শেইখ সোহরাওয়ার্দির পুস্তক 'সিমোর্গের দূত'
গত কয়েক পর্বে আমরা খ্রিস্টিয় দ্বাদশ শতকের ইরানি দার্শনিক ও আরেফ শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির তিনটি বিখ্যাত বইয়ের প্রতীকী ও রহস্যময় উপমা-সমৃদ্ধ গল্প নিয়ে আলোচনা করেছি।
তার ওই তিনটি বইয়ের নাম হল 'জিব্রাইলের পাখা বা পালকের আওয়াজ', 'পিপড়া বা উই পোকার কথোপকথন' এবং 'প্রেমের বাস্তবতা বিষয়ক রচনা'। আজ আমরা সোহরাওয়ার্দির আরেকটি বই 'সাফিরই সিমোর্গ' বা 'সিমোর্গের দূত' নিয়ে আলোচনা করব। খোদাপ্রেম, আধ্যাত্মিক খোদায়ি জ্ঞান ও ইরফানের বা ইসলামী আধ্যাত্মিক রহস্যবাদের নানা স্তর এবং ধ্বংস ও প্রত্যক্ষ মৃত্যুর রহস্য তথা 'মরার আগেই মরতে পারার জ্ঞান' বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রচনা হল এ ছোট্ট বই। বইটি পুরোপুরি জ্ঞান-নির্ভর ও দার্শনিক সোহরাওয়ার্দির সুবিন্যস্ত চিন্তাধারার ফসল। ইশরাকি বা আলোকিত দর্শনের পথিকৃৎ শেইখ সোহরাওয়ার্দির এ বইটির নানা প্রবন্ধ সে যুগের জ্ঞান-নির্ভর রচনাগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও খুবই নিখুঁত।
সোহরাওয়ার্দি এ বইয়ে প্রতীকি ও রহস্যময় গল্পের মাধ্যম হিসেবে যে সি-মোর্গ ব্যবহার করেছেন তা দর্শন ও ইরফানের ক্ষেত্রে অতীতের অন্য ইরানী মনীষীদের লেখায় ব্যবহৃত সি-মোর্গ থেকে বহুলাংশেই ভিন্ন প্রকৃতির। যেমন, ইবনে সিনা ও গাজ্জালিও তাদের লেখায় সি-মোর্গ প্রতীকটি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দির 'সি-মোর্গ' তাদের সি-মোর্গ-এর চেয়ে অনেক বেশি ভিন্ন প্রকৃতির।
সোহরাওয়ার্দির দৃষ্টিতে যে হুদহুদ বা মোহনচূড়া পাখিকে ধীর প্রক্রিয়ায় বিশেষ চিন্তাধারা ও শিক্ষার আলোকে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হয় তা সী-মোর্গে পরিণত হয়। তার কাঙ্ক্ষিত সি-মোর্গ হতে হলে হুদহুদ পাখিকে বসন্তকালে তার নীড় ছেড়ে চলে যেতে হবে এবং নিজের লম্বা ঠোঁট দিয়ে পালক ও পাখা বা ডানা উপড়ে ফেলে কুহেকাফ পাহাড়ে আসতে হবে। এখানেই শেষ নয়। হুদহুদকে সি-মোর্গ হতে হলে এরপর তার ওপর কুহেকাফ পাহাড়ের ছায়া পড়তে হবে এক হাজার বছর ধরে। তবে এই এক হাজার বছর সত্য বা খোদা-প্রেমিকের কাছে কেবল একটি সকাল-বেলার সমান। আর এভাবেই হুদহুদ পাখি পরিণত হয় সি-মোর্গে।
যে কোনো হুদহুদ পাখি সি-মোর্গে পরিণত হতে পারবে- বলার মধ্য দিয়ে সোহরাওয়ার্দি এটা বুঝিয়েছেন যে সব খোদা-প্রেমিককেই পূর্ণতার ও উন্নতির পথ দেখানো হয়। যদিও এই পূর্ণতা ও উন্নতির পথ পাওয়া সহজ নয় তবুও সোহরাওয়ার্দির মতে তা পাওয়া একেবারেই অসম্ভব নয়।

সোহরাওয়ার্দির রচনা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কোনো কোনো সমালোচকের মতে সোহরাওয়ার্দি এ বইয়ে খাঁটি খোদা প্রেমিকদের মারেফাত পাওয়ার বিষয়টি বর্ণনা করেছেন। সি-মোর্গ গল্পের শুরুতে রয়েছে সফরের সূচনার কথা। এ সফর আধ্যাত্মিক বা আত্মিক জগতের সফর। এ সফরের বর্ণনাকারীরা হচ্ছেন 'আলোকিত বর্ণনাকারী'। কারণ সোহরাওয়ার্দিসহ এ ধরনের বর্ণনাকারীরা আলোকিত দর্শনে বিশ্বাসী যার ভিত্তি হচ্ছে আলো ও উজ্জ্বলতা। সোহরাওয়ার্দির মতে এই বর্ণনাকারীদের কাজ হল মানুষের কাছে আলোকিত পথ তুলে ধরা।
