ইসলামী দর্শন বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন শেইখ সোহরাওয়ার্দি
দর্শন ও বিশেষ করে ইসলামী দর্শন এবং ইরফানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি।
তার লেখা ছোট ছোট বই ও উপমা-ভিত্তিক বা প্রতীকি এবং সুফি-ভাবধারায় সমৃদ্ধ গল্পগুলো তার ভেতরকার চিন্তা-ভাবনা এবং মনের কথাগুলো তুলে ধরেছে। দর্শন ও ইরফানের ক্ষেত্রে তার বিশেষ ঝোঁকগুলো ঠিক কোন্ কোন্ দিকে বেশি আকৃষ্ট বা কোন্ কোন্ দিকগুলো এসব ক্ষেত্রে সোহরাওয়ার্দির কাছে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তা বোঝার ভাল মাধ্যম হচ্ছে এইসব প্রতীকি গল্প ও বই। তার এসব রচনা তাকে চেনার ক্ষেত্রে তার শিক্ষামূলক ও তত্ত্বীয় রচনার চেয়ে বেশি কার্যকর। সোহরাওয়ার্দির আসল চেহারা ফুটিয়ে তোলার জন্য তার এইসব রচনা আয়নার মতই কার্যক্ষম। দর্শন ও ইরফানি বিষয়ক নানা শিক্ষা তুলে ধরার জন্যই তিনি লিখেছেন রহস্য-ভরা উপমা-কেন্দ্রীক এইসব রচনা। সোহরাওয়ার্দি তার নানা ধরনের আধ্যাত্মিক বা আত্মিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন এইসব রচনায় খুবই রহস্যপূর্ণ ভাষায়।
সোহরাওয়ার্দি উপমা-ভিত্তিক প্রতিটি পুস্তিকায় আত্মিক অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরতে গিয়ে কিছু কিছু রহস্যের পর্দাও তুলে ফেলেছেন। তার এ জাতীয় রচনার ভাষা একদিকে যেমন কমনীয়, মনোহর ও নান্দনিক তেমনি অন্যদিকে তা রহস্যপূর্ণ ও প্রতীকি। অস্তিত্ব জগতের মন-ভোলানো নানা দৃশ্যপট ও আধ্যাত্মিক-প্রেমের পথ-পরিক্রমার নানা পর্যায়ও উঠে এসেছে সোহরাওয়ার্দির এইসব আধ্যাত্মিক ভাবধারার রচনায়। আর এভাবে তার এ জাতীয় রচনা হয়ে উঠেছে পথ-হারিয়ে-ফেলা মানুষের হারিয়ে-যাওয়া উচ্চতর নানা লক্ষ্য ও আসল ঠিকানার দিশারী।
শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির বিরুদ্ধে কেউ কেউ এই অভিযোগ করেন যে তিনি ইসলাম-বিরোধী নানা প্রবণতার দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন এবং ইসলামের মোকাবেলায় জরাথ্রুস্ত ধর্মকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু তাদের এই অপবাদ পুরোপুরি ভিত্তিহীন। প্রাচীন ইরানের নানা বই-পুস্তক সম্পর্কে ব্যাপক ধারণা থাকায় সোহরাওয়ার্দি জরাথ্রুস্তদের কিছু কিছু প্রতীক ও উপমা ব্যবহার করেছেন তার চিন্তাধারাকে সহজ ভাষায় ফুটিয়ে তোলার জন্য। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে তার চিন্তাধারার মধ্যে ইসলামী বিশ্বাস বিরোধী কোনো কোনো ধারণা ঢুকে পড়েছিল।

প্রশ্ন হল সোহরাওয়ার্দি কেনো রহস্যময় ভাষার আশ্রয় নিয়েছিলেন? ভাষার শ্রীবৃদ্ধি ও আলঙ্কারিক সৌন্দর্য-বর্ধন, আধ্যাত্মিক প্রভাব বিস্তার এবং প্রথাগত কাহিনী ও কিংবদ্ন্তীগুলোতে ব্যবহৃত শব্দমালা ব্যবহার করে বর্ণনার বা ভাষার অপূর্ণতা দূর করাই ছিল এইসব রহস্যময় বা প্রতীকি ধারার ভাষা ব্যবহারের কিছু লক্ষ্য।
বাগ্মীতাপূর্ণ ভাষা বা রহস্যময় ভাষা কখনও কখনও ভক্ত বা অনুসারীদের তীব্র অনুপ্রেরণা জোগায়। এ ছাড়াও রহস্যময় ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দি তার রচনাগুলোকে অযোগ্য ও অবিবেচক বা শত্রু শ্রেণীর লোকদের হাত থেকে রক্ষা বা আড়াল করতে চেয়েছেন।
