জানুয়ারি ০২, ২০২০ ১৫:০০ Asia/Dhaka

হিজরি অষ্টম শতকের তথা খ্রিস্টিয় চতুর্দশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি মনীষী ও কবি আরেফ মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ইরানের হামেদানে।

প্রখ্যাত এই ইরানি কবি ও সুফি সাধক তাঁর প্রায় পুরো জীবন কাশ্মির ও তাজিকিস্তান অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারে কাটিয়েছেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক নাজমুদ্দিন কোবরার প্রণীত কোবরুইয়া নামক সুফি ধারার অন্যতম পথিকৃৎ। পণ্ডিত ও গবেষকরা তাকে সুলতানুল আরেফিন বা সাধকদের সুলতান বলে অভিহিত করতেন। সাইয়্যেদ হামেদানিকে কাশ্মিরের জনগণ আলীয়ে সানি বা ‘দ্বিতীয় আলী’ বলেও উল্লেখ করে থাকেন। তাঁর ভক্ত ও সমর্থকরা তাঁকে সম্মান দেখিয়ে ‘শাহে হামেদান’ বা হামেদানের বাদশাহ শীর্ষক উপাধিও দিয়েছেন।  আবার কেউ কেউ তাকে 'বড় আমির' বা 'আমিরে কাবির'ও বলে থাকেন। তাজিকিস্তানের জনগণের কাছে সাইয়্যেদ হামেদানি ‘হযরত আমিরজান’ নামেও পরিচিত।

মীর সাইয়্যেদ আলী হামেদানির মৃত্যুর পর তার মুরিদ বা অনুসারীদেরকে হামেদানিয়্যেহ বলা হত। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন এই মহান সুফি সাধক ও তাঁর একদল মুরিদ হিজরি অষ্টম শতকে কাশ্মিরে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছিলেন বলেই তা সেখানে শিয়া মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল।

প্রখ্যাত ইরানি কবি ও সুফি সাধক মীর সাইয়্যেদ আলী হামেদানির লেখা বিপুল ফার্সি কবিতা ও গদ্য রচনা এখনও টিকে আছে ভারত উপমহাদেশে। তার এসব লেখা ভারত উপমহাদেশে ফার্সি ভাষা ও ইরানি সংস্কৃতি প্রচারেও ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়। কাশ্মির অঞ্চলে এখনও এই মহান সুফি সাধকের অনেক ভক্ত বা অনুরাগী রয়েছেন। এ অঞ্চলের যেসব খানকায় তিনি বসবাস করতেন সেসব খানকাও বর্তমান যুগে জিয়ারত-কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। 

মীর সাইয়্যেদ আলী হামেদানির মাজার রয়েছে তাজিকিস্তানে। প্রাচীন ইরানের অন্তর্ভুক্ত এই দেশটিতে তিনি একজন বিখ্যাত মনীষী ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত।

মীর সাইয়্যেদ আলী হামেদানি জন্ম নিয়েছিলেন পশ্চিম ইরানের হামেদান শহরে। ৭১৪ হিজরির ১২ রমজান ছিল তাঁর জন্মদিন।  দিনটি ছিল সোমবার। তাঁর বাবার নাম ছিল আমির শাহাবুদ্দিন হাসান বিন সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ হামেদানি। তিনি ছিলেন হামেদানের প্রশাসক। ধার্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর বেশ সুনাম ছিল। তিনি ছিলেন হুসাইনি সাইয়্যেদ বা হযরত ইমাম হুসাইন (আ)’র বংশধর।

মীর সাইয়্যেদ আলী হামেদানি প্রাথমিক পড়াশুনা শুরু করেছিলেন তার মামা সাইয়্যেদ আলাউদ্দিনের কাছে। তিনিও ছিলেন একজন উচ্চ স্তরের ওলি এবং সুফি সাধক। হামেদানির বয়স যখন ১২ বছর তখন তাঁর মামা তাঁকে শাইখ আবুল বারাকাত তাকিউদ্দিন আলী দুস্তির কাছে সমর্পণ করেন।  হাদিস ও আধ্যাত্মিক ইসলামী জ্ঞান বা মারেফাতের বড় বড় শিক্ষকদের কাছ থেকে ইরফান ও হিকমাত বা ইসলামী দর্শন শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন জনাব হামেদানি। তাঁর আধ্যাত্মিক উন্নয়ন ও আত্মিক পরিশুদ্ধিতে প্রভাব রেখেছিলেন ওই মহান শিক্ষকরা।   

