নভেম্বর ২৭, ২০১৯ ১২:১৯ Asia/Dhaka

গত পর্বে আমরা খ্রিস্টিয় দ্বাদশ শতকের ইরানি দার্শনিক ও আরেফ শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির বিখ্যাত পুস্তক 'রিসালাহ ফি হাক্বিক্বাতাল ইশক' বা 'প্রেমের বাস্তবতা বিষয়ক রচনা' নিয়ে আলোচনা করছিলাম।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, আধ্যাত্মিক প্রেম বা খোদাপ্রেম নিয়ে এ পর্যন্ত যত বই লেখা হয়েছে সেসবের মধ্যে এমন সুন্দর বই খুব কমই লেখা হয়েছে। অত্যন্ত সুন্দরভাবে লেখা এ বই পরিপক্কতা, মানানসই কবিতা ও প্রতীকধর্মীতায় সমৃদ্ধ। বাহ্যিকভাবে এ পুস্তকের গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র হযরত ইউসুফ ও ইয়াকুব নবী আর জোলায়খা। কিন্তু এ গল্পের মর্মার্থ পুরোপুরি ইরফান ও দর্শনের শিক্ষায় পরিপূর্ণ।  আসলে সোহরাওয়ার্দি তার দর্শন ও ইরফানি চিন্তাধারাকে তুলে ধরার জন্য এ পুস্তিকায় গল্প, কবিতা ও রহস্যময় নানা ধরনের প্রতীক বা উপমা ব্যবহার করেছেন।

গত পর্বে আমরা সোহরাওয়ার্দির 'প্রেমের বাস্তবতা বিষয়ক রচনা'র তিন ভাইয়ের কাহিনী তথা 'দুঃখ', 'সৌন্দর্য' আরপ্রেমএর প্রতীকি ও রহস্যময় কাহিনী শুনছিলাম। ওই কাহিনীতে সোহরাওয়ার্দি তার শৈল্পিক ও রহস্যময় ব্যাখ্যায় লিখেছেন: মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম সৃষ্টি করেছেন আক্‌ল্‌ বা বুদ্ধিবৃত্তি। এরপর আক্‌ল্‌কে দিয়েছেন তিনটি বৈশিষ্ট্য: প্রথমত স্বয়ং আল্লাহকে চেনার গুণ, মানুষকে চেনার গুণ ও অন্যকে চেনা তথা অন্য কথায় সোহরাওয়ার্দিকে চেনার গুণ। আকলের  প্রথম এই গুণ তখা খোদাকে চেনার গুণ থেকে সৃষ্টি হল 'সৌন্দর্য', দ্বিতীয় বৈশিষ্ট থেকে সৃষ্টি হল 'প্রেম' এবং তৃতীয় গুণ থেকে সৃষ্টি হল 'দুঃখ বা বিরহ'। সৌন্দর্যের যাত্রাপথ সম্পর্কে জানত না অন্য দুই ভাই। কিন্তু পরে তারা তাকে আদমের মধ্যে খুঁজে পায়।

'প্রেমের বাস্তবতা বিষয়ক রচনা'র ওই কাহিনীতে সোহরাওয়ার্দি তার শৈল্পিক ও রহস্যময় ব্যাখ্যায় আরও লিখেছেন: আদমের পর 'সৌন্দর্য' আসে হযরত ইউসুফের মধ্যে। তার অন্য দুই ভাই 'প্রেম' ও 'দুঃখ' সৌন্দর্যকে ইউসুফের মধ্যে একাকার হয়ে যেতে দেখেও কিছুই করতে পারেনি। ফলে তারা সৌন্দর্য সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়ে তারা  একে-অপরের দেশে রওনা হয় সৌন্দর্য যায় ফিলিস্তিনের কাননেআর হযরত ইয়াকুব (আঃ) তথা ইউসুফ নবীর বাবার সঙ্গে 'দুঃখে'  মিলন ঘটে দুঃখের ঘর নামক বাড়িতে। তাদের এই একাত্মতা এতো বেশি বিস্তৃত হয় যে হযরত ইয়াকুব তাঁর চোখ দুটিকে দুঃখের কাছে উপহার দেন। অন্য ভাই যার নাম প্রেম সে যেতে থাকে  যেতেই থাকে এবং এভাবে শেষ পর্যন্ত সে মিশরে পৌঁছে সেখানে সে মিশরের প্রধানমন্ত্রী বা গভর্নরের ঘরে পৌঁছায় প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী জোলাখা 'প্রেমে'র ঠিকানা ও নাম নিশানা খুঁজতে থাকে সে প্রশ্ন করে: তুমি কে কোথা থেকে এসেছো? 'প্রেম' উত্তরে বলে আমি বায়তুল মকাদ্দাস থেকে এসেছি আমার ঠিকানা হল 'রুহাবাদ' এবং বাড়ির নাম হলো সৌন্দর্যের বাড়ি পর্যটন বা ভ্রমন আমার পেশা।

