অক্টোবর ২৮, ২০১৯ ১৬:২০ Asia/Dhaka

শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির 'আওয়াজে পারে জিব্রায়িল' বা 'জিব্রাইলের পালকের শব্দ' শীর্ষক রচনার নানা দিক ও বিশেষ করে এ পুস্তিকার প্রথম খণ্ড সম্পর্কে আমরা জেনেছি গত পর্বের আলোচনায়।

এ পুস্তিকার প্রথম খণ্ডের কাহিনীতে দেখা যায় কাহিনীর নায়ক সেই শিক্ষক বা অধ্যাপক তথা সোহরাওয়ার্দির 'ভেতরকার নবী' বা বিবেক তারই ছাত্র তথা সত্য-পিয়াসী সোহরাওয়ার্দিকে নানা দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন। এক পর্যায়ে এই মহান শিক্ষকের কাছে 'ইসমে আযম' তথা মহান আল্লাহর সবচেয়ে বড় নাম শিখতে চান সোহরাওয়ার্দি। ওই শিক্ষক রাজি হন এবং তাকে খুব অদ্ভুত ধরনের একটি মন্ত্র বা বাক্য শেখান। ডক্টর সাইয়্যেদ হুসাইন নাসর্‌-এর মতে অদ্ভুত ওই বাক্য হচ্ছে 'জাফার' নামক বিদ্যার রহস্য বা গোপন সূত্রাবলী। জাফার হচ্ছে এমন আধ্যাত্মিক জ্ঞান যাতে অক্ষর বা শব্দ ও বাক্যগুলোর বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয় সংখ্যাগত প্রতীক ও উপমা। কেউ কেউ বলেন রহস্যময় এই জ্ঞানের মাধ্যমে সব ধরনের জ্ঞান অর্জন করা যায়।

যাই হোক্, এরপর সোহরাওয়ার্দির ওই পুস্তিকায় বলা হয়েছে মহান আল্লাহ 'ফেরেশতাকুল' জাতীয় শব্দগুলো সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি সৃষ্টি করেছেন আরও কিছু শব্দ যেগুলো ফেরেশতাদের চেয়েও বড়। 'মানুষ'ও হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা একটি শব্দ এবং তা জিবরাইলের একটি শব্দ বা ডাক। জিব্রাইলের ডানাগুলো আকাশমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলে বিস্তৃত। 

শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির 'আওয়াজে পারে জিব্রায়িল' বা 'জিব্রাইলের পালকের শব্দ' শীর্ষক রচনায় আরও লেখা হয়েছে:  এই বিশ্ব জগত ছায়াগুলোর জগত। পশ্চিম বা পাশ্চাত্য হচ্ছে জিবরাইলের কেবলই বাম ডানার ছায়া। অন্যদিকে বেহেশতি আলোগুলোর জগত হল প্রাচ্য। এই প্রাচ্য হচ্ছে জিব্রাইলের ডান দিকের পাখা বা ডানার প্রতিফলন মাত্র। এভাবে বলা যায় এ বিশ্বের সব কিছুই জিব্রাইলের পালকের আওয়াজ থেকে উদ্ভুত হয়েছে। এই অতি আপন মহান ফেরেশতার বাক্য বা কথা ও শব্দ থেকে জন্ম নিয়েছে মানুষ।  আর খোদায়ী নামের মাধ্যমে মানুষ পরিপূর্ণতা অর্জন করে এবং নিজের মূল অবস্থা ও সত্তাকে ফিরে পায়।

শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি 'জিব্রাইলের পালকের শব্দ' শীর্ষক ছোট্ট বইয়ের মাধ্যমে খোদায়ী দর্শনের আলোকে আধ্যাত্মিক পরিচিতির মৌলিক দিকগুলো তুলে ধরেছেন। এসব বিষয় তুলে ধরার জন্য তিনি ব্যবহার করেছেন কবিতার প্রথাগত কিছু প্রতীক ও সুফি-গদ্য সাহিত্যের রীতি। সোহরাওয়ার্দি তার এ জাতীয় রচনার মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তির অনুসারী ও ইরফানের সমর্থকদের নানা মতভেদও তুলে ধরেছেন। তিনি তার এ জাতীয় রচনায় খুব বেশি প্রতীক ব্যবহার করেছেন যাতে এসব লেখার আলঙ্কারিকতা বা বাগ্মিতা, কথামালার পরিধি ও গভীরতা এবং সৌন্দর্য বাড়ে। আর একইসঙ্গে শিষ্য বা অনুসারীদের জন্য আধ্যাত্মিক আকর্ষণ সৃষ্টিও ছিল তার রহস্যময় ভাষা ব্যবহারের আরও একটি বড় কারণ।  পাঠকের ওপর প্রভাব ফেলতে কার্যকর ও সুন্দর এ পুস্তিকা সোহরাওয়ার্দির অনন্য সূক্ষ্মদর্শিতা, সুরুচি ও প্রবল রোমান্টিকতা তথা অসাধারণ কল্পনা-শক্তির পরিচয়ও তুলে ধরেছে।

সোহরাওয়ার্দির প্রতীকধর্মী ও রহস্যময় ভাষার রচনাগুলো আসলে তারই প্রকৃত চেহারা তুলে ধরেছে। এসব রচনা তার আত্মিক ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতারই ফসল।  

রেসালেইয়ে লোগাতে মুরিয়ান বা 'উইপোকার কথপোকথন বিষয়ক রচনা' সোহরাওয়ার্দির একটি বিখ্যাত পুস্তক। তিনি ছোট্ট এ বইটি লিখেছেন ফার্সি ভাষায়। এ পর্যন্ত এ বইটির কয়েকটি সংস্করণ বের হয়েছে। প্রথমবার বইটি ছাপাখানা থেকে বের হয় অটো স্পইস ও খটক-এর সম্পাদনার সুবাদে। এই সংস্করণের সঙ্গে বইটির ইংরেজি অনুবাদ এবং সোহরাওয়ার্দির আরও দু'টি ছোট্ট বইও যুক্ত হয়েছিল।  আর এ বইটির নাম দেয়া হয়েছিল 'তাসাওউফ বা সুফিবাদের তিন পুস্তিকা'।

শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির 'উইপোকার কথপোকথন বিষয়ক রচনা'র ফার্সি টেক্সট প্রকাশ করা হয়েছিল 'এশিয়ান নিউজপেপার' শীর্ষক ম্যাগাজিনে ১৯৩৫ সালে। এ রচনার ফরাসি অনুবাদও দেয়া হয়েছিল ওই ম্যাগাজিনে হেনরি কোরবিনের প্রচেষ্টায়। রচনাটি সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছিলেন ডক্টর সাইয়্যেদ হুসাইন আরব। জনাব আরব এ জন্য ইরানের জাতীয় গ্রন্থাগার থেকে ওই পুস্তিকার হাতে লেখা একটি কপি এবং একটি ছাপানো কপি ব্যবহার করেছিলেন।

সোহরাওয়ার্দির 'উইপোকার কথপোকথন বিষয়ক রচনা' শীর্ষক ফার্সি পুস্তিকাটি পুরোপুরি সুফিতাত্ত্বিক বই। কোনো এক বন্ধুর অনুরোধে এই পুস্তিকাটি লিখেছিলেন তিনি। ছোট্ট এ বইটির নামই বলে দিচ্ছে যে তা প্রতীকি নাম।  মহান আল্লাহর নাম নিয়ে ও মহানবী (সা)'র ওপর দরুদ উচ্চারণ করে বইটি লেখা শুরু করেছেন সোহরাওয়ার্দি।  ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও সামাজিক পরিস্থিতির কারণে তিনি তার এ বইটিতেও প্রতীকী বা রহস্যময় ভাষা ও শব্দ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। উই পোকা বলতে আসলে সোহরাওয়ার্দি নিজেকেই বুঝিয়েছেন। রহস্যময় ভাষায় খোদাপ্রেমের রীতি ও পদ্ধতিগুলো তিনি তুলে ধরেছেন এ পুস্তিকায়। উই পোকা বা সাদা প্রজাতির পিপড়া অত্যন্ত  ধৈর্যশীল, অধ্যাবসায়ী ও কষ্ট-সহিষ্ণু প্রাণী। এরা মরু-প্রান্তরে ও নানা উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায় জীবিকা অর্জনের জন্য। কিন্তু এই প্রাণী কখনও এমন উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছে ও  বেহেশতি আলোকমালার প্রকাশ হয়ে পড়ে যে তারা হযরত সুলাইমান (আ)'র মত মহান নবীরও পথ-প্রদর্শক হয় এবং পরিণত হয়  তাঁর ত্রাণকর্তায়। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।