জুন ২৬, ২০২০ ১৫:৩২ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আস-সাফফাতের ১৭৪ থেকে ১৮২ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ১৭৪ থেকে ১৭৭ আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَتَوَلَّ عَنْهُمْ حَتَّى حِينٍ (174) وَأَبْصِرْهُمْ فَسَوْفَ يُبْصِرُونَ (175) أَفَبِعَذَابِنَا يَسْتَعْجِلُونَ (176) فَإِذَا نَزَلَ بِسَاحَتِهِمْ فَسَاءَ صَبَاحُ الْمُنْذَرِينَ (177)

“অতএব আপনি কিছুকালের জন্যে তাদেরকে (অর্থাৎ কাফেরদেরকে) উপেক্ষা করুন।” (৩৭:১৭৪)

“এবং তাদেরকে দেখতে থাকুন। শীঘ্রই তারা (তাদের কুফরি কার্যকলাপের) পরিণাম দেখে নেবে।”( (৩৭:১৭৫)

“তারা কি আমার আযাব দ্রুত কামনা করে?” (৩৭:১৭৬)

“অতঃপর যখন তাদের আঙ্গিনায় (আমার আযাব) নাযিল হবে, তখন যাদেরকে সতর্ক করা হয়েছিল, তাদের সকাল বেলাটি হবে খুবই মন্দ।” (৩৭:১৭৭)

গত আসরে আমরা সূরা সাফফাতের আগের যে আয়াতগুলো বর্ণনা করেছি সেখানে মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের এবং মক্কার কাফের ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে রাসূলের সত্যনিষ্ঠ সাহাবীদের বিজয়ের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর আজকের এই চার আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি কিছুদিন মুশরিক ও কাফেরদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত দেয়া থেকে বিরত থেকে তাদেরকে তাদের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিন। এতে হয়ত তারা আপনার আগের দেয়া উপদেশবাণী নিয়ে চিন্তাভাবনা করে সত্যের পথে ফিরে আসবে। অথবা, আল্লাহ তায়ালা নিজেই তাদের জন্য আজাব নাজিল করবেন।

এর পরের আয়াতে বলা হচ্ছে, কাফের ও মুশরিকরা শিগগিরই তাদের কৃতকর্মের ফলাফল দেখতে পাবে এবং ঈমানদার ব্যক্তিরাও কাফেরদের এই ব্যর্থতা ও অপমান-অপদস্থ হওয়ার বিষয়টি প্রত্যক্ষ করবে। অবশ্য কাফেরদের সামনে দুনিয়া ও পরকালের আজাব সম্পর্কে সতর্ক করা হলে তারা সবসময়ই যে কথাটি বলে তা হচ্ছে- তোমরা যে ঐশী আজাবের কথা বলছো তা কখন আসবে? তাদের এ প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ বলছেন, মনে হয় যেন কাফের-মুশরিকরা আজাবের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এবং তাদের তর সইছে না। অথচ যখন আজাব আসার সময় হবে তখন তারা সত্য উপলব্ধি করবে কিন্তু তখন আর সত্য গ্রহণের সুযোগ দেয়া হবে না।

এই চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- প্রতিবাদ জানানোর ভাষা হিসেবে ইসলামের শত্রুদের কিছুদিনের জন্য উপেক্ষা করা নবী-রাসূলদের একটি উত্তম পন্থা। কট্টরপন্থি ও একগুঁয়ে প্রকৃতির মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে নবী-রাসূলরা কখনো কখনো তাদেরকে তাদের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিতেন। এটি একটি কার্যকর পন্থা এবং এর ফলে অনেক সময় এসব মানুষ সত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়।

২- খোদাদ্রোহীদের সঙ্গে এই সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়টি হতে হবে সাময়িক। স্থায়ীভাবে বা প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্যে এটি করা যাবে না। স্থায়ীভাবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে পথভ্রষ্ট এসব কট্টর মানুষের সত্য গ্রহণের সম্ভাবনা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।

৩- খোদাদ্রোহী ও জালেম লোকেরা এই পার্থিব জীবনেই তাদের কৃতকর্মের কিছু শাস্তি ভোগ করে যাতে তা দেখে অন্যরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। একইসঙ্গে মুমিনরা এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে নিজেদের ঈমান শক্তিশালী করার সুযোগ পান।

