জুন ২৮, ২০২০ ১২:৩৪ Asia/Dhaka

বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য,পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান। গত আসরে আমরা ইরানের নামকরা প্রদেশ চহর মাহলে বাখতিয়রির কয়েকটি শহর ঘুরে ঘুরে দেখেছি।

চহর মাহলে বাখতিয়রি ইরানের একটি রূপকথার শহর। এখানে রয়েছে লোক সাহিত্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। লোকসাহিত্য মৌখিক ধারার সাহিত্য যা অতীত ঐতিহ্য ও বর্তমান অভিজ্ঞতাকে আশ্রয় করে রচিত হয়। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে একটি সংহত সমাজ মানস থেকে এর উদ্ভব। গত আসরে আমরা বলেছিলাম যে চহর মাহলে বাখতিয়রি প্রদেশটির একটি অংশে হাফত লাঙ নামক বাখতিয়রি উপজাতিদের একটি গোত্র বসবাস করত। ইরানে বহু উপজাতীয় গোত্র রয়েছে। বাখতিয়রি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গোত্র হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে।

এই গোত্রের লোকজন অতিথি আপ্যায়নের ব্যাপারে বেশ খ্যাতিমান। তাদের রয়েছে পোশাক আশাকের নিজস্ব সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। পাহাড়ের পাদদেশের আপাত সমান্তরালে তারা কালো রঙের তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করে। দর্শনার্থী কিংবা পর্যটকেরা কৌতূহলবশত এইসব তাঁবু দেখতে গেলে বাখতিয়রি নারী-পুরুষেরা যেভাবে অতিথি আপ্যায়ন করে সেটা খুবই উপভোগ্য একটা ব্যাপার। তারা নিজেদের তৈরি বিশেষ রকমের রুটি দিয়ে এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত দুগ্ধজাত পণ্য সামগ্রি দিয়ে যেভাবে আদর আপ্যায়ন করে সেটা যে কোনো পর্যটকের স্মৃতিপটে গেঁথে যায় আনমনেই। কুহরাং শহর প্রত্যেক ঋতুতেই আলাদা আলাদা প্রাকৃতিক  রূপ পরিগ্রহ করে। প্রতি বছর বসন্তে এখানকার অধোমুখি টিউলিপ ফুলের বাগান বা ক্ষেত দেখতে বহু মানুষ ভিড় জমায়। টিউলিপ ফুলের এই প্রান্তরটি চেলগার্দ শহর থেকে বারো কিলোমিটার দূরে বানুয়াস্তাকি গ্রামের কাছে অবস্থিত। গত আসরে দেওয়া কথা অনুযায়ী বিচিত্র রঙীন ফুলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আকর্ষণ মনে লালন করে শুরু করবো আজকের আসর।

বিচিত্র রঙীন ফুলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আকর্ষণ বলতে এখানে রয়েছে তিন হাজার চার শ হেক্টরের মতো ফুলের বাগান। ঠিক বাগান বলা যাবে না বরং প্রান্তর বলাই শ্রেয়। এই প্রান্তরে রয়েছে মূল্যবান এবং নয়নাভিরাম বিচিত্র ফুল কিংবা ফুলেল উদ্ভিদ। অধোমুখি টিউলিপের কথা বলেছিলাম আপনাদের-এই টিউলিপ দুই রঙের হয়। একেবারে টকটকে লাল রঙের টিউলিপ যেমন আছে তেমনি জ্বলজ্বলে হলুদ রঙের টিউলিপও আছে। উভয় রঙের অধোমুখি টিউলিপই রয়েছে এই কুহরাঙ শহরের ফুলের প্রান্তরে। এগুলোর দিকে একবার তাকালে চোখ লেগে যায়। এসবের বাইরেও পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো আরও বহু কিছু রয়েছে এখানে।

