এপ্রিল ০৪, ২০২০ ১৩:৪০ Asia/Dhaka

বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য,পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান।

গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম ইরানের আরেকটি নামকরা প্রদেশ কোহগিলুয়ে ও বুয়ের আহমাদের দিকে। প্রদেশের প্রধান শহর ইয়াসুজ শহর দেখার মধ্য দিয়ে শুরু করেছি সফর। বলেছি যে, এই শহরে রয়েছে বিখ্যাত লোর জনগোষ্ঠির বসবাস।ইরানের একটি প্রাচীন গোত্র হলো এই লোররা। কোহগিলুয়ে ও বুয়ের আহমাদ প্রদেশের দর্শনীয় কিছু নিদর্শনের কথাও বলেছি এবং সামান্য কিছু দেখেছিও।  

ইয়াসুজে রয়েছে সুন্দর সুন্দর বেশ কটি ফরেস্ট পার্ক এবং উপকূলবর্তী পার্ক বা কোস্টাল পার্ক। এগুলো সেই ইয়াসুজ ফরেস্ট পার্ক এবং বাশার নদী উপকুলীয় পার্কের মতোই। ইয়াসুজ ফরেস্ট পার্ক অথবা ইয়াসুজ পার্বত্য বৃহৎ পার্ক মূল শহর থেকে উত্তর পূর্ব দিকে প্রায় এক হাজার হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। গত আসরে দেখেছি আমরা। আরও দেখেছি নদী আর বহমান ফোয়ারাময় আলামুন পার্বত্য উপত্যকা। মাজদাক দার্তা নামের একটি গ্রামের কথাও উল্লেখ না করলেই নয়।  ধান চাষ এবং স্যামন মাছের জন্য বিখ্যাত ওই গ্রামটিও দেখেছি আমরা। ইয়াসুজের মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শন ও পুরাতাত্বিক নিদর্শন দেখতে পাওয়া যাবে এখানকার মিউজিয়ামে। ইয়াসুজ শহরে তাই কেবল পর্যটক আর প্রকৃতি প্রেমিকেরাই ভ্রমণ করেন না,বেড়াতে যান পুরাতত্ত্ব গবেষকরাও। আজ আমরা যাবো কোহগিলুয়ে ও বুয়ের আহমাদের সি-সাখত শহরের দিকে।

কোহগিলুয়ে ও বুয়ের আহমাদ প্রদেশে ঘুরতে ঘুরতে আমরা যখন দেনা' পার্বত্য উপত্যকার উচ্চতায় উঠবো তখন দেখা মিলবে প্রকৃতিপ্রেমি ভ্রামনিকদের বেহেশত খ্যাত সি-সাখত শহরের। জাগরোস পর্বতমালার অংশ এই দেনা উপত্যকা। সুতরাং খানিকটা উচ্চতায় যে এর অবস্থান হবে-তাতে অবাক হবার কিছু নেই। সি-সাখত নামটা বেশ অদ্ভুত মনে হচ্ছে না? হুমম এই নামের পেছনে একটা ইতিহাস, একটা গল্প আছে। প্রাচীন ইতিহাসের পাতায় এসেছে যে সি-সাখত শহরটি অসম্ভব ঠাণ্ডা একটি এলাকা ছিল। বরফের তীব্রতা এবং প্রাচুর্যে এখানকার রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। জনমানুষ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে গিয়েছিল। তখন ত্রিশজন ব্যায়ামবীর মানে বডি বিল্ডার এই সমস্যা দূর করার জন্য এগিয়ে যায়। কিন্তু ঠাণ্ডা এতো বেশি ছিল যে প্রচণ্ড বায়ু আর তীব্র তুষারপাতে ওই ত্রিশজন ব্যায়ামবীরই প্রাণ হারায়। ফার্সি ভাষায় সি মানে ত্রিশ আর সাখত মানে হলো কঠিন বা তীব্র। কঠিন তুষারপাতে ত্রিশজন মারা যাওয়ায় ওই এলাকার নাম পরবর্তীকালে সি-সাখত নামেই পরিচিতি পায়।