সিমোর্গ গল্পের যে সফর তার সফরকারী হুদহুদ পাখি তার নীড় ছেড়ে দেয় এবং তার লম্বা ঠোঁট দিয়ে নিজের পাখা ও পালক উপড়ে ফেলে। এই হুদহুদ আসলে সেই খোদাপ্রেমিকেরই প্রতীকি রূপ যার খোদা-প্রেমের অভিসারের শর্ত হল পাপমুক্ত থাকা বা পাপের বোঝা হাল্কা থাকা ও আল্লাহ ছাড়া অন্য বিষয়গুলোর দিকে আকর্ষণ না থাকা। আর এসব শর্ত পূরণের জন্যই হুদহুদ তার বাসা বা নীড় ত্যাগ করে এবং নিজের পাখা ও পালক তুলে ফেলে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সব ঝোঁক-প্রবণতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে।
হুদহুদের সফরের ঋতু হল বসন্তকাল। এ ঋতু হচ্ছে পরিবর্তনের ও প্রস্ফুটনের ঋতু। সোহরাওয়ার্দির ভাষায় এ ঋতুতে আলোকিত মনের অধিকারীরা হৃদয়ের কালো বা অন্ধকারময় শীতকালরূপী নাফসের দাসত্ব থেকে মুক্ত হন এবং খোদাপ্রেমের আলোকিত জগতে তথা বসন্ত ঋতুতে পৌঁছেন। হুদহুদ পাখির এই সফরের লক্ষ্য বা গন্তব্য হল কুহে কাফ তথা কাফ-পাহাড়। বিশ্বের ভৌগলিক সীমারেখার মাঝে এই পাহাড়ের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। আর এই সফরের সময়কাল হচ্ছে এক হাজার বছর। কিন্তু সত্য বা খোদাপ্রেমিকদের পঞ্জিকায় এই এক হাজার বছর মানে এক প্রভাত মাত্র। হুদহুদ পাখির এই সফরের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল সিমোর্গ হওয়া। হুদহুদ পাখির সফর আসলে খোদাপ্রেমিকের আত্মার সফর। এই সফর শেষে হুদহুদ পরিণত হয় সি-মোর্গ এবং অর্জন করে বেশ কিছু মহান গুণ। সোহরাওয়ার্দি এই গুণগুলোকে বিশটি সেরা গুণের কাঠামোয় স্মরণ করেছেন। সোহরাওয়ার্দি সিমোর্গ ও হুদহুদের জন্য যেসব গুণের কথা বলেছেন সেসব নিঃসন্দেহে পূর্ণ মানবের নানা গুণ। এ ধরনের মহামানব নেতৃত্ব ও নবুওতের পদ লাভ করেছেন। আর এ ধরনের মহামানবের দূত মানুষকে সচেতন করেন।
শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি 'সিমোর্গের দূত' শীর্ষক বইয়ের ভূমিকায় পূর্ণ মানবের বিষয়ে বক্তব্য রেখেছেন। পূর্ণ মানব হওয়ার যোগ্যতা ও পর্যায়গুলো তিনি বর্ণনা করেছেন রহস্যময় প্রতীক বা উপমা ব্যবহার করে। সোহরাওয়ার্দি পূর্ণতার পর্যায়গুলো তুলে ধরেছেন জ্ঞান-তাত্ত্বিক চিন্তাধারার মাধ্যমে। আর এই পর্যায়গুলোর বাস্তব রূপের ব্যাখ্যা করেছেন সহজ-সরল ভাষায়। এভাবে তিনি তত্ত্ব ও বাস্তবতাকে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন। সোহরাওয়ার্দির শিক্ষণের এক গুরুত্বপূর্ণ বা বড় বৈশিষ্ট্যই হল এই বিশেষ দিকটি।
গবেষকদের মতে সোহরাওয়ার্দি এমন কোনো ব্যক্তি ছিলেন না যিনি কেবল শ্লোগানের মধ্যেই বক্তব্যকে সীমিত রেখেছেন। তার বক্তব্যের সঙ্গে রয়েছে অনুভূতি বা চেতনা ও অনুধাবন এবং তা-ই তুলে ধরে সোহরাওয়ার্দির কাজ। আর এইসব দিক থেকে 'সিমোর্গের দূত' শীর্ষক বইটি খোদাপ্রেমিকদের পথ-পরিক্রমা ও মহান আল্লাহকে খুঁজে পাওয়ার জন্য খুবই নিখুঁত বই।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ৩০
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।