শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির রচনাবলী 'জিব্রাইলের পালকের শব্দ'
গত পর্বের আলোচনায় আমরা বলেছিলাম শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির কোনো কোনো রচনার উপমাকেন্দ্রীকতা ও রহস্যময় প্রতীকিধর্মীতার প্রভাব পড়েছিল মাওলানা রুমি, আত্তার ও হাফিজের মত ফার্সি সাহিত্যের বড় বড় দিকপালদের ওপর।
সোহরাওয়ার্দির এসব উপমা ও রহস্যময় প্রতীকের মধ্যে রয়েছে আলো এবং অন্ধকারের উপমা। তার ব্যবহৃত কোনো কোনো রহস্যময় উপমা প্রাচীন ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং কোনো কোনোটি তার নিজেরই ব্যাপক কল্পনা-শক্তি ও সৃজনশীলতার সুবাদে উদ্ভাবিত।
'আওয়াজে পারে জিব্রায়িল' বা 'জিব্রাইলের পালকের শব্দ' সোহরাওয়ার্দির একটি পুস্তিকা। ফার্সি ভাষার এই রচনার কিছু ব্যাখ্যা লিখেছেন হেনরি কোরবিন ও পাওয়েল ক্রাউস। পুস্তিকাটি ফরাসি ভাষায়ও হয়েছে অনূদিত ও প্রকাশিত। আর এটির ফার্সি সংস্করণ প্রকাশ করেছেন ডক্টর মাহদি বায়ানি। ডক্টর জাবিউল্লাহ সাফা 'ইরানের সাহিত্য ও ভাষার ইতিহাস' শীর্ষক বইয়ে 'জিব্রাইলের পালকের শব্দ' শীর্ষক সোহরাওয়ার্দির পুস্তিকা প্রসঙ্গে বলেছেন:
'রহস্যময় প্রতীক ও উপমা-আশ্রিত গল্পসমৃদ্ধ এ পুস্তিকা অত্যন্ত সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা হয়েছে। এতে প্রশ্ন-উত্তরের আঙ্গিকও ব্যব্হার করেছেন সোহরাওয়ার্দি। সাধারণ জনগণের কথার স্টাইল ও বাকরীতি দেখা যায় এ পুস্তিকায়। তাই এ পুস্তিকা ষষ্ঠ শতকের কথ্য ফার্সির রূপটিও তুলে ধরছে।' অবশ্য পুস্তিকার আরবি শব্দ-সম্ভার ও রহস্যময় ভাষা এর গদ্যকে কিছুটা ভারি করে তুলেছে।
সোহরাওয়ার্দির 'জিব্রাইলের পালকের শব্দ' শীর্ষক ছোট্ট এ বইটির নামই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তাতে রয়েছে রহস্য-ঘেরা আলোচনা। একটি আধ্যাত্মিক সৌরভের সুবাসও পাওয়া যায় এ নাম থেকে। এ পুস্তিকার বেশিরভাগ পরিভাষাই ধাঁধাময় এবং বহু ক্ষেত্রে সেসব কাব্যিক-কল্পনাধর্মী তুলনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে এসব শব্দের অর্থ বোঝা বেশ কঠিন। অস্পষ্ট এসব শব্দের কোনো কোনোটি প্রথাগত ইরফান বা আধ্যাত্মিক প্রেমময় বার্তার প্রতীক। আবার কোনো কোনোটি সোহরাওয়ার্দির একান্তই নিজস্ব উদ্ভাবন যা প্রাচীন সুফি-সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া যায় না।

শেইখ শিহাবউদ্দিন সোহরাওয়ার্দি ধর্মীয় কুপমন্ডুকতা বা ধর্মান্ধ লোকদের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য তার 'জিব্রাইলের পালকের শব্দ' শীর্ষক পুস্তিকার কোনো কোনো বক্তব্যকে রহস্যের আবরণে ঢেকে রাখতে বাধ্য হয়েছেন।
সোহরাওয়ার্দির এই পুস্তিকা তার আধ্যাত্মিক উর্ধ্বজগত অবলোকনেরই প্রকাশ। আর এ পুস্তিকার বিষয়বস্তু থেকেই বোঝা যায় যে তার আধ্যাত্মিক ভ্রমণ ঘটেছিল ঘুমন্ত অবস্থায়।
