সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯ ১২:২০ Asia/Dhaka

বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য, পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান। গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দর প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ শহর কেরমানশাহে। আজ আমরা যাবো কেরমানশাহ প্রদেশের সঙ্গে লাগোয়া আরেকটি প্রদেশ হামেদানে। হামেদান প্রদেশে রয়েছে ঐতিহাসিক এবং প্রাকৃতিক নানা নিদর্শন। বিখ্যাত অনেক মনীষী এবং প্রত্নতাত্ত্বিক অসংখ্য নিদর্শনে সমৃদ্ধ এই প্রদেশে আমরা ঘুরে বেড়াবো। দেখবো ধীরে ধীরে এবং উপভোগ করবো এখানকার মনোরম পরিবেশ।

ইরানের পশ্চিমাঞ্চল সফরে গেলে যে কোনো পর্যটক কিংবা ভ্রমণ রসিকের উচিত হামেদান ঘুরে দেখা। এই হামেদান ছিল ইরানের বাদশাহী সিলসিলা বা রাজবংশ তথা মাদদের প্রথম রাজধানী।এর বাইরেও হামেদান প্রদেশের খ্যাতির আরেকটি কারণ হলো এখানে রয়েছে অসংখ্য মনীষীর মাজার, রয়েছে ঐতিহাসিক বহু উপাদান ও নিদর্শন।সুতরাং হামেদানে গেলে যে কেউ ইরানের প্রাচীনতম তো বটেই এমনকি বিশ্বেরও প্রাচীনতম শহরের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠবেন সহজেই।তো চলুন তাহলে কথা না বাড়িয়ে ঘুরে ফিরে দেখা যাক হামেদান শহর এবং এর আশেপাশের দর্শনীয় নিদর্শনগুলো।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলীয় গূহার নাম হলো 'গরে আলিসাদর' মানে আলিসাদর গূহা।হামেদানে বেড়াতে গেলে এই গূহাটি দেখা এবং এর অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য ও পরিবেশ উপভোগ করা ভ্রমণ তালিকার শীর্ষে থাকা বাঞ্ছনীয়।আলি সাদর গূহায় বেড়াতে যাওয়ার স্মৃতি অমোচনীয়।হামেদান শহর থেকে বাইরে কাবুদার অহাং উপশহরের কাছের একটি গ্রামের নাম আলি সাদর। ওই গ্রামেই অবস্থিত এই গূহাটি। গ্রামের নামের সঙ্গে মিল রেখেই গূহার নামকরণ করা হয়েছে আলিসাদর গূহা।গূহার মূল এলাকাটি আঁকাবাঁকা হয়ে গিয়ে মিলেছে প্রবেশদ্বারে। মূল প্রবেশদ্বার পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলে দেখতে পাওয়া যাবে স্ফটিকস্বচ্ছ জলের একটি হ্রদ-বেশ খোলামেলা এবং প্রশস্ত। এই গূহা দেখতে হলে অবশ্যই নৌকা বেয়ে যেতে হবে।একটি পাহাড়ের ভেতরে গূহা। গূহার ভেতরটা কানায় কানায় পরিপূর্ণ স্বচ্ছ জলে।এতো স্বচ্ছ যে দশ মিটার গভীর পানির তলদেশও কোনোরকম যন্ত্র বা চশমা ছাড়াই খালি চোখে দেখা যায় সহজেই।

বিশ্বে খুব কম গূহাই আছে যেগুলোকে ইরানের আলিসাদর গূহার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। শুধু সৌন্দর্য এবং বিস্ময়কর দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে ফ্রান্সের মোলিস গূহা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বুকান ও শাওয়ালিয়া গূহার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।আলিসাদর গূহার ভেতরের পানি কিন্তু পান করার উপযোগী নয়।কেননা লবণাক্ততা এবং চুনের পরিমাণ বেশি এই পানিতে।এই দুই বৈশিষ্ট্যের কারণে কোনো প্রাণীও বসবাস করে না এই গূহার ভেতর।গূহার বিভিন্ন কোণে, উপরে, দেয়ালে বিচিত্র সব আকৃতি তৈরি হয়েছে। কোনোটা প্রাণীর মতো, কোনো কোনোটা জ্যামিতিক ডিজাইনের মতো ইত্যাদি। এিইসব গঠনকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়েছে। নৌকায় আরোহন করে এইসব দেখতে দেখতে ভ্রমণকারীরা আনমনেই অন্য জগতে মানে কল্পনার ভুবনে হারিয়ে যায়।আপনারাও হারাবেন না।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলীয় গূহা ইরানের "আলিসাদর গূহা"

গুহাটির ব্যতিক্রমধর্মী বৈশিষ্ট্য হলো এর ভেতরে অসংখ্য লেক বা নালা পরস্পর সংযুক্ত হয়ে আছে। লেকগুলো আঁকাবাঁকা। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে এই পানি কখনো সূর্যের মুখ দেখেনি। এর মধ্যে কোথাও কোথাও পানির গভীরতা হলো সাড়ে ছাব্বিশ ফুট। গুহার উচ্চতা কোথাও কোথাও একশো বত্রিশ ফুট। আলিসাদ্‌র গুহার ভেতরে দেয়ালের গায়ে রয়েছে পিওর ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের পলেস্তারা। এ ছাড়া,গুহার ছাদের দিকে তাকালে দেখা যাবে লোহার দণ্ডের মতো অসংখ্য দণ্ড পাশাপাশি ঝুলে আছে। সর্বোচ্চ এক থেকে দেড় মিটারের দণ্ড ঝুলে থাকতে দেখা যায়।