সোহরাওয়ার্দির ভাষার স্টাইল ও বিশেষ শব্দমালার প্রভাব কবি-সাহিত্যিক বা সাধারণ লেখকদের ওপর তেমন একটা দেখা যায় না। কিন্তু দর্শন ও সুফিতাত্ত্বিক বিষয়সহ অতীত ও বর্তমানের নানা বিষয়ের ওপর সোহরাওয়ার্দির দৃষ্টি দেয়ার পদ্ধতি অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের ওপর প্রভাব রেখেছে। তাদের এই প্রভাবের বিষয়টি কখনও সার্বিক ও কখনও আংশিক। সোহরাওয়ার্দির আলোকিত দর্শনের পুরো পদ্ধতিকেই অনেকে ব্যবহার করেছেন তাদের সুফি-তাত্ত্বিক চিন্তাধারা বর্ণনার ক্ষেত্রে।
সুফিবাদী কবি ফরিদউদ্দিন আত্তার 'পাখিদের সম্মেলন' শীর্ষক বইয়ে এবং মাওলানা রুমি তার মসনাভীতে সোহরাওয়ার্দির রহস্যময় ভাষার পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। পাখিদের সম্মেলন শীর্ষক বইয়ে রহস্যময় নানা বিষয় ও ভাবধারার অবতারণা করেছেন আত্তার। তার এই বইয়ের নানা ক্ষেত্রে সি-মোরগের মোকাবেলায় নানা ধরনের পাখির ব্যাপক ব্যবহারও লক্ষ্যনীয়। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এ ধরনের পদ্ধতি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেছেন সোহরাওয়ার্দি। অবশ্য তারও আগে গাজ্জালি ও ইবনে সিনাও এসব প্রতীকি শব্দ এবং কাহিনী ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের স্টাইল সোহরাওয়ার্দির মত এত ব্যাপক পরিসরে প্রভাব ফেলেনি। অথচ এসব ক্ষেত্রে সোহরাওয়ার্দির পদ্ধতি গল্পের কাঠামোয় এবং নানা চরিত্র ও বীর-নায়ক সৃষ্টিতে বেশি প্রভাব রেখেছে। নানা ধরনের গভীর ভাবধারার বিস্তারেও সোহরাওয়ার্দির এই ধারার প্রভাব লক্ষ্যনীয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে মাওলানা রুমির মসনাভীর বাঁশির কান্না শীর্ষক বর্ণনার কথা বলা যায়। এ বর্ণনায় বলা হয়েছে বাঁশি তার মূল উৎস তথা বাঁশের বাগানে ফিরে যাওয়ার জন্য আকুল বেদনা অনুভব করছে। বাঁশ-বাগান থেকে তার বিচ্ছিন্নতার বিপুল বেদনা প্রতীকী অর্থে পার্থিব দুনিয়ায় মানুষের একাকীত্ব তথা খোদা থেকে বিচ্ছিন্নতার সমার্থক।
রুমি বাঁশির বেদনার উপমাটির প্রেরণা পেয়েছেন সোহরাওয়ার্দির (গুরবাতে গ্বারিবাত বা) 'আগন্তক কিংবা মুসাফিরের একাকীত্ব' শীর্ষক উপমা-ভিত্তিক গল্প থেকে। অন্যদিকে একদল কবি, সাহিত্যিক ও সুফি সোহরাওয়ার্দির অসাধারণ সুন্দর কিছু ইরফানি চিন্তাধারা, বর্ণনা ও প্রতীকি উপমা আংশিকভাবে ব্যবহার করেছেন। এদের মধ্যে সর্বাগ্রে মহাকবি হাফিজের নাম উল্লেখ করা যায়। হাফিজের কবিতায় অস্তিত্বের ওপর খোদায়ী প্রেমের তাজাল্লি বা আলোকচ্ছটা ও সৃষ্টির দর্শন সংক্রান্ত যে সব চিত্র-কল্প রয়েছে তারও অনুপ্রেরণার উৎস সোহরাওয়ার্দির ইশরাকি দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি।
মাওলানা রুমি সোহরাওয়ার্দির উপমার পদ্ধতিতে প্রভাবিত হলেও তিনি উপমা ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন। রূমির উপমা ব্যবহারের লক্ষ্য হচ্ছে নিজ দর্শন ও ইরফানি ভাবনাকে প্রকাশ করা। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দির বিষয়টা হচ্ছে পুরোপুরি উল্টো। অর্থাৎ তিনি প্রতীক ব্যবহার করতে গিয়ে নিজ দর্শন ও ইরফানি বিষয়গুলোকেই করেছেন রহস্যময়। #
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ০৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।