'প্রেমের বাস্তবতা বিষয়ক রচনা'র ওই কাহিনীতে সোহরাওয়ার্দি তার শৈল্পিক ও রহস্যময় ব্যাখ্যায় আরও লিখেছেন:  'প্রেম' তার ও তার ভাইদের গল্প জোলায়খার কাছে বলে এবং জগতের সেরা সুন্দর তথা চন্দ্রমুখীদের সুলতান ইউসুফ নবীর প্রতি তার ভাই সৌন্দর্য্যের হৃদয়-দেয়া বা প্রেম নিবেদনের কাহিনীও বর্ণনা করে। জোলায়খা বলে যে, ইউসুফ মিশরে রয়েছেন। 'প্রেম' আনন্দদায়ক এ কথা শুনে জোলায়খার গলায় ঝুলে পড়ে ও বলতে থাকে যে যেভাবেই হোক আমরা সেখানে যাব ও ইউসুফকে দেখব। 'প্রেমে'র সঙ্গে মিশে-যাওয়া জোলায়খা ইউসুফের মধ্যে 'সৌন্দর্য'কে দেখতে পেয়ে তার গভীর প্রেমে পড়ে যান। কিন্তু মিশরের জনগণ তাকে তিরস্কার করতে থাকেন। ইউসুফ মিশরের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এই খবর কানানে চলে যায়। হযরত ইয়াকুব নবী এ খবর শুনে তার সন্তানদেরকে নিয়ে মিশরের দরবারে আসেন। ইয়াকুব নবী দেখেন যে ইউসুফ-জোলায়খা রাজ-সিংহাসনে হেলান দিয়ে আছেন। তাদের একজন হয়ে গেছেন 'চরম সৌন্দর্য্য' ও অন্যজন হয়েছেন 'চরম প্রেম'ইয়াকুব নবীর সঙ্গে আসা দুঃখ তার দুই ভাইয়ের মুখোমুখী হন। এভাবে তিন ভাই 'প্রেম', 'দুঃখ' ও 'সৌন্দর্য' আবারও পরস্পরের দেখা পায়। আর এখানেই শেষ হয় সোহরাওয়ার্দির ওই গল্প।

ইরানি দার্শনিক ও আরেফ শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি 'প্রেমের বাস্তবতা বিষয়ক রচনা'য় তার এই রহস্যময় ও প্রতীকি গল্পের ভাবার্থ এবং নানা শব্দের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রেম শব্দটির ব্যাখ্যা দেয়ার পর তিনি প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ সম্পর্কে কথা বলেছেন। তার মতে এ দুনিয়ায় মানুষের উচিত আধ্যাত্মিক প্রেম খুঁজে নেয়া ও প্রেমকে প্রেমাস্পদের কাছে উৎসর্গ করাকারণ প্রেমের মাধ্যমেই প্রেমিকের মিলন ঘটে প্রেমাস্পদের সঙ্গে। তাই প্রেম ও তার নানা স্তর সম্পর্কে জানতে হবে। আর নিজেকে প্রেমাস্পদের কাছে উৎসর্গ করার পরই নানা বিস্ময় দেখা সম্ভব হয় বলে সোহরাওয়ার্দি মন্তব্য করেন।

সোহরাওয়ার্দি এরপর প্রেম-ভালবাসা বা ইশক্‌ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, 'ইশক্‌' শব্দটি এসেছে 'আশাকাহ্‌' শব্দ থেকে যা একটি গাছের নাম। গাছটি অন্য বড় গাছকে জড়িয়ে ধরে তা থেকে পানি নেয় ও এর ফলে তা হলুদ হয়। ইশক লতার শোষণের কারণে গাছটির পাতাগুলো ঝরে পড়ে এবং এক সময় গাছটিও শুকিয়ে পড়ে। ইশরাকি বা আলোকিত দর্শনের গুরু সোহরাওয়ার্দির মতে মানুষও হচ্ছে সেই গাছ যা আত্মা বা হৃদয়ের বীজ থেকে উর্ধ্বজগতে গজিয়ে ওঠে। আর দেহ হল সেই বেহেশতি গাছের ঠিক বিপরীত। প্রেম হচ্ছে সেই পরগাছার মত যা মানুষকে প্যাঁচিয়ে ধরে মানবতার সব রসটুকু ভোগ করে। আর এভাবে তা মানুষকে পৌঁছে দেয় অমরত্বের জগতে ও দেহটাকে রেখে যায় ধ্বংসশীল জগতে।

ইরানি দার্শনিক ও আরেফ সোহরাওয়ার্দির দৃষ্টিতে 'প্রেমিক' হওয়াই মানুষের জীবনের সারাংশ ও লক্ষ্য হওয়া উচিত। কারণ  এই দুনিয়া তথা ইহকাল হচ্ছে স্বল্পস্থায়ী, কিন্তু পরকাল হচ্ছে চিরস্থায়ী।  আর অসীম ও চিরস্থায়ী জগতে পৌঁছার  জন্য সব অস্তিত্বের মাশুক বা প্রেমাস্পদ  মহান এক আল্লাহ'র অনুরাগী হওয়া ও তাঁর সঙ্গ লাভ করা জরুরি। প্রেম কেবল সৌন্দর্য্যরাজির মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করে। আর এ জন্যই বলা হয়,' মহান আল্লাহ সুন্দর ও সুন্দরদের ভালবাসেন'। (ইন্নাল্লাহা তায়ালা জামিল ওয়া ইয়ুহিব্বুল জামাল) প্রেম মানুষকে করে বিশুদ্ধ যাতে পবিত্র ও আন্তরিক হয়ে মহান আল্লাহর দরগাহে হাজির হওয়া যায়।

যদি প্রেম না থাকতো জগতে কোথা পেতে মধুর বিরহ-আকুল? ....

যদি বাতাস না থাকতো তবে  উড়তো না প্রেমিকার চুল...

যদি না দেখা যেত প্রেমাস্পদের ফুল্ল-মুখ

গাইত না প্রেমিক, বাগিচার বুলবুল।#