ছোট্ট এ বইটির গল্প বর্ণনার আগে বইটি লেখার উদ্দেশ্য তুলে ধরেছেন সোহরাওয়ার্দি। কোনো এক ধর্মান্ধ ব্যক্তি ধর্মান্ধতা ও সংকীর্ণতার কারণে অতীত যুগের কয়েকজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব বিশেষ করে খাজা আবু আলী ফারমাদি সম্পর্কে অশোভন কিছু কথা বলেছিল। আর তারই জবাবে লেখা হয়েছে এ পুস্তিকা। সোহরাওয়ার্দি এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা তুলে ধরেছেন যেখানে আবু আলীকে অবমাননাকারী ওই ব্যক্তি তার কাছে প্রশ্ন করে যে, কেনো বিশেষ পোশকধারী তথা দরবেশরা কোনো কোনো শব্দকে জিবরাইলের পালকের শব্দ বলে মনে করেন এবং বেশিরভাগ বিষয়ই যা পঞ্চইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা যায় তা কি জিব্রাইলের পালকের শব্দ? আবু আলী ফারমাদি জবাবে ওই ধর্মান্ধ ব্যক্তিকে বললেন:
'আপনি নিজেও জিব্রাইলের পালকের শব্দগুলোর অন্যতম।' ধর্মান্ধ লোকটি তখন এ কথার রহস্য বা ব্যাখ্যা জানানোর জন্য বার বার চাপ দিতে থাকে। ওই লোকটি বলছিল: এসব কথা অর্থহীন ও প্রলাপ জাতীয় কথা-বার্তারই প্রতীক। সোহরাওয়ার্দি ওই ব্যক্তির স্পর্ধা দেখে তাকে সাধারণ বুদ্ধি-সম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন: এখন আমি জিব্রাইলের পালকের আওয়াজের ব্যাখ্যা যথাযথ অঙ্গীকার ও শক্তিশালী চিন্তা দিয়ে তুলে ধরার জন্য এ নামেই একটি পুস্তিকা লেখা শুরু করব। আপনার যদি যোগ্যতা থাকে তাহলে এই পুস্তিকাটি বুঝতে পারবেন।
সোহরাওয়ার্দি 'জিব্রাইলের পালকের আওয়াজ' শীর্ষক পুস্তিকাটি মহান আল্লাহর নাম নিয়ে লেখা শুরু করেন। এতে মহান আল্লাহর প্রতি তার গভীর বিশ্বাস ও আন্তরিক আস্থাই ফুটে উঠেছে। সংক্ষিপ্ত ভূমিকার পর কাহিনীর আকারে শুরু করেন মূল পুস্তিকার রচনা। বাক্যের বক্তা বা উত্তম পুরুষ হিসেবে তিনি বর্ণনা দিতে থাকেন এবং ঘটনাগুলো ঘটতে থাকে রাতের বেলায়। এভাবে একটি বিশেষ ঘটনায় বিশেষ প্রশ্নের উত্তর দেয়াকে কেন্দ্র করে সোহরাওয়ার্দি রচনা করেন তার অন্যতম সেরা গভীর দর্শন-চিন্তা-সমৃদ্ধ বই 'জিব্রাইলের পালকের আওয়াজ'।
সোহরাওয়ার্দির 'জিব্রাইলের পালকের আওয়াজ' শীর্ষক বইয়ের কাহিনীগুলো দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশে রয়েছে সত্য-সন্ধানী তথা আলোকিত দর্শনের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বক্তব্য। এই ব্যক্তিত্ব আসলে সোহরাওয়ার্দি নিজেই। তিনি এক খানকায় যান যার রয়েছে দু'টি দরজা। এক দরজা দিয়ে ঢোকা যায় শহরে। আর অন্য দরজাটি হল খোলা প্রান্তরের। সত্য-সন্ধানী যান খোলা প্রান্তরে। পথে দেখা হয় দশজন অভিজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে যাদের বিপুল শক্তিমত্তা তাকে করে একইসঙ্গে মুগ্ধ ও ভীত-বিহ্বল। এই গল্পের নায়ক এক দার্শনিককে প্রশ্ন করেন যে তার বাসভবন কোথায়? এই দার্শনিককে সত্য ও বাস্তবতার পথ দেখান তারই 'ভেতরকার নবী' তথা বিবেক ও ফেরেশতা। এ গল্পের নায়ক ওই দার্শনিকের কাছে সৃষ্টির রহস্য, খোদাপ্রেম-সাধনার নানা স্তর, আকাশগুলোর গঠন, একাকীত্বের জগত ও সে জগতের স্মৃতি সম্পর্কেও প্রশ্ন করেন। এভাবে চলতে থাকে প্রশ্ন-উত্তরের পালা। অন্য কথায় এভাবে সোহরাওয়ার্দি ইশরাকি তথা আলোকিত দর্শনের মূল শিক্ষাগুলো ও খোদাপ্রেমের পথিক হওয়ার কৌশল স্পষ্ট করেন। আর এসবের জন্য দরকার কুরআনের শিক্ষা।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২২
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।