পাঠক! আমরা সূরা সাফফাতের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। এবারে এই সূরার শেষ পাঁচ আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

 وَتَوَلَّ عَنْهُمْ حَتَّى حِينٍ (178) وَأَبْصِرْ فَسَوْفَ يُبْصِرُونَ (179) سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ (180) وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ (181) وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (182)

“এবং আপনি কিছুকালের জন্যে তাদেরকে (অর্থাৎ কাফেরদেরকে) উপেক্ষা করুন।” (৩৭:১৭৮)

“এবং তাদেরকে দেখতে থাকুন। শীঘ্রই তারা (তাদের কুফরি কার্যকলাপের) পরিণাম দেখে নেবে।” (৩৭:১৭৯)

"পুত-পবিত্র আপনার পরওয়ারদেগারের সত্ত্বা, তিনি তা থেকে সম্মানিত ও পবিত্র (যা তারা) বর্ণনা করে থাকে।" (৩৭:১৮০)

“এবং পয়গম্বরগণের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক।” (৩৭:১৮১)

“এবং সমস্ত হামদ ও প্রশংসা তাঁর জন্য নির্ধারিত যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।” (৩৭:১৮২)

আগের বক্তব্যের ওপর গুরুত্ব আরোপের জন্য এই পাঁচ আয়াতের প্রথম দুই আয়াতে ১৭৪ ও ১৭৫ নম্বর আয়াতের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর ঈমানদার সাহাবীদের উদ্দেশ করে বলছেন: যারা গোঁড়ামির কারণে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং দ্বীনের কথা শুনতে ও গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয় তাদের সঙ্গে কিছুদিনের জন্য যোগাযোগ বন্ধ রাখুন। সেইসঙ্গে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ওপর কি শাস্তি নেমে আসে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করুন।

সূরার শেষ তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: ইজ্জত, সম্মান ও ক্ষমতা আপনার পরওয়ারদিগারের জন্য নির্ধারিত এবং চূড়ান্তভাবে ঈমানদার ব্যক্তিরা সম্মানিত হবে এবং কাফের ও মুশরিকদের কপালে জুটবে অপমান ও নিন্দা। যদি ঈমানদার ব্যক্তিরা আল্লাহ তায়ালার ওপর পরিপূর্ণভাবে নির্ভর করে এবং তাকেই একমাত্র ভরসা মনে করে তাহলে তারা যেন এ বিষয়ে নিশ্চিত থাকে যে, মহান আল্লাহ তাদেরকে কাফেরদের বিরুদ্ধে বিজয়ী করবেন। কারণ, আল্লাহ তায়ালা সব ধরনের দুর্বলতা ও অপারগতার ঊর্ধ্বে এবং তিনি সর্বশক্তিমান। ইতিহাস সাক্ষী, মহান আল্লাহ সব সময় তাঁর নবী-রাসূলদের পৃষ্ঠপোষকতা, শান্তি ও নিরাপত্তা দান করেছেন। কাজেই যে আল্লাহ নিজে সম্মান, মর্যাদা ও মহানুভবতার অধিকারী এবং গোটা বিশ্বজগতের প্রতিপালক, প্রশংসা ও হামদ তার জন্যই নির্ধারিত থাকা উচিত।

এই পাঁচ আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- খোদাদ্রোহী ও কাফেরদের শাস্তি দেয়ার ব্যাপারে মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত সত্য এবং এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকা উচিত নয়।

২- একমাত্র আল্লাহ তায়ালা চূড়ান্ত ও চিরস্থায়ী সম্মানের অধিকারী এবং যারা আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা হতে পারবে তারাও সম্মানিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে।

৩- সকল প্রশংসা একমাত্র বিশ্বজগতের প্রতিপালকের জন্য নির্ধারিত। কারণ, গোটা বিশ্বজগতে যা কিছু আছে তার সবকিছু পরিচালনা ও তাদের রিজিক একমাত্র তিনি দান করেন এবং তিনি সকল পরিপূর্ণতা ও সৌন্দর্যের আধার।

 (সূরা সাফফাত সমাপ্ত)