সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৯ ১৩:৪৭ Asia/Dhaka

গত কয়েক পর্বে আমরা জেনেছি ইসলামী দর্শনে ইশরাকি ধারার প্রবক্তা শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি সংক্ষিপ্ত জীবনে ফার্সি ও আরবিতে ৫০টিরও বেশি বই লিখেছিলেন।

৫৮৭ হিজরিতে আলেপ্পোর একদল সংকীর্ণমনা আলেমের ষড়যন্ত্রে  তৎকালীন শাসকের নির্দেশে হত্যা করা হয়েছিল সোহরাওয়ার্দিকে। কিন্তু ৩৮ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে সোহরাওয়ার্দী লিখে গেছেন ৫০টিরও বেশি বই। আরবি ও ফার্সিতে লেখা এসব বইয়ের মধ্যে 'হিকমাতুল ইশরাক' বা ‘ইশরাকি দর্শন’ তার অন্যতম প্রধান কীর্তি। তার লেখা অনেক বই এখন আর পাওয়া যায় না। অতীতে তার কোনো লেখা পাশ্চাত্য অনূবাদ করা হয় নি। ফলে পাশ্চাত্যে খুব একটা পরিচিতি পাননি সোহরাওয়ার্দী। কিন্তু প্রাচ্যের দর্শনে তার প্রভাব ইবনে সিনার প্রভাবের প্রায় সমান।

'হায়াকাল আননুর' বা আলোর নানা পিরামিড, 'তালুইহাত তথা টিকা বা ইশারা' 'পারতুনামেহ' বা আলোর ঝলক, 'আক্বলে সোরখ্' বা লাল-বুদ্ধিবৃত্তি, 'আওয়াজে পারে জিব্রায়িল' বা জিব্রাইলের পাখার শব্দ, রিসালেহ ফি হাকিকাতিল ইশক বা 'প্রেমের বাস্তবতা বিষয়ক রচনা' ও রুজি ব' জামায়াতে সুফিয়ান বা 'সুফিদের জামায়াতের সঙ্গে একদিন' ইত্যাদি সোহরাওয়ার্দির লেখা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই।

ইরানি ও ইসলামী দর্শনের আকাশে শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির আবির্ভাব ছিল আলোকোজ্জ্বল এক ধুমকেতুর মত। কিন্তু তার চিন্তাধারা ও দর্শন মুসলিম মানসে রেখে গেছে চিরস্থায়ী ছাপ। গবেষকরা তার আরবি গদ্য রচনাগুলোকে চিত্তাকর্ষক এবং জোরালো আবেদনময় ও পরিপক্ক বলে প্রশংসা করেছেন। সোহরাওয়ার্দির ফার্সি রচনাগুলোকে এই ভাষায় দর্শন ও ইরফান বিষয়ক গদ্য রচনার ক্ষেত্রে আদর্শ ও অনন্য নিদর্শন হিসেবে ধরা হয়।  

হেনরি কোরবিন ও সাইয়্যেদ হুসাইন নাসর্‌-এর প্রচেষ্টায় দার্শনিক সোহরাওয়ার্দির কিছু কিছু লেখা প্রকাশিত হলেও তার অনেক রচনা আজও অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। পদার্থ-বিদ্যা বা প্রকৃতি-বিজ্ঞান, গণিত ও যুক্তিবিদ্যা বিষয়ে সোহরাওয়ার্দির অনেক লেখা আজও প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। আবার তার লেখা কোনো কোনো বইয়ের পাণ্ডলিপিই খুঁজে পাওয়া যায়নি বা সেসব হারিয়ে গেছে।

হেনরি কোরবিন ‘লাল জিব্রাইল’ শীর্ষক বইয়ে সোহরাওয়ার্দির ফার্সি রচনাবলীর বেশ কিছু অংশ অনুবাদ করেছেন। তিনি এই মহান দার্শনিকের হিকমাত আল ইশরাক বা আলোকিত দর্শন বইয়ের যুক্তিবিদ্যার অধ্যায়টি ছাড়া অন্য সব অধ্যায়গুলোর অনুবাদ করেছেন। কোরবিন এই দর্শনের বিষয়ে কুতুবউদ্দিন শিরাজি ও মোল্লা সাদরার ব্যাখ্যাগুলোও যুক্ত করেছেন। ফলে যারা সোহরাওয়ার্দির চিন্তাধারা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী তাদের জন্য এইসব ব্যাখ্যা অত্যন্ত ভালো উৎস হিসেবে কাজে লাগবে।