মীর সাইয়্যেদ আলী হামেদানি আলাউদ্দৌলা সেমনানির মত আধ্যাত্মিক বিষয়ের প্রখ্যাত শিক্ষকদের কাছে আধ্যাত্মিক উন্নয়নের নানা পর্যায়ের প্রশিক্ষণ লাভের পর একই বিষয়ের ত্রিশ জনেরও বেশি প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞের ফতোয়ার আলোকে ইরানের বাইরে ইসলাম ধর্ম প্রচার ও খোদাপ্রেমিকদের দিক-নির্দেশনা দেয়ার মিশন শুরু করেন।   আর এ জন্য তাঁকে নানা দেশে সফর করতে হয়েছিল। কিন্তু সফরের কষ্ট ও বিপত্তিগুলোকে তিনি ব্যাপক উৎসাহ আর উদ্দীপনা নিয়ে সহ্য করেন। ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য সাইয়্যেদ হামেদানি প্রাচীন যুগের বৃহত্তর সিরিয়া, রুম, কাশ্মির, তুর্কিস্তান, শ্রীলংকা ও ভারতসহ বিশ্বের নানা অঞ্চল সফর করেছিলেন।

সফরে বের হওয়ার পর প্রখ্যাত ইরানি কবি ও সুফি সাধক মীর সাইয়্যেদ আলী হামেদানি বেশ কয়েকবার পবিত্র কাবা ঘরও জিয়ারত করেন। তিনি ২১ বছর ধরে বহু দেশ ভ্রমণ করা সত্ত্বেও কোথাও স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেননি। তাঁর এই দীর্ঘ সফরে তিনি ১৪০০ আরেফ ও আধ্যাত্মিক-গুরু তথা আত্মিক উন্নয়ন বিষয়ের শিক্ষক বা বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে নানা ধরনের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। অবশেষ তিনি হিজরি ৭৫৩ সানে নিজ মাতৃভূমি ইরানের হামেদানে ফিরে আসেন এবং বিয়ে করেন। কিন্তু সাইয়্যেদ হামেদানি ৭৭৩ হিজরিতে আবারও দেশ ছাড়েন এবং নানা দেশ সফর করতে থাকেন। তিনি ইরান, মধ্য-এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক বিজ্ঞ শিষ্য বা মুরিদ গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাদের অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।  হামেদানির সবচেয়ে বিখ্যাত ও বিজ্ঞ ছাত্র ছিলেন নুরুদ্দিন জাফর বাদাখ্‌শি। মধ্য এশিয়ায় হামেদানির সঙ্গে পরিচিত হন নুরুদ্দিন জাফর এবং তাঁর কাছ থেকে আধ্যাত্মিক নানা বিষয় শেখেন। নুরুদ্দিন তাঁর শিক্ষক সাইয়্যেদ হামেদানির আচার-আচরণ ও বৈশিষ্ট্রের কথাগুলো তুলে ধরেছিলেন খুলাসাতুল মানাকিব শীর্ষক বইয়ে।

খাজা ইসহাক ছিলেন সাইয়্যেদ হামেদানির অন্যতম ছাত্র। পরে তিনি হামেদানির জামাই হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। তিনি তার শশুর ও শিক্ষকের  শিক্ষা ও ইসলাম-প্রচারমূলক অনেক সফরের সময় সহায়তাকারী হিসেবে পাশে ছিলেন। খাজা ইসহাক নিজেও ৫০ বছর ধরে ইসলাম প্রচার ও আধ্যাত্মিক বিষয়ের প্রশিক্ষক হিসেবে ইসলাম-প্রেমিক বহু ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। একজন উচ্চস্তরের আধ্যাত্মিক সাধক ও ইসলাম ধর্ম প্রচারক হিসেবে সাইয়্যেদ হামেদানিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন মীর সাইয়্যেদ হুসাইন সেমনানি। তিনি নিজেও ধর্ম প্রচারের জন্য কয়েক বার কাশ্মির সফর করেছিলেন। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ০২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।