আগস্ট ১৩, ২০২০ ১৫:২৬ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সোয়াদের ২০ থেকে ২৫ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ২০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَشَدَدْنَا مُلْكَهُ وَآَتَيْنَاهُ الْحِكْمَةَ وَفَصْلَ الْخِطَابِ (20)

“আমি তাঁর সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় করেছিলাম এবং তাঁকে দিয়েছিলাম (ন্যায়নীতিপূর্ণ) প্রজ্ঞা ও ফয়সালাকারী বাগ্নীতা।” (৩৮:২০)

গত আসরের শেষদিকে হযরত দাউদ (আ.) সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামের এই নবী আল্লাহ রব্বুল আলামিনের দরবারে অনেক বেশি মুনাজাত ও কান্নাকাটি করতেন। তিনