ইয়াসুজ শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য
বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য,পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান। গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম খুজিস্তানের ঐতিহাসিক শহর শুশের দিকে।
সেখানকার একজন নবীর মাজারেও গিয়েছিলাম আমরা। এই নবী ছিলেন হজরত দানিয়েল (আ)। বনী ইসরাইলের একজন নবী ছিলেন তিনি। সাদা রঙের কৌণিক একটি গম্বুজ দেখেছি মাজার স্থাপনাটির উপর। ভেতরে সবুজ বাতি আর আয়নার কারুকাজে অন্যরকম আলোময় যে পরিবেশ আমরা দেখেছি তা ছিল এককথায় অনন্য এবং পবিত্র। বলা হয়ে থাকে যে হজরত দাউদ (আ) এর বংশের নবী ছিলেন তিনি। কীভাবে এসেছিলেন তিনি?
হ্যাঁ, সেকথাও বলেছি। ব্যাবিলনের বাদশাহ তাঁকে গ্রেফতার করে এই শহরে নিয়ে এসেছিল। পরবর্তীকালে দানিয়েল (আ) বাদশাহর একটা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে তাঁর নবুয়্যতের সত্যতা প্রমাণ করেছিল। তিনি এই শহরেই মৃত্যুবরণ করেন। মুসলমানদের বাইরেও ইহুদি এবং খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকজন হজরত দানিয়েল (আ) এর কবর জিয়ারত করার উদ্দেশ্যে এই শহরে ভিড় জমায়। ইরানের আরেকটি নামকরা প্রদেশের নাম কোহগিলুয়ে ও বুয়ের আহমাদ।এই শহরে রয়েছে বিখ্যাত লোর জনগোষ্ঠির বসবাস। ইরানের একটি প্রাচীন গোত্র হলো এই লোররা। যাই হোক কোহগিলুয়ে ও বুয়ের আহমাদ প্রদেশের দর্শনীয় কিছু নিদর্শন নিয়ে আমরা আজকের আসরে কথা বলার চেষ্টা করবো।
কোহগিলুয়ে ও বুয়ের আহমাদ প্রদেশের কেন্দ্রিয় শহর ইয়াসুজে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। সাদর সম্ভাষণমূলক এই সৌজন্য বাক্যটি লেখা রয়েছে বিশাল সাইনবোর্ডে। যে-কোনো দিক থেকে ইয়াসুজ শহরে প্রবেশের মুখে এই সুন্দর সাইনবোর্ড ভ্রমণকারীর নজরে পড়বে। স্বপ্নিল শহর ইয়াসুজ সফরের সূচনা এখান থেকেই। এই শহরটির বিশেষত্ব হলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বিদেশি ভ্রমণকারীদের আকৃষ্ট করার মতো বহু প্রাকৃতিক নিদর্শন এই শহরে বিদ্যমান। ইয়াসুজ শহরটি ইরানের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ কোহগিলুয়ে ও বুয়ের আহমাদের কেন্দ্রিয় শহর সেকথা একটু আগেই বলেছি আপনাদের। এখানকার লোকজন প্রাচীন লোর সম্প্রদায়ের। ইরানের প্রাচীন জনগোষ্ঠির একটি হলো লোর। প্রাচীনকাল থেকেই তারা এই ইয়াসুজ শহরে বসবাস করে আসছে।

এই শহর প্রতিষ্ঠার আগে এখানে 'তেল খসরু' নামে একটি প্রাচীন শহর ছিল। বুয়ের আহমাদের খানদের প্রবেশের আগে শহরটি অন্তত দুই হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য লালন করছিল। কিন্তু বর্তমানে কয়েকটি টিলা আর একটি গ্রাম ছাড়া প্রাচীন সেই শহরের আর কোনো নিদর্শন চোখে পড়ে না। ইয়াসুজ শহরটি একটি নদীর তীরে অবস্থিত। নদীটির নাম বাশার। এই নদীটি কয়েকটি প্রদেশ অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত পারস্য উপসাগরের বুকে গিয়ে মিশেছে। ইয়াসুজ শহরটি ঠাণ্ডপ্রবণ এলাকায় পড়েছে। সুতরাং এখানকার আবহাওয়া যে নাতিশীতোষ্ণ সেটা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। এখানে বৃষ্টির পাশাপাশি প্রচুর বরফ পড়ে। সেইসব বরফ পাহাড়ের উচ্চতায় জমে থেকে এলাকার সারা বছরের পানি চাহিদা মেটায়।
