মে ১২, ২০২০ ১৪:০১ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আস-সাফফাতের ১৩৯ থেকে ১৪৮ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ১৩৯ থেকে ১৪১ আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَإِنَّ يُونُسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ (139) إِذْ أَبَقَ إِلَى الْفُلْكِ الْمَشْحُونِ (140) فَسَاهَمَ فَكَانَ مِنَ الْمُدْحَضِينَ (141)

“আর ইউনুসও ছিলেন পয়গম্বরগণের একজন।” (৩৭:১৩৯)

“যখন তিনি (নিজের সম্প্রদায় থেকে) পালিয়ে (যাত্রী ও মালামাল) বোঝাই জাহাজে গিয়ে পৌঁছান।” (৩৭:১৪০)

“অতঃপর (জাহাজের যাত্রীদের মধ্যে) লটারী করা হলে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন।” (৩৭:১৪১)

এই তিন আয়াতে আল্লাহর নবী হযরত ইউনুস (আ.)’র ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ হযরত নূহ, ইব্রাহিম, মুসা, হারুন, ইলিয়াস ও লুত আলাইহিমুস সালামের মতো নবীদেরকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন এবং এসব নবীর শত্রুদেরকে দুনিয়াতেই আজাব দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছেন। কিন্তু হযরত ইউনুস (আ.)’র ঘটনা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী। এখানে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহর আজাব নিকটবর্তী হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হযরত ইউনুসের জাতি তওবা করে ক্ষমা চায় এবং সে তওবা কবুল হয়ে গেলে আল্লাহ তায়ালা আজাব প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু এই ঘটনার আগেই নিজ জাতির উদ্ধত আচরণে বিরক্ত হয়ে তাদেরকে ত্যাগ করে চলে যাওয়ার কারণে হযরত ইউনুস (আ.) বিপদে পড়ে যান।

হাদিসে এসেছে, হযরত ইউনুস (আ.) বহুদিন ধরে তাঁর জাতিকে মূর্তিপূজা, শিরক ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। কিন্তু তাঁর আহ্বান বেশিরভাগ মানুষ প্রত্যাখ্যান করে এবং হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে। এ অবস্থায় আল্লাহ তায়ালা ওহীর মাধ্যমে তাঁর নবীকে জানিয়ে দেন, তাঁর জাতির প্রতি শিগগিরই আজাব আসছে। একথা শোনার পর হযরত ইউনুস নিজের একজন মুমিন সঙ্গী নিয়ে শহর ত্যাগ করে সাগরের দিকে চলে যান। সেখানে গিয়ে তারা যাত্রী ও মালামাল বোঝাই একটি জাহাজে ওঠেন। সাগরের মাঝখানে একটি বিশাল তিমি মুখ হা করে জাহাজের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় জাহাজের লোকজন বুঝতে পারে, তিমির মুখে যেকোনো একজন যাত্রীকে দিয়ে দিলেই সে এখান থেকে চলে যাবে; তা না হলে সব যাত্রীর জীবন হুমকির মুখে পড়বে। তারা লটারির মাধ্যমে একজনকে বাছাই করার সিদ্ধান্ত নেয়। লটারিতে হযরত ইউনুসের নাম ওঠে এবং তাকে তিমির মুখে ছেড়ে দেয়া হয়।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- নবী-রাসূলদেরকে ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠা দেখাতে হয়। সামান্য ধৈর্যচ্যুতি তাদেরকে আল্লাহ তায়ালার চরম ক্রোধের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে।

২- কোনো বিষয়ে সমান গুণসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে একজনকে বাছাই করার ক্ষেত্রে লটারি ইসলামসম্মত একটি পন্থা।

সূরা সাফফাতের ১৪২ থেকে ১৪৪ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَالْتَقَمَهُ الْحُوتُ وَهُوَ مُلِيمٌ (142) فَلَوْلَا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ (143) لَلَبِثَ فِي بَطْنِهِ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ (144)

“অতঃপর (তাঁকে নদীতে ফেলে দেয়া হলে) একটি মাছ তাঁকে গিলে ফেলে এমন অবস্থায় যখন তিনি অপরাধী গণ্য হয়েছিলেন।” (৩৭:১৪২)

“তখন যদি তিনি আল্লাহর তসবীহ পাঠ না করতেন,” (৩৭:১৪৩)

“তবে তাঁকে পুনরুত্থান দিবস (অর্থাৎ কেয়ামত দিবস) পর্যন্ত মাছের পেটেই থাকতে হতো।” (৩৭:১৪৪)

আয়াতের মর্মার্থ থেকে অনুমান করা যায়, ওই তিমি মাছটিকে আল্লাহ তায়ালাই পাঠিয়েছিলেন হযরত ইউনুসকে গিলে ফেলার জন্য। এ কারণে আল্লাহর ইচ্ছায়ই লটারিতে তাঁর নাম ওঠে। কিন্তু যে আল্লাহ এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেন তিনিই মাছের পেটে নিজের নবীকে জীবিত অবস্থায় রেখে দেন। হযরত ইউনুস যখন দেখেন মাছটি তাকে অক্ষত অবস্থায় গিলে ফেলেছে এবং তাঁর শরীরের কোনো ক্ষতি হয়নি তখন তিনি নিজের দোষ উপলব্ধি করতে ও ভুল বুঝতে পারেন।

