একটি গূহা। গূহার নাম গুরি কেল্লা। বলা হয়ে থাকে যে এশিয়ার মধ্যে পানিময় দীর্ঘতম গূহা হচ্ছে গুরি কেল্লা। গূহার বিভিন্ন অংশকে বিভিন্ন নামে নামকরণ করা হয়েছে। গুহার ভেতরে জমাট মোমের মতো ঝুলন্ত স্যান্ডেলিয়ারগুলো সত্যিই দেখার মতো সুন্দর, চোখ ধাধানো।
গূহাটির হাজার খানেক মিটার ভেতরে একটি অডিটোরিয়াম বানানো হয়েছে। ভীষণ সুন্দর একটি জলাধার রয়েছে এই অডিটোরিয়ামের সঙ্গে। এখানে পর্দার মতো করে স্যান্ডেলিয়ার ঝুলে আছে। ওই স্যান্ডেলিয়রের কোনো একটি হাত লাগালে চমৎকার মিউজিকের মতো ধ্বনি ওঠে। এ কারণে এই অডিটোরিয়ামটির নাম রাখা হয়েছে বিখ্যাত এক শিল্পীর নামে। তিনি হলেন জার্মান সংগীতকার প্যাস্টোরাল সিম্পনির কম্পোজার বেটোভেন। সুতরাং সংগীতময় এই বেটোভেন কর্নারে যে কিছুটা সময় কাটাতে ইচ্ছে করবে যে কোনো দর্শনার্থীর-তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে। বেটোভেন অডিটোরিয়াম পেরিয়ে আরেকটু সামনে গেলে পড়বে আরো একটি অডিটোরিয়াম। একেবারে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার স্যান্ডেলিয়ারগুলো এখানে যেন কোনো বিয়ের কণেকে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছে।
গূহার সতেরো শ মিটার গভীরে গেলে একটি ঝরনা দেখতে পাওয়া যাবে। অবশ্য ঝরনাটি এখনও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় নি। এই গুরি কেল্লা গূহার বহু অংশ এখনও আবিষ্কৃত হয় নি। তবে অল্প সময়ের মধ্যে আবিষ্কৃত আরও বহু অংশ দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। #
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।