সি-সাখত শহরটি দেনা অঞ্চলের প্রধান শহর। ইয়াসুজ শহর থেকে পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এই শহরটি অবস্থিত। এই এলাকাটি চমৎকার পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থানের কারণে এখানকার আবহাওয়া কিছুটা ঠাণ্ডা। শরত ঋতুর মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে শীতের শেষ পর্যন্ত এমনকি বলা যায় তারও পরে এই অঞ্চলটি বরফে ঢাকা থাকে। এ কারণে এলাকায় পানির সমস্যা হয় না কখনোই। পাহাড় থেকে বরফগলা পানিতে তৈরি হওয়া নালায় সারা বছর ধরেই প্রবাহিত হয় পানি। এর ফলে পুরো এলাকার চাষবাষের প্রয়োজনীয় পানির সংকুলান হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে চমৎকার নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার পাশাপাশি এখানকার পানিও খুবই পরিষ্কার থাকে সবসময়।

ইরান ভ্রমণ অনুষ্ঠানে আপনাদের আবারও স্বাগত জানাচ্ছি। সি-সাখত নিয়ে কথা বলছিলাম। চমৎকার এই পর্যটক আকর্ষণীয় এলাকাটি ছাড়াও এখানকার কুহ গোল হ্রদ, চেশমে মিশি ঝরনা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি দাশতাকের কথা উল্লেখ করার মতো। চেশমে মিশি ঝরনাটি এই এলাকার সবচেয়ে বড় এবং জলটৈটুম্বুর ঝরনা। এই ঝরনাটি বোশু ঝরনা নামেও পরিচিত। শহরের খাবার পানির চাহিদা মেটাতে এই ঝরনার পানি ব্যবহার করা হয়। কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্যও এই ঝরনার পানি ব্যবহার করা হয়।পর্বত ঘিরে যে বৃত্তায়িত পথ রয়েছে এরকম একটি সুন্দর পথ -যাকে ফার্সিতে গার্দানে বলে-রয়েছে এখানে। এর নাম হলো বিজান।

বলা হয়ে থাকে এই বিজান গার্দানে ইরানের মধ্যে বিখ্যাত। এর কারণ হলো গাড়ি চলাচলে এখানে তেমন কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। সুন্দরভাবে গাড়ি চলাচল করতে পারে। বাসন্তি আবহাওয়ায় যদি মুক্ত শ্বাস নিতে চায় কেউ এবং সেইসঙ্গে বরফাচ্ছাদিত চমৎকার দৃশ্য দেখতে চায় তাহলে বসন্তের মাঝামাঝিতে এই বিজান গার্দানে ঘুরে আসে। এই বিজান গার্দানে নতমুখি টিউলিপ ফুলের সমারোহে পরিপূর্ণ থাকে এ সময়। তিন হাজার দুই শ মিটার উপরে অবস্থিত হবার কারণে কোনোরকম বায়ুদূষণ নেই। সুতরাং এ রকম পরিচ্ছন্ন একটি পরিবেশে বেড়াতে কার না ভালো লাগবে বলুন।

চেশমে মিশি ঝরনা ছাড়াও আরও ঝরনা আছে এই সি-সাখত এলাকায়। তুফ নামে একটি ঝরনা আছে এখানে। সি-সাখতের পাশেই। দেনা পর্বতশৃঙ্গে ওঠার পথে পড়বে এই তুফ ঝরনাটি। সারা বছর ধরেই ঠাণ্ডা পানি ঝরনাটি বয়ে চলে নিরন্তর। তগি নামে আরও একটি ঝরনা আছে এখানে। এই এলাকার জলপূর্ণ ঝরনা এটি। এ অঞ্চলের আপেল, আঙুর কিংবা আখরোট বাগানের পানির চাহিদা মেটায় এই তগি ঝরনার পানি। বিচিত্র ফলের বাগানের পর বাগান গড়ে উঠেছে এখানে এই ঝরনার পানি সুলভ হবার কারণে। ফল উৎপন্ন হওয়ার পাশাপাশি এইসব বাগান চমৎকার শ্যামল-সবুজ প্রকৃতির নয়নাভিরাম দৃশ্যেরও অবতারণা করেছে। দাশতাক নামের একটি ফরেস্ট এলাকাও রয়েছে এখানে। সি-সাখত শহর থেকে পশ্চিম দিকে দেনা উপত্যকায় এটি অবস্থিত।

আরও রয়েছে কূহগোল হ্রদ। এ অঞ্চলের পর্যটক আকর্ষণীয় একটি স্পট হলো কূহগোল হ্রদ। এ এলাকার সৌন্দর্যে যে-কেউই বিমোহিত না হয়ে পারে না। সে কারণেই মোটামুটি সারা বছর ধরেই এখানে পর্যটকদের আনাগোণা লেগেই থাকে। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ০৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।