ডাবলিও এম টাকস্টোন সোহরাওয়ার্দির ইরফানি ও অর্ন্তদর্শন বা আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা থেকে উৎসারিত কিছু লেখার অনুবাদ করেছেন।

শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির রচনাগুলোকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। এ কাজে সর্বপ্রথম  এগিয়ে এসেছিলেন ইরান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ফরাসি নাগরিক লুই ম্যাসিনিওন। তিনি সোহরাওয়ার্দির রচনাগুলোকে তিন ভাগে সাজিয়েছেন। লুই ম্যাসিনিওন প্রথমভাগে রেখেছেন সোহরাওয়ার্দির যৌবনের প্রথম দিকের রচনাগুলোকে। এসব রচনা প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ। তিনি দ্বিতীয় পর্যায়ে রেখেছেন দর্শনের অ্যারিস্টোটলীয় ধারা সম্পর্কিত সোহরাওয়ার্দির রচনাগুলোকে।  ম্যাসিনিওন ইবনে সিনার দর্শন ও প্লেটোনিক দর্শনের ছাপযুক্ত সোহরাওয়ার্দির রচনাগুলোকে রেখেছেন তৃতীয় ভাগে।

অন্যদিকে হেনরি কোরবিন সোহরাওয়ার্দির রচনাগুলোকে বিন্যস্ত করেছেন চার ভাগে। এরপর সাইয়্যেদ হোসাইন নাস্‌র্‌ সোহরাওয়ার্দির রচনাগুলোর এইসব বিন্যাসে কিছুটা পরিবর্তন এনে তার রচনাগুলোকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেছেন। সময়-ভিত্তিক বিন্যাসে না গিয়ে তিনি সোহরাওয়ার্দির রচনাগুলোকে কাঠামোর ভিত্তিতে ভাগ করেছেন।

শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির রচনাগুলোকে ব্যাখ্যা ও মন্তব্যের আলোকে কেউ কেউ ছয় ভাগে বিভক্ত করেছেন।  এই শ্রেণীর গবেষকরা সোহরাওয়ার্দির ইশরাকি দর্শন সংক্রান্ত বক্তব্যগুলোকে রেখেছেন প্রথম ভাগে। অন্য কথায় হিকমাত আল ইশরাক বা ইশরাকি দর্শন শীর্ষক বইয়ের বক্তব্যগুলোই রাখা হয়েছে এই পর্বে। সোহরাওয়ার্দির অন্য সব বইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে এই বইয়ের বক্তব্যের ধরন ও সুরের পার্থক্য লক্ষ্যনীয়। ইশরাকি আদর্শের এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে হিকমাত আল ইশরাক বা ইশরাকি দর্শন শীর্ষক বইয়ে।

সোহরাওয়ার্দির রচনাগুলোকে ব্যাখ্যা ও মন্তব্যের আলোকে করা শ্রেণী-বিন্যাসের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ভাগে রাখা হয়েছে তার চারটি আরবি বই। বইগুলো হচ্ছে তত্ত্বীয় ও শিক্ষণ-বিষয়ক। তার এ বইগুলোর প্রথমে রয়েছে অ্যারিস্টটলীয় বা মাশায়ি দর্শনের ব্যাখ্যা এবং এরপর দেয়া হয়েছে আলোকিত দর্শনের ব্যাখ্যা। মাশায়ি দর্শনের ব্যাখ্যায়ও সোহরাওয়ার্দির স্বীকয়তা লক্ষ্যনীয়। তার এই চারটি আরবি বই হচ্ছে: আত্তালুইহাত তথা টিকা বা ইশারাগুলো,  আলমুশারে ওয়া আল মুতারেহাত তথা ' নানা পথ ও পরিকল্পনা', আলমুকাওয়েমাত বা প্রতিরোধ এবং আল্ লামাহামাত বা সাধারণ বিষয়াদি।

এ চারটি বইয়ের মধ্যে আত্তালুইহাত তথা টিকা বা ইশারাগুলো শীর্ষক বই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর এ বইয়েরই ব্যাখ্যা হিসেবে লেখা হয়েছে মুতারেহাত বা  নানা পরিকল্পনা। আল্ লামাহামাত বইটি ওই টিকা শীর্ষক বইয়েরই সংক্ষিপ্ত রূপ। আর আলমুকাওয়েমাত বা প্রতিরোধ শীর্ষক বইটি হচ্ছে ওই একই বইয়ের সম্পূরক অংশ।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।