ইয়াসুজের আরেকটি নাম পাওয়া যায়। তাহলো ইয়াসিজ। এর অর্থ হলো ফুল রোপনের উপযোগী ভূমি। এর বাইরেও এখানে রয়েছে বহু ঝরনা, ছোট বড় অনেক নদী, শাখা নদী এবং চমৎকার কিছু প্রণালী। এসবের মধ্যে ঝরনাগুলো খুবই আকর্ষণীয় ভ্রমণকারীদের জন্য। মূল শহরের উত্তরদিকে ফরেস্ট পার্ক ঝরনা আছে। জাগরোস পর্বতমালা থেকে বয়ে আসা ঝরনার পানিই প্রায় দশ মিটার উচ্চতা থেকে পতিত হয়ে নয়নাভিরাম দৃশ্যের অবতারণা করেছে। সেই ঝরনার পানি সাপের মতো এঁকেবেঁকে ফলের বাগান, সবুজ প্রান্তর এবং বিচিত্র রঙের ফুলের বাগানকে সতেজতা দিয়েছে। দূর থেকে এগুলো দেখলে যে-কোনো রসিক মনের ভ্রমণকারীর মনই মুহূর্তে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
ইয়াসুজ শহর বেড়াতে গেলে ভ্রমণকারীরা এই দৃশ্য উপভোগ করতে ভোলেন না। কেননা এরকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সান্নিধ্যে গেলে মনটা অজান্তেই হারিয়ে যেতে বাধ্য নান্দনিক ভুবনে। আর কর্তৃপক্ষও ভ্রমণকারীদের সুবিধার্থে এর পাশেই গড়ে তুলেছে চমৎকার অবকাশ যাপন কেন্দ্র। বিচিত্র ফল ফুল আর উদ্ভিদের মাঝে গড়ে ওঠা ওই অবকাশ যাপন কেন্দ্র পুরো পরিবেশটাকেই বহুগুন হৃদয়গ্রাহ্য ও উপভোগ্য করে তুলেছে। বিভিন্ন রকমের খেলাধুলার মাঠ রয়েছে এর ভেতর। অবসরে বসে গল্প করা আর চা পানের সুবিধার্থে তৈরি করা হয়েছে ছোট ছোট নিকুঞ্জ। বসে বসেও উপভোগ করতে পারা যায় সেদিকটি লক্ষ্য রেখে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন শিল্পের প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়েছে।
ইয়াসুজ মহাসড়ক ধরে ছাব্বিশ কিলোমিটার দূরে 'দাশ্তরোম' নামে সবুজ একটি গ্রাম পড়বে। ওই গ্রাম পেরিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে পড়ে চমৎকার একটি জায়গা। সেখানেও ঝরনা আছে। তবে এই এলাকাটি উষ্ণতাপ্রবণ। হালকা গরমে ওই ঝরনাবাহিত শীতলতা যে-কোনো পর্যটককেই দেবে দুদণ্ড প্রশান্তির অবসর। এখানেই রয়েছে একটি প্রণালী। প্রণালীটির নাম তমোরাদি। বলা হয়ে থাকে তমোরাদি প্রণালীর ঝরনাগুলো ইরানের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ঝরনা। চার চারটি ঝরনা এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত। ঝরনাগুলো আট মিটার থেকে পণর মিটার পর্যন্ত উচ্চতা থেকে পতিত হয়। অবশ্য এখানে পঞ্চাশ মিটার উঁচু ঝরনাও রয়েছে। তবে পর্যটকদের পক্ষে অতো উচ্চতায় গিয়ে ঝরনা উপভোগ করাটা খুব একটা সহজসাধ্য নয়। তাই দূর থেকে দেখেই ভরে নিতে হয় মন।
ঝরনাগুলোর বাইরে এই এলাকার অন্যান্য দর্শনীয় ও উপভোগ্য প্রাকৃতিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে জলগুহা। এসব জলগুহার ভেতরে বাস করে আবাবিলের মতো এক ধরনের পাখি। ইংরেজিতে সোয়ালো বলে এগুলোকে। গুহার ভেতরেই এরা বাসা বানায়। সুতরাং ওদের আনাগোণায় সবসময় কলকোলাহলে মুখরিত থাকে গুহাদ্বার। এই গুহার পাশেই আবার ছোট ছোট পানির চৌবাচ্চা রয়েছে অনেক। সুতরাং প্রাকৃতিক এই দৃশ্যটি কেমন হতে পারে তা ভাবতেই আপনার মনে জেগে উঠবে শিল্পীর আঁকা ছবির এক নান্দনিক সৌন্দর্য। #
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।