ইরানি দার্শনিক ও আরেফ শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি
গত কয়েক পর্বে আমরা খ্রিস্টিয় দ্বাদশ শতকের ইরানি দার্শনিক ও আরেফ শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির কয়েকটি বিখ্যাত বইয়ের প্রতীকী ও রহস্যময় উপমা-সমৃদ্ধ গল্প নিয়ে আলোচনা করেছি।
তার ওই বইগুলর নাম হল 'জিব্রাইলের পাখা বা পালকের আওয়াজ', 'পিপড়া বা উই পোকার কথোপকথন', 'প্রেমের বাস্তবতা বিষয়ক রচনা'' এবং সাফিরই সিমোর্গ' বা 'সিমোর্গের দূত' ও 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' বা 'আকলে সোর্খ'। গত পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা সোহরাওয়ার্দির 'আকলে সোর্খ' বা 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' বইটি নিয়ে আলোচনা করব। তার এ বইটি প্রতীকী ও রহস্যময় উপমা-সমৃদ্ধ এবং অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য রচনা। সোহরাওয়ার্দির দর্শন ও ইসলামী আধ্যাত্মিক জ্ঞান তথা ইরফান বিষয়ক এ বইটিতে মহাকবি ফেরদৌসির শাহনামা ও প্রাচীন ইরানের নানা ভাব, বিষয় এবং প্রতীকের প্রভাব দেখা যায়। এতে রয়েছে পাখির মুখ দিয়ে রহস্যময় গল্পের বর্ণনা।
সোহরাওয়ার্দির 'আকলে সোর্খ' বা 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' বইটিকে প্রাচ্যের দর্শন ও ইরফানের সারাংশ বা নির্যাস বলা যায় যা তুলে ধরা হয়েছে প্রায় কাব্যিক স্টাইলে। আসলে সৌভাগ্য বা মুক্তির পথ তুলে ধরাই ছিল সোহরাওয়ার্দির এ বই রচনার উদ্দেশ্য। 'আকলে সোর্খ' বা 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' শীর্ষক এ বইয়ের রহস্যময় গল্পের দুই প্রধান চরিত্র হল বাজ পাখি ও লাল চুলের বৃদ্ধ ব্যক্তি। অতীত যুগের রাজা-বাদশাহরা শিকারের মাধ্যম হিসেবে বাজ পাখি পুষতেন। বলা হয় যে এ পাখির চোখ টুপি দিয়ে বেঁধে রাখা হত প্রশিক্ষণের জন্য। কেউ কেউ মনে করেন মানুষের চোখকে অন্য সব প্রাণীর চোখই ভয় পায় এবং বাজ পাখি যাতে মানুষকে ভয় না পায় সে জন্য প্রশিক্ষণের সময় তার চোখ বেঁধে রাখা হয়। কিন্তু সোহরাওয়ার্দির 'আকলে সোর্খ' বা 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' শীর্ষক বইয়ে বাজ পাখি হচ্ছে এমন মানুষের প্রতীক যে তার আসল দেশ থেকে দূরে রয়েছে এবং আটকা পড়েছে মাটির পৃথিবীতে। তার অবস্থা হচ্ছে বস্তু ও প্রবৃত্তির কারাগারে বন্দি দুর্দশাগ্রস্ত আত্মার মত।
সোহরাওয়ার্দির 'আকলে সোর্খ' বা 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' বইয়ের বাজ পাখি তার নিজের ও অতীত দিনের অস্পষ্ট নানা স্মৃতিচারণ করে। অস্পষ্ট স্মৃতিতে বাজের মনে পড়ে যে প্রথম দিকে তার পাখা ছিল এবং ছিল আকাশে ওড়ার স্বপ্ন। কিন্তু ধীরে ধীরে তার পাখাগুলো ও চোঁখ বেঁধে রাখার কারণে ওড়ার কথা তার আর মনেই থাকেনি। এই বাজ যে এক সময় পাখি ছিল সে কথাটাই তার আর মনে আসে না। পাখি থাকার সময় সে ছিল উচ্চতর এক জগতের বাসিন্দা। চোখ বেঁধে রাখার ফলে তার নীড় বা বাসাটির কথাও মনে আসে না। শেকলে বাঁধা অবস্থাতেই বাজ এই অচিন দেশের অন্ধকার মরুতে সফর করে। সফর তার চলতেই থাকে যতক্ষণ না তার সঙ্গে দেখা হয় লাল বর্ণের কেশধারী এক বৃদ্ধ ব্যক্তির সঙ্গে। এই বৃদ্ধ ব্যক্তি বাজ পাখিকে বিজ্ঞ দার্শনিকের মতই পথ দেখাতে থাকেন।
সোহরাওয়ার্দির 'আকলে সোর্খ' বা 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' শীর্ষক বইটির রহস্যময় গল্পের দ্বিতীয় চরিত্র হল লাল চুলের অধিকারী এই বৃদ্ধ। এই বৃদ্ধ হচ্ছে মানুষের আকল্ বা বিবেকের প্রতীক।
লাল চুল ও লাল মুখের অধিকারী এই বৃদ্ধকে যেমন পরিপূর্ণ বা চরম আলো বলা যায় না তেমনি তাকে পুরোপুরি অন্ধকারও বলা যায় না। তিনি হলেন এ দুই রংয়ের মিশ্রণ তথা লাল। অতীত যুগে বলা হত সাদা আর কালো বর্ণের মিশ্রণ হল লাল। সোহরাওয়ার্দির দর্শনে মানুষের মধ্যে যে বুদ্ধিবৃত্তি বা আক্ল্ আছে তা হল প্রকৃতিগতভাবে সাদা ও উজ্জ্বল। কিন্তু মানুষের দেহ হচ্ছে অন্ধকারের ঘর তথা আঁধারে পরিপূর্ণ। তাই সাদা ও স্বচ্ছ বুদ্ধিবৃত্তি তখনই উজ্জ্বল হয় যখন তা অন্ধকারের মধ্যে স্থান করে নেয় এবং তখন তা হয়ে পড়ে লাল। অন্য কথায় লাল আক্ল্ মানে মানুষেরই বুদ্ধিবৃত্তি। সোহরাওয়ার্দির এই গল্পে লাল মুখের ওই বৃদ্ধ সবজান্তার ভূমিকা রাখেন। এই বৃদ্ধ বহু বছর অন্ধকার কুয়ায় তথা মাটির পৃথিবীতে থাকায় তার সাদা মুখ লাল হয়ে গেছে। এই বৃদ্ধ বাজ পাখির সব প্রশ্নেরই জবাব দেন ও বলেন যে তার প্রশ্নগুলোর জবাব পেতে হলে তাকে দুঃসাহসিক নানা অভিযানে-ভরপুর সফর শুরু করতে হবে। কোন্ কোন্ পথে যেতে হবে তাও বাজ পাখিকে বলে দেন এই বৃদ্ধ।
সোহরাওয়ার্দির 'আকলে সোর্খ' বা 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' শীর্ষক বইটির রহস্যময় গল্পের বাজ পাখি বৃদ্ধকে প্রশ্ন করেন যে তিনি কোথা হতে এসেছেন। বৃদ্ধ বলেন, কুহেকাফ বা কাফ নামক পাহাড়ের ওই পাশ থেকে এবং তোমার নীড়ও ছিল সেখানে কিন্তু তুমি তা ভুলে গেছ। বাজ বলল, সেখানে আপনি কি করতেন? বৃদ্ধ বললেন, আমি ছিলাম সেখানে ভ্রমণকারী, পৃথিবী জুড়ে ঘুরে বেড়াতাম এবং বিস্ময়কর দিক বা বিষয়গুলো দেখতাম। বাজ বলল, বিশ্বের নানা বিস্ময়ের মধ্যে কি দেখেছেন? তিনি বললেন, বিশ্বে রয়েছে সাতটি বিস্ময়কর বস্তু: প্রথমটি হল কাফ নামক পাহাড় যা আমার দেশ, দ্বিতীয়টি রাতে জ্বলা দামী পাথর, তৃতীয়টি হচ্ছে তুবা গাছ, চতুর্থটি হচ্ছে ১২টি কারখানা, পঞ্চমটি হচ্ছে দাউদের বর্ম, ষষ্ঠটি হচ্ছে খরগোশের ব্লেড বা ক্ষুর এবং সপ্তমটি হচ্ছে জীবন-পস্রবন। বাজ এসব সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইল। কিন্তু তুবা, কাফ পাহাড়, রাতে জ্বলজ্বল দামী পাথর এবং ১১ ও ১২ সংখ্যার ঠিক কি অর্থ তা বুঝল না। বাজ শুধু এটা বুঝল যে তুবা বিশেষ ধরনের গাছ, কাফ পাহাড় হচ্ছে নভোমণ্ডলে পৃথবীগামী পথের একটি পাহাড় যা গড়া হয়েছে ১১টি পাহাড়ের সমন্বয়ে। মনে হয় এ গল্পের বৃদ্ধ সব ধাঁধা বিষয়ে প্রশ্নের জবাবও দিচ্ছেন ধাঁধার মাধ্যমে।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।