প্রান্তরের কাছেই একটি গ্রাম আছে দিমা নামে। ওই গ্রামের পাশে বিখ্যাত জয়ান্দে রুদ নদীর মৌলিক একটি শাখা আছে 'চেশমে দিমা' নামে। এই চেশমে দিমা দেখার মতো সুন্দর একটি শাখানদী।চেশমে দিমার পানির ওপর ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে যে ফলাফল পাওয়া গেছে তা হলো খনিজ উপাদান এবং লবণাক্ততার দিক থেকে এখানকার পানি খুবই  সমৃদ্ধ এবং এই পানি বিশ্বের অন্যতম উন্নত পানি। চেশমে দিমার পানিতে দাঁতের ক্ষয় এবং কিডনির পাথর চিকিত্সার মতো গুণাগুণ রয়েছে। এই শাখানদীটির উন্নত গুণসম্পন্ন পানিই ইরানের কুহরাং কোম্পানির মিনারেল ওয়াটার তৈরির কারখানার দিকে প্রবাহিত করা হয়েছে। কুহরাং কোম্পানির মিনারেল ওয়াটার দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বাইরেও রপ্তানি করা হয়।

দিমার পানির গুণগত বৈশিষ্ট্যের কথা বলছিলাম। এর পানির উন্নত গুণের কারণে দিমার প্রতি যেমন লোকজনের আকর্ষণ বেড়েছে তেমনি এর আশেপাশের নয়ন জুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য আর মনোরম পরিবেশ দিমাকে কুহরাং শহরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র বা অবকাশ যাপনের জন্য উপযুক্ত একটি স্পটে পরিণত করেছে।যারা স্কি খেলতে পছন্দ করেন তাদের জন্য একটি সুখবর হলো এখানে রয়েছে চমৎকার স্কি খেলার পিস। চেলগার্দ নামে পরিচিত এই স্কি খেলার পিস সমগ্র জাগরোস পর্বতমালার বিদ্যমান পিসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো।

আট শ মিটারের মতো লম্বা এই পিসটি শতকরা বিশ ভাগ ঢালু। কুহরাংয়ের প্রথম টানেলের কাছে চেলগার্দ শহরেই এই পিসটি অবস্থিত। পিসটি নারী-পুরুষ এবং পরিবার এই তিনটি পৃথক পৃথক অংশে বিভক্ত। পরিবেশগত সৌন্দর্য এবং প্রাকৃতিক দিক থেকে অনুকূল, রৌদ্রোজ্জ্বল ও প্রশান্তময় হবার কারণে এই পিসটির প্রতি স্কি খেলোয়াড় এবং শীতকালীন পর্যটকদের আকর্ষণটা একটু বেশি। পিসটা যেখানে অবস্থিত তার পাশেই রয়েছে টানেল। সুতরাং ইস্কি খেলার জন্য যারা আসেন কিংবা উপভোগ করতে যারা আসেন সবাই টানেলের সৌন্দর্যও এখান থেকে উপভোগ করার সুযোগ পান।

চেলগার্দ থেকে পঁচিশ কিলোমিটার দূরে শেখ আলি খান গ্রামের কাছে অদ্ভুত একটি প্রাকৃতিক নিদর্শন রয়েছে। এই নিদর্শনটি হলো একটি গুহা। একেবারেই অনন্য সাধারণ এই গুহাটির নাম 'ইয়াখি চামো' গুহা। গুহায় বরফের অসংখ্য ক্যান্ডেলে ভর্তি। বরফ জমে ছাদ থেকে ঝুলতে ঝুলতে মোমের মতো তবে একেবারে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার দেখায় ক্যান্ডেলগুলোকে।  এই গুহার বরফের নীচ থেকে জন্ম নিয়েছে ঠাণ্ডা পানির একটি ধারা। এই ধারার পানি শেষ পর্যন্ত গিয়ে জমে কুহরাং বাঁধে। এখানে বরফের প্রাচুর্যের কারণে এবং বছরের পর বছর ধরে গভীর বরফে উপত্যকা পূর্ণ হয়ে থাকার কারণে প্রায় সারা বছর জুড়েই অনেকটা স্থায়ীভাবে এখানে বরফ জমে থাকে।

চামো বরফ গুহায় ব্যাপক বরফের স্তুপ থাকায় এই এলাকার উপজাতীয় তরুণ যুবকদের বিনোদনের একটি চমৎকার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে চামো অঞ্চল। এছাড়াও গেল কয়েক বছর ধরে এখানে গ্রীষ্মকালীন স্কি-খেলা প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হচ্ছে। জেনে রাখা ভালো যে চামো বরফ গুহা ইরানের মিষ্টি পানির সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে পরিচিত। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ২৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।