সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯ ১২:৪৪ Asia/Dhaka

গত কয়েক পর্বের আলোচনায় আমরা বলেছিলাম ইশরাকি শেইখ তথা শেইখ শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দী তার সংক্ষিপ্ত জীবনে ফার্সি ও আরবিতে ৫০টিরও বেশি বই লিখেছিলেন।

হিকমাতুল ইশরাক বা ‘ইশরাকি দর্শন’ তার অন্যতম প্রধান কীর্তি। তার লেখা অনেক বই এখন আর পাওয়া যায় না। অতীতে তার কোনো লেখা পাশ্চাত্য অনূবাদ করা হয় নি। ফলে পাশ্চাত্যে খুব একটা পরিচিতি পাননি সোহরাওয়ার্দী। কিন্তু প্রাচ্যের দর্শনে তার প্রভাব ইবনে সিনার প্রভাবের প্রায় সমান। ইসলামী দর্শনে ইশরাকি ধারার প্রবক্তা হিসেবে চির অমর হয়ে আছেন সোহরাওয়ার্দি।

শেইখ শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দীর ইশরাকি দর্শনের মূল বৈশিষ্ট্য হল তিনি অস্তিত্ব সংক্রান্ত আলোচনাগুলোকে যুক্তির পাশাপাশি খোদাপ্রেমের আধ্যাত্মিক পরিক্রমার সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। সোহরাওয়ার্দির ইশরাকি দর্শনের ভিত্তি হিসেবে ইবনে সিনার মাশায়ি বা অ্যারিস্টটোলীয় দর্শন, ইসলামী সুফিবাদ এবং প্রাচীন ইরান ও গ্রীসের দর্শন ব্যবহৃত হয়েছে।

সোহরাওয়ার্দী মনে করতেন আলোকিত দার্শনিক যুক্তি, মতামত ও বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে  যা যা খুঁজে পান আত্মিকভাবেও সেসবের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তার মতে কেবল যুক্তি দিয়ে দার্শনিক গবেষণা করা যেমন অর্থহীন তেমনি যুক্তি ও প্রমাণ বাদ দিয়ে কেবল খোদাপ্রেমের আধ্যাত্মিক পরিক্রমার মাধ্যমেও দার্শনিক গবেষণা করা বিপথগামীতা ছাড়া অন্য কিছু বয়ে আনে না।

ইশরাকি দর্শন বিষয়ের বিশিষ্ট গবেষক সামাদ মুওয়াহিদ মনে করেন শেইখ শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দী প্রাচীন ইরানি দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন ইরানের জরাথ্রুস্ত সম্প্রদায়ের সঙ্গে  যোগাযোগ ও তাদের নানা শিক্ষা ব্যবহার করে। সোহরাওয়ার্দি প্রাচীন ইরানের কিছু বইয়ের আরবি বা ফার্সি অনুবাদ পেয়েছিলেন। মূল বইগুলো ছিল পাহলাভি ভাষায় লেখা। এ ছাড়া খোদা-প্রেম বিষয়ক ইরানের খাঁটি আধ্যাত্মিক জ্ঞান-তত্ত্ব বা ইরফানের মাধ্যমেও সোহরাওয়ার্দি পরিচিত হয়েছিলেন প্রাচীন ইরানি দর্শনের সঙ্গে। কারণ ইরানি ইরফান ও সুফি-তত্ত্বের সঙ্গে জরাথ্রুস্ত দর্শনের অনেক অভিন্ন দিক বা মতামত রয়েছে। সামাদ মুওয়াহিদ 'ইশরাকি দর্শনের নানা উৎস' শীর্ষক বইয়ে তার এইসব মতামত তুলে ধরেছেন।

সোহরাওয়ার্দি গ্রিক দর্শনেও আগ্রহী ছিলেন। প্লেটো ও নব্য-প্লেটোনিক দর্শন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তিনি যেসব ক্ষেত্রে অ্যারিস্টোটলের যুক্তিবিদ্যা ও প্রকৃতিবিদ্যা ব্যবহার করেছেন সেসব ক্ষেত্রে দর্শনের নব্য-প্লেটোনিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।

