রংধনু আসর
ঈদুল আজহা উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান
মুসলিম উম্মাহ'র বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। প্রতিবছর যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয় দিনটি। মহান আল্লাহর অপার অনুগ্রহ লাভের আশায় ঈদুল আজহার জামাত শেষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করে থাকেন। দিনটি উপলক্ষে রেডিও তেহরানের রংধনু আসরে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়েছে।
নাসির মাহমুদ: ঈদ মুবারক!
আকতার জাহান: ঈদ মুবারক!!
গাজী আবদুর রশিদ: ঈদ মুবারক!!!
নাসির মাহমুদ: রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমাদের সবাইকে পবিত্র ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি আমি নাসির মাহমুদ, আমি আকতার জাহান এবং আমি গাজী আবদুর রশিদ।
আকতার জাহান: ঈদের কথা শুনলেই আনন্দে ভরে ওঠে ছোট-বড় সবার মন। হৃদয়রাজ্যে বয়ে যায় খুশির জোয়ার। আন্দোলিত হয় প্রাণ। কারণ ঈদ মানেই খুশি; ঈদ মানেই আনন্দ।
গাজী আবদুর রশিদ: তবে ঈদুল আজহা বল্গাহীন কোনো আনন্দের দিন নয়। ঈদুল আজহার অপর নাম 'কুরবানির ঈদ'। মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ এবং তার জন্য একনিষ্ঠ আত্মত্যাগের সবচেয়ে বড় উৎসবের নাম 'ঈদুল আজহা'।
নাসির মাহমুদ: এই দিনটি খোদার প্রতি ভালোবাসাকে প্রমাণ করার দিন। এই ঈদ আমাদের শেখায় ভোগ নয়, ত্যাগেই রয়েছে আনন্দ। প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমা আর অফুরন্ত আনন্দের সওগাত নিয়ে হাজির হয় এই ঈদ।
আকতার জাহান: তো বন্ধুরা, পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে আমরা একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। গান, কবিতা, কুরবানির ইতিহাস ও শিক্ষা দিয়ে সাজানো অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে আর কথা না বাড়িয়ে আসর শুরু করা যাক।
গাজী আবদুর রশিদ: আসরের শুরুতেই তোমাদের জন্য রয়েছে একটি ঈদের গান। গানটি কথা ও সুর ইসহাক আলমগীর। আর গেয়েছে কলরব শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্য জাহিদুল ইসলাম শাওন, জাহিদ রাজভী ও রাকিব কাশফি।
নাসির মাহমুদ: শিশুশিল্পীদের কণ্ঠে চমৎকার একটি গান শুনলে। বন্ধুরা, ঈদুল আজহার দিনটি প্রতিটি মুসলমানদের জন্য বিশেষকরে হাজীদের জন্য বিশেষ আনন্দের দিন। কারণ, এ দিনে তারা পশু জবাইয়ের মাধ্যমে নিজের মনের সব পশুপ্রবৃত্তিকে কুরবানি করার অনুশীলন করেন।
আকতার জাহান: ঈদুল আজহার সাথে জড়িয়ে আছে এক কিশোরের আত্মত্যাগের মহান স্মৃতি। সেই মহান আত্মত্যাগী কিশোর কে- তোমরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে তা বুঝতে পেরেছো? হ্যাঁ, তিনি হলেন হযরত ইসমাইল (আ.)। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের এই দিনে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর কুরবানির সিদ্ধান্তে সাড়া দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করেছিলেন তিনি।
গাজী আবদুর রশিদ: হযরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নযোগে তিনবার আদেশ পান তাঁর প্রিয়বস্তুকে আল্লাহর রাস্তায় কুরবানি করার। অনেক চিন্তাভাবনার পর তাঁর প্রিয়পুত্র হযরত ইসমাইলকে কুরবানি করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পুত্র ইসমাইলকেও তাঁর স্বপ্নের কথা বলেন।
নাসির মাহমুদ: যেমন পিতা, তেমন পুত্র! নিজের কুরবানির কথা শুনেও ঘাবড়ালেন না তিনি। ইসমাইল বললেন, 'হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।'
আকতার জাহান: আল্লাহর প্রতি এরকম একনিষ্ঠতা শয়তানের সহ্য হলো না। এই পরীক্ষাকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য শয়তান উঠেপড়ে লাগল। একবার যায় পিতার কাছে আরেকবার ছেলের কাছে। মায়ের কাছে গিয়েও প্ররোচনা দেয়ার কাজে লিপ্ত হলো ইবলিশ। কিন্তু কোনো কাজই হলো না। সবার কাছ থেকে বিমুখ হলো অভিশপ্ত শয়তান।
গাজীর আবদুর রশিদ: শয়তান চলে যাওয়ার পর সংবেদনশীল মুহূর্তটি ঘনিয়ে এলো। দয়ালু পিতা তাঁর প্রিয়পুত্রকে জমিনে শুইয়ে দিলেন। ধারালো ছুরি চালালেন পুত্রের গলায়। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছেন হযরত ইব্রাহিম! এমন সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে ঐশী আওয়াজ এলো: "হে ইব্রাহিম! তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করেছ। আল্লাহ ইসমাইলকে কুরবানি করার আদেশ রহিত করেছেন।"
নাসির মাহমুদ: এরপর আল্লাহ একটি দুম্বা পাঠালেন ইসমাইলের পরিবর্তে কুরবানি করতে। হযরত ইব্রাহিম তা-ই করলেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর ছেলে ইসমাইল (আ.)-এর আত্মত্যাগকে স্মরণ করে প্রতিবছর হাজীগণ আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রমাণস্বরূপ পশু কুরবানি করেন। পিতা-পুত্রের ত্যাগের স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে সামর্থ্যবান মুসলমানরাও গৃহপালিত পশু কোরবানি করে থাকেন।
আকতার জাহান: তবে, ঈদুল আজহা এলেই একশ্রেণীর মানুষ কুরবানিকে 'পশু হত্যার উৎসব' হিসেবে অভিহিত করে থাকে। তারা কুরবানির বিরোধিতা করতে গিয়ে নানা কুতর্কে লিপ্ত হয়। একবার তরিকুল ইসলাম নামে এক ম্যাজিস্ট্রেট এক প্রবন্ধে লিখেন, ‘কুরবানিতে পশু হত্যা হয়, এমন ভয়াবহ রক্তপাতের কোনো মানে নাই।'
গাজী আবদুর রশিদ: প্রবন্ধটি পড়ে ভীষণ ক্ষুব্ধ হন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি এর জবাবে লিখেন তার বিখ্যাত কবিতা 'কোরবানি'।
নাসির মাহমুদ:
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্বোধন।
দুর্বল! ভীরু! চুপ রহো, ওহো খাম্খা ক্ষুব্ধ মন!
ধ্বনি ওঠে রণি দূর বাণীর,–
আজিকার এ খুন কোর্বানির!
দুম্বা-শির রুম্-বাসীর
শহীদের শির-সেরা আজি। –রহমান কি রুদ্র নন?
বাস! চুপ খামোশ রোদন!
আজ শোর ওঠে জোর 'খুন দে, জান দে, শির দে বৎস' শোন!