তিনি নিজ জাতিকে দাওয়াত দেয়ার দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করার কারণে আল্লাহর কাছে তওবা-ইসতেগফার করতে থাকেন এবং কায়মনোবাক্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।  হযরত ইউনুস নিজের দোষ স্বীকার করে এভাবে কান্নকাটি করার কারণে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে ক্ষমা করে দেন। তিমি মাছটি সাগর তীরে এসে মুখ খুলে হযরত ইউনুসকে নিজের পেট থেকে বের করে দেয়। আল্লাহ বলছেন, নবী ইউনুস যদি আল্লাহর তসবীহ পাঠ না করতেন তাহলে তাকে কিয়ামত পর্যন্ত মাছের পেটেই থাকতে হতো।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- কখনো কখনো অবুঝ প্রাণী আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক কিছু দায়িত্ব পালন করে।

২- সমস্যা ও ঝামেলার মুখোমুখি হলে দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়া কোনো সমাধান নয়। বরং যত বড় কঠিন পরিস্থিতিই আসুক আমাদেরকে দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকতে হবে।

৩- তওবা-এসতেগফার, তসবীহ পাঠ এবং আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে ক্ষমা প্রার্থনা করলে সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। হযরত ইউনুসের এই ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এই শিক্ষা দিয়েছেন।

সূরা সাফফাতের ১৪৫ থেকে ১৪৮ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَنَبَذْنَاهُ بِالْعَرَاءِ وَهُوَ سَقِيمٌ (145) وَأَنْبَتْنَا عَلَيْهِ شَجَرَةً مِنْ يَقْطِينٍ (146) وَأَرْسَلْنَاهُ إِلَى مِئَةِ أَلْفٍ أَوْ يَزِيدُونَ (147) فَآَمَنُوا فَمَتَّعْنَاهُمْ إِلَى حِينٍ (148)

“অতঃপর আমি তাঁকে রুগ্ন অবস্থায় এক বিস্তীর্ণ-নির্জন প্রান্তরে নিক্ষেপ করলাম।” (৩৭:১৪৫)

“এবং আমি তাঁর উপর লতাবিশিষ্ট এক লাউ গাছ উদগত করলাম।” (৩৭:১৪৬)

“এবং তাঁকে এক লক্ষ বা ততোধিক লোকের কাছে প্রেরণ করলাম।” (৩৭:১৪৭)

“তারা বিশ্বাস স্থাপন করল অতঃপর আমি তাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত জীবন উপভোগ করতে দিলাম।” (৩৭:১৪৮)

আল্লাহর নির্দেশে তিমি মাছ হযরত ইউনুসকে সাগর তীরে ফেলে যাওয়ার পর আল্লাহর এ নবী দুর্বল অবস্থায় কাদার মধ্যে পড়ে থাকেন। এ সময় তার পাশে একটি লাউ গাছ জন্মায় এবং এর পাতা তাঁকে সূর্যের প্রখর আলো থেকে রক্ষা করে এবং মাছের পেটে তাঁর ঝলসে যাওয়া চামড়া আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। এভাবে হযরত ইউনুসের জীবন রক্ষা পায়। তিনি সুস্থ হয়ে আবার নিজ জাতির কাছে ফিরে যান। তিনি বিস্ময়ের চোখে দেখতে পান, তার সেই মুশরিক জাতি এক আল্লাহর ইবাদত করছে এবং আল্লাহর আজাব থেকে রক্ষা পেয়েছে।  আল্লাহ শুধু আজাবই উঠিয়ে নেননি বরং সেই জাতিকে স্বাভাবিক জীবন উপভোগেরও সুযোগ দিয়েছেন। হযরত ইউনুসের জাতির মানুষের সংখ্যা এক লাখের কিছু বেশি ছিল বলে আল্লাহ তায়ালা জানিয়েছেন।

এই চার আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১- হযরত ইউনুসের জাতি তওবা করে ঈমান আনার কারণে আল্লাহর দয়া লাভ করে। অন্যদিকে দোয়া ও তসবীহ পাঠ করার কারণে হযরত ইউনুসও আল্লাহর ক্রোধ থেকে রক্ষা পান।

২- গুনাহগার বান্দাদের তওবা করে ফিরে আসার ব্যাপারে আমরা যেন কখনোই হতাশ না হই এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করি। আমাদেরকে এই আশায় থাকতে হবে যে, হয়ত কোনোদিন তারা সম্বিত ফিরে পেয়ে তওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসবে।

৩- অতীত ভুলের স্বীকারোক্তি ও তওবার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সঠিক পথের দিশা পাওয়ার পথ খুলে যায়। হযরত ইউনুসের জাতি তওবা করার মাধ্যমে আল্লাহর হেদায়েত লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল।#