গ্রিক ও ইসলামী ধারার অ্যারিস্টটলিয় দর্শন চর্চাকারী দার্শনিকদের চিন্তাধারা এবং সোহরাওয়ার্দির দর্শন রীতির মধ্যে যেসব পার্থক্য দেখা যায় তার মধ্যে নাফস্‌ বা প্রবৃত্তি বা মন বিষয়ক বর্ণনার পার্থক্য অন্যতম। যেমন, অ্যারিস্টটলিয় ধারার দার্শনিকরা মনে করেন নাফস্‌ বা মন হচ্ছে প্রকৃতিবিদ্যার একটি অধ্যায়। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দি নাফস্‌ সংক্রান্ত বিজ্ঞানকে খোদা-পরিচিতিমূলক বিজ্ঞান বা ধর্মতত্ত্বের কাছাকাছি নিয়ে গেছেন। তিনি বস্তুগত বিশ্ব থেকে দেহ ও মানুষের মুক্তির পথ নিয়ে আলোচনা করেছেন। সোহরাওয়ার্দির মতে প্লেটো ছিলেন দার্শনিকদের নেতা এবং তিনি গ্রিক এই দার্শনিককে আলোকিত-ধারার বা ইশরাকি ধারার দার্শনিকদের পুরোধা বলেও মনে করতেন। তার মতে প্লেটো যুক্তি ও দলিল-প্রমাণকে ইরফানি রসের সঙ্গে মিশিয়ে গেছেন।

শেইখ শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দির দর্শন আলো ও অন্ধকারের বাস্তবতা-ভিত্তিক। তিনি তার দর্শনের ধারার নাম হিসেবে আলোকায়ন বা ইশরাক শব্দটি বেছে নিয়েছেন এ কারণেই। অবশ্য অন্য এক দিক থেকে তথা ভৌগলিক ইঙ্গিতের দিক থেকে ইশরাক শব্দটি পূর্বাঞ্চলের অর্থবোধক। 

সোহরাওয়ার্দির আলোকিত বা ইশরাকি দর্শনের একটি ইরফানি-ভৌগলিক ভিত্তিও রয়েছে। তার মতে পুরো প্রাচ্য সেই ইরফানি নুরের পরিপূর্ণ আলোয় উদ্ভাসিত কিংবা তা ফেরেশতাদের যে জগত তারই কাছাকাছি। আর সে জগতে বস্তুর কোনো স্থান নেই বলে পার্থিব কোনো অস্তিত্ব সেই আলোর জগতকে দেখতে পারে না।

শেইখ শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দির দৃষ্টিতে গোটা পশ্চিমা জগত অন্ধকারে নিমজ্জিত। সে জগত কেবলই বস্তুর জগত। বিশ্বের অন্যতম সেরা এই দার্শনিক মনে করেন জিনিষ বা বস্তুর বাস্তবতা নুর-নির্ভর। বস্তুর গুরুত্ব ও দুর্বলতার মাত্রা তার আলোর তীব্রতার মাত্রার ওপর নির্ভর করে। প্রকৃত নুর বা আলো সত্তাগতভাবেই উজ্জ্বল এবং প্রতিটি অস্তিত্বের উজ্জ্বলতা তার ওই সত্তার ওপর নির্ভরশীল।  তাই সব কিছুর পরিচয় ফুটে ওঠে সেসবের মধ্যে থাকা আলোর উজ্জ্বলতা বা আলোকময়তার তীব্রতার মাত্রা পরিমাপের মাধ্যমে। মহান আল্লাহর সত্তা হচ্ছে পরিপূর্ণ অস্তিত্ব ও তা পরিপূর্ণ বা পুরোপুরি খাঁটি নুর। পবিত্র কুরআনের বাণী থেকে প্রেরণা নিয়ে সোহরাওয়ার্দি মহান আল্লাহকে 'নুরুল আনোয়ার' তথা 'আলোসমূহের আলো' বলে অভিহিত করেছেন। আর এই চরম বা পরম আলোর সঙ্গে মিশতে পারাকেই সাফল্য বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

এটা স্পষ্ট নুর বা আলো বলতে সোহরাওয়ার্দি বস্তুগত বা এই পার্থিব জগতের আলো নামক শক্তিকে বোঝাননি। এই আলো বা নুর হচ্ছে আধ্যাত্মিক বা অবস্তুগত আলো।   

 

মাশায়ি বা অ্যারিস্টটলিয় দর্শনে বিভিন্ন অস্তিত্বের মধ্যে যৌক্তিক বা কারণগত সম্পর্কের যে কথা বলা হয় ইশরাকি দর্শনে সেটাকেই পরাবাস্তব বা অলৌকিক প্রেম হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। নুরুল-আনোয়ার বা আলোসমূহের আলোর তথা মহান আল্লাহর নিজ সত্তার প্রতি যে প্রেম তা-ই 'আলো' ও চরম পরিপূর্ণতা। আর সেটাই তাঁর সৃষ্টিকুলে ছড়িয়ে পড়েছে। আর অস্তিত্বগুলোর সব পর্যায় মহান আল্লাহর রহমত ও কল্যাণ তথা নেয়ামতগুলোর আলোর বরকতেই সৃষ্টি হয়েছে বা অস্তিত্ব লাভ করেছে বলে সোহরাওয়ার্দি মনে করেন। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।