গুহার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বা দৃশ্য অসম্ভব সুন্দর। বিশেষ করে রং বেরঙের লাইটিং ব্যবস্থা পরিবেশকে করে তুলেছে আরো আকর্ষণীয়। ভেতরে বিরাজ করছে একেবারে সুনসান নীরবতা। গুহায় পানির গভীরতা সবসময় সমান থাকে না,মাঝেমধ্যে ওঠানামা করে। পঞ্চাশ থেকে একশো সেন্টিমিটার অর্থাৎ বিশ থেকে চল্লিশ ইঞ্চির মতো বাড়ে কমে। বহু প্রাচীন এই গুহাটি ১৯৬৩ সালে প্রথমবারের মতো আবিষ্কৃত হয়। হামেদানের পর্বতবাসী বা পর্বতারোহীরা এই রহস্যময় গুহাটি আবিষ্কার করেন। পাহাড়ের নীচের এই জলগুহাটির এ পর্যন্ত চব্বিশ কিলোমিটার আবিষ্কৃত হয়েছে। এ গুহার গভীরতা আরো কতদূর তা অনুসন্ধানের কাজ এখনো চলছে। আলি সাদর গুহাটি সরি কিয়ে মানে হলুদ প্রস্তর পাহাড়ের নীচে অবস্থিত। ১৯৬২ সালে হামেদানের পর্বতারোহীরা গুহার অল্প কিছু দূর পর্যন্ত প্রয়োজনীয় আলোর ব্যবস্থা করে গণমানুষের পরিদর্শনের উপযোগী করে তোলে। ধীরে ধীরে এই গুহা বর্তমানে ইরানের অন্যতম প্রাকৃতিক ট্যুরিস্ট স্পটে পরিণত হয়েছে।                                                                       

আলিসাদর গূহার ভেতরে ট্যুরিস্টদের জন্য মাত্র তিন থেকে চার কিলোমিটার পর্যন্ত প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ভেতরে বেড়াতে গেলে আপনি হেটে কিংবা বোটে যেতে পারেন। প্যাডেল বোট নিজে নিজে চালাতে পারেন,তা না হলে নৌকাচালক আপনাকে নিয়ে যাবে অপার রহস্যময় এই গুহার বিচিত্র কোণে। যেদিকেই তাকাবেন শুধু বিস্ময় আর বিস্ময় আপনাকে কর্মচঞ্চল এই পৃথিবী থেকে নতুন এক পৃথিবীতে নিয়ে যাবে। গুহার মাঝখানে আধা ঘণ্টা নৌকায় বেড়াবার পর আপনি ইচ্ছে করলে নেমে গিয়ে পায়ে হেঁটে উপরের দিকে উঠে যেতে পারেন। আনুমানিক পাঁচ শ'সিঁড়ি উপরে গেলে আপনি ইচ্ছে করলে অন্য রুটে গুহামুখের দিকে ফিরে আসতে পারেন হেঁটে। হেঁটে আসতে গেলে আনুমানিক আধাঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে। গুহার মধ্যে পানির উপকূলভাগে অর্থাৎ শুকনা এলাকায় অসংখ্য অমসৃণ পাথর রয়েছে যা অনেকটা ভূমি থেকে ছাদ পর্যন্ত পিলার বা স্তম্ভের মতো কাজ করে এবং এসব স্তম্ভের ভেতর দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে প্রচুর অলিগলি।

সম্প্রতি আলিসাদ্‌র গুহার ভেতরে খনন কাজ চালিয়ে বেশকিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। এসব নিদর্শন হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীর বলে অনুমান করা হচ্ছে। প্রাপ্ত জিনিসপত্র থেকে প্রমাণিত হয় যে এই গুহার মুখে ও কিছুটা ভেতরের দিকে মানুষ বাস করতো। তবে আলোর অভাবে মানুষ সে সময় গুহার মুখেই বাস করত। প্রাপ্ত জিনিসপত্রগুলো হলো বড়ো কলস,প্রদীপ জ্বালাবার জন্যে ব্যবহৃত পিলসুজ,ধাতব এবং মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র। ১৯৯৪ খৃস্টাব্দে ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক বিস্ময়কর এই আলীসাদ্‌র গুহার উপর গবেষণা চালিয়ে বলেছেন,এটি বিশ্বের অন্যান্য গুহার তুলনায় সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী এবং নিশ্চিতভাবে এই গুহাটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ পানিগুহা। প্রকৃতপক্ষে,আলোর ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হওয়ায় কিংবা আধুনিক যুগে বিদ্যুৎ আবিষ্কার হওয়ার পর এ গুহার গভীরতা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। বিদ্যুৎ আবিষ্কারের আগে মানুষ জানতেই পারেনি এ গুহা এত দীর্ঘ হবে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/  ১৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।