ওরে হত্যা নয় আজ 'সত্যাগ্রহ', শক্তির উদ্বোধন।
আকতার জাহান: কবি নজরুল তাঁর সংগ্রামী চেতনার ভেতরেই ঈদুল আযহা তথা কুরবানির ঈদের তাৎপর্য খুঁজে পেয়েছিলেন। সেটাই তিনি তার ‘বকরীদ’ কবিতায় বলতে চেয়েছেন।
নাসির মাহমুদ:
‘‘শহীদানদের ঈদ এলো বকরীদ
অন্তরে চির নৌ-জোয়ান যে তারি তরে এই ঈদ
আল্লার রাহে দিতে পারে যারা আপনারে কুরবান
নির্লোভ নিরহংকার যারা যাহারা নিরভিমান
দানব দৈত্যে কতল করিতে আসে তলোয়ার লয়ে
ফিরদাউস হতে এসেছে যাহারা ধরায় মানুষ হয়ে
অসুন্দর ও অত্যাচারীরে বিনাস করিতে যারা
জন্ম লয়েছে চির-নির্ভিক, যৌবন মাতোয়ারা
তাহাদেরি শুধু আছে অধিকার ঈদগাহে ময়দানে
তাহারাই শুধু বকরিদ করে জান-মাল কুরবানে।’
গাজী আবদুর রশিদ: যারা আল্লাহর রাস্তায় জান-মাল বিলিয়ে দেয়ার মন-মানসিকতা রাখেন কুরবানির ঈদ কেবল তাদের জন্য। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) নিজ পুত্রকে কুরবানির যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন আমাদেরকে সেভাবেই নিজেদের জানমাল বিলিয়ে দেয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। কবি নজরুল এদিকে ইঙ্গিত করেই লিখেছেন-
নাসির মাহমুদ:
ইব্রাহিমের মতো পুত্রেরে আল্লার রাহে দাও,
নইলে কখনও মুসলিম নও, মিছে শাফায়ৎ চাও!
নির্যাতিতের লাগি পুত্রেরে দাও না শহিদ হতে,
চাকরিতে দিয়া মিছে কথা কও– ‘যাও আল্লার পথে’!
বকরীদি চাঁদ করে ফরয়্যাদ, দাও দাও কোরবানি,
আল্লারে পাওয়া যায় না করিয়া তাঁহার না-ফরমানি!
আকতার জাহান: কবি নজরুল ইসলাম এ কবিতায় পশু কোরবানির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরলেও ‘শহীদি ঈদ’ কবিতায় তিনি মনের পশু কুরবানি দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ মহান আল্লাহ আমাদের কাছে দুটো আত্মত্যাগই দেখতে চান।
নাসির মাহমুদ:
মনের পশুরে কর জবাই,
পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই।
কশাই-এর আবার কোরবানী!-
আমাদের নয়, তাদের ঈদ,
বীর-সুত যারা হ’ল শহীদ,
অমর যাদের বীরবাণী।
গাজী আবদুর রশিদ: বন্ধুরা, পশু কুরবানির পাশাপাশি মনের পশু কুরবানির গুরুত্ব জানলে নজরুলের কবিতায়। এবারে এ সম্পর্কেই রয়েছে একটি গান। গানটির গীতিকার ওমর আল ফারুক, সুরকার তফাজ্জাল হোসাইন খান। আর গানটি গেয়েছে বাংলাদেশের একঝাঁক শিশুশিল্পী।
গাজী আবদুর রশিদ: এ গানটি থেকে আমরা কুরবানির মর্ম ও প্রকৃতি শিক্ষা সম্পর্কে জানতে পারলাম। বন্ধুরা, বড় হয়ে তোমরা আত্মত্যাগের এই মহান দিনটিকে আরো সুন্দর ও সার্থকভাবে পালন করবে কেমন?
আকতার জাহান: আর হ্যাঁ, ঈদ যেন কেবল খুশি আনন্দের উৎসবে পরিণত না হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিন হিসেবে পরিগণিত হয়- সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ত্যাগ ও কুরবানির সমন্বয়ে পাওয়া ঈদুল আজহা আমাদের সবার জীবনে বয়ে আনুক শান্তি, সমৃদ্ধি ও অনাবিল আনন্দ- এ কামনায় গুটিয়ে নিচ্ছি রংধনুর আজকের আসর। ঈদ মোবারক।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।