আগস্ট ১১, ২০২০ ১৬:৫৪ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সোয়াদের ১২ থেকে ১৯ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। প্রথমেই এই সূরার ১২ থেকে ১৪ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

كَذَّبَتْ قَبْلَهُمْ قَوْمُ نُوحٍ وَعَادٌ وَفِرْعَوْنُ ذُو الْأَوْتَادِ (12) وَثَمُودُ وَقَوْمُ لُوطٍ وَأَصْحَابُ الْأَيْكَةِ أُولَئِكَ الْأَحْزَابُ (13) إِنْ كُلٌّ إِلَّا كَذَّبَ الرُّسُلَ فَحَقَّ عِقَابِ (14)

“তাদের পূর্বেও নূহ ও আদের সম্প্রদায় এবং ক্ষমতার অধিকারী ফেরাউন পয়গম্বরগণের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিল।” (৩৮:১২)

“এবং (একইভাবে মিথ্যা আরোপ করেছিল) সামুদ ও লুতের সম্প্রদায় এবং আইকার (অর্থাৎ শুয়াইব (আ.)’র জাতির) লোকেরা। এরা ছিল (বিরুদ্ধবাদী) বহু বাহিনী।” (৩৮:১৩)

“এদের প্রত্যেকেই পয়গম্বরগণের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছে। ফলে (তাদের ওপর) আমার আজাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।” (৩৮:১৪)

গত আসরে আমরা বলেছি যে, মক্কার কাফের নেতারা আল্লাহর রাসূলের প্রতি ওহী নাজিল হওয়ার বিষয়টি মেনে নেয়নি। তারা বরং ঘোষণা করেছিল, ওহী যদি আসতেই হয় তাহলে কুরাইশ অধিপতিদের কাছে আসতে হবে। এরপর আজকের এই তিন আয়াতে বিশ্বনবী (সা.)কে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে, পৃথিবীর বুকে এরাই প্রথম কোনো জাতি নয় যারা আপনার দাওয়াত অস্বীকার করছে। এর আগের প্রত্যেক নবীর জাতি তাদের নিজ নিজ পয়গম্বরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। কারণ, প্রতিটি যুগের ক্ষমতা ও সম্পদের অধিকারীরা মনে করত আল্লাহর ওহী গ্রহণের যোগ্যতা শুধুমাত্র তাদেরই রয়েছে। কাজেই তাদের আত্মগৌরব একজন সাধারণ মানুষকে নবী হিসেবে মেনে নিতে তাদেরকে বাধা দিত।  

কিন্তু তারা এ কথা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল যে, পয়গম্বরকে দেখে, তাঁর কথা শুনে তাঁর নবুওয়্যাতের সত্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পরও কেবল বিদ্বেষ, আত্মম্ভরিতা ও অহংকারের কারণে সত্য মেনে নিতে অস্বীকার করলে এই পৃথিবীতেই শাস্তি পেতে হয়। যেমনটি হযরত নূহের জাতি মহা প্লাবনে ডুবে মরেছে এবং হযরত আদের জাতি প্রলংকর ঘুর্ণিঝড়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। এছাড়া, নীল নদে ফেরাউন ও তার বিশাল বাহিনীর শলিল সমাধি হয়েছে। আরো অনেক জাতি আল্লাহর নবীকে অস্বীকার করার কারণে এভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। সামুদ জাতি হযরত সালেহ (আ.)কে অস্বীকার করেছিল। হযরত লুতের জাতি সমকামিতার মতো জঘন্য পাপাচারে লিপ্ত হয়েছিল। হযরত শুয়াইব (আ.)’র জাতি সবুজ শ্যামল এক প্রান্তরে শান্তিতে জীবনযাপন করলেও তারা আল্লাহর নবীর দাওয়াতের বাণী মেনে নিতে অস্বীকার করে। পরিণতিতে উল্লেখিত প্রতিটি জাতি আল্লাহর আজাবের শিকার হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়।

এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- পবিত্র কুরআন অতীত জাতিগুলোর আচরণ ও তাদের পরিণতি বর্ণনা করে বর্তমান ও ভবিষ্যতের মানুষকে তা থেকে শিক্ষা নিতে বলেছে।

২- সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা ফেরাউনে মতো মহা প্রতাপশালী মানুষও আল্লাহর ক্রোধের সামনে অসহায়।

৩- সত্যের সামনে আত্মম্ভরিতার পরিণতি অপমান ও ধ্বংস ছাড়া আর কিছু নয়।

সূরা সোয়াদের ১৫ ও ১৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

وَمَا يَنْظُرُ هَؤُلَاءِ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً مَا لَهَا مِنْ فَوَاقٍ (15) وَقَالُوا رَبَّنَا عَجِّلْ لَنَا قِطَّنَا قَبْلَ يَوْمِ الْحِسَابِ (16)  

“এই কাফেররা কেবল একটি (ঐশী) মহানাদের অপেক্ষা করছে যাতে (কোনো অবকাশ) বা ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না।” (৩৮:১৫)

“এবং তারা (ঠাট্টার ছলে) বলে হে আমাদের পরওয়ারদিগার, হিসাব দিবস (আসার) আগেই আমাদের পাওনা মিটিয়ে দাও (অর্থাৎ তাড়াতাড়ি আজাব দাও)।” (৩৮:১৬)

এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে, কাফির ও মুশরিকরা এতটাই স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছিল যে, তারা যেন কোনো মহা প্রলয়ের প্রতীক্ষা করছিল। কারণ অতীত জাতিগুলোর পরিণতি জানার পরও তারা গোয়ার্তুমি ও হঠকারিতা পরিহার করেনি। অতীত জাতিগুলো তাদের নবীদের সঙ্গে যে আচরণ করেছে ইসলামের নবীর সঙ্গেও মক্কার কাফেররা একই ধরনের আচরণ করছিল। পরের আয়াতে বলা হচ্ছে, কাফেররা যেমন পার্থিব জীবনে আল্লাহর শাস্তি অস্বীকার করে তেমনি পরকালে আল্লাহর আদালতের কাঠগড়ার দাঁড়ানোর বিষয়টিও মেনে নিতে নারাজ। তাই তারা ইসলামের নবীকে উপহাস করে বলে, পারলে তোমার আল্লাহকে বলো সে যেন আমাদের কাজের পরিণতি হিসেবে এখনই আজাব পাঠিয়ে দেয়। পরকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১- অতীত জাতিগুলোর পরিণতি জানার পরও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতাকারীরা স্বেচ্ছায় নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে।

২- কাফের ও মুশরিকরা যুক্তি ও দলিল-প্রমাণ পেশ করতে না পেরে ঈমানদার ব্যক্তিদের সঙ্গে ঠাট্টা-মশকরায় লিপ্ত হয়।

৩- আল্লাহর আজাব আসার আগ পর্যন্ত তওবা করে ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আজাব বা মৃত্যু চলে আসার পর আর তওবা করার সুযোগ থাকবে না।

সূরা সোয়াদের ১৭ থেকে ১৯ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

اصْبِرْ عَلَى مَا يَقُولُونَ وَاذْكُرْ عَبْدَنَا دَاوُودَ ذَا الْأَيْدِ إِنَّهُ أَوَّابٌ (17) إِنَّا سَخَّرْنَا الْجِبَالَ مَعَهُ يُسَبِّحْنَ بِالْعَشِيِّ وَالْإِشْرَاقِ (18) وَالطَّيْرَ مَحْشُورَةً كُلٌّ لَهُ أَوَّابٌ (19)

“(হে রাসূল!) তারা যা বলে তাতে আপনি সবর করুন এবং আমার শক্তিশালী বান্দা দাউদকে স্মরণ করুন। সে ছিল আমার প্রতি প্রত্যাবর্তন বা তওবাকারী (বান্দা)।” (৩৮:১৭)

“আমি পর্বতমালাকে তার অনুগামী করে দিয়েছিলাম, তারা সকাল-সন্ধ্যায় তার সাথে (আমার) পবিত্রতা ঘোষণা করত;” (৩৮:১৮)

“আর পক্ষীকুলকেও সমবেত করেছি (তারা তার সাথে পবিত্রতা ঘোষণা করত)। তারা সবাই ছিল তাঁর প্রতি প্রত্যাবর্তনশীল (ও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ)।” (৩৮:১৯)

এই তিন আয়াতে বিশ্বনবী (সা.)কে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: এমনকি হযরত দাউদের মতো পরাক্রমশালী শাসককেও মানুষ উপহাস করতে ছাড়েনি। কাজেই রাসূল ও তাঁর অনুসারী ঈমানদারদেরকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়ে বলা হচ্ছে, ধৈর্য ধরলে অবশ্যই তারা বিজয়ী হবে।  এখানে আরো বলা হচ্ছে, হযরত দাউদ (আ.) সব সময় আল্লাহর দোয়া ও মুনাজাতে লিপ্ত থাকতেন। তাঁকে আল্লাহ এমন ক্ষমতা দান করেছিলেন যে, তিনি জিকির করার সময় নির্জীব পাহাড় এবং আকাশের পাখিরা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে সমস্বরে আল্লাহর জিকিরে শামিল হতো।

পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, বিশ্বজগতের প্রতিটি সৃষ্টি সারাক্ষণ আল্লাহর জিকিরে মগ্ন রয়েছে। কিন্তু মানুষের পক্ষে তা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এই আয়াত অনুযায়ী, হযরত দাউদ (আ.)’র সঙ্গে আল্লাহর অন্যান্য যেসব সৃষ্টি জিকির করত আল্লাহর এই নবী তা শুনতে ও বুঝতে পারতেন।

এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হলো:

১- আল্লাহর পথের অনুসারীদের বিরুদ্ধে খোদাদ্রোহী শক্তিগুলোর উপহাস ও প্রচারণা একটি চলমান বিষয়। এর বিপরীতে দুর্বলতা প্রকাশ করা ঈমানদারের কাজ নয়। ঈমানদার ব্যক্তিকে এসব উপহাস ও ঠাট্টার মোকাবিলায় ধৈর্য ধরে তাকওয়ার পথে অটল থাকতে হবে।

২- ক্ষমতার মোহ মানুষের জন্য লোভনীয় করা হয়েছে যা তার জন্য বিপজ্জনক। তবে যারা সারাক্ষণ তওবা করে এবং আল্লাহর সাহায্য চায় তারা এই বিপদ থেকে রক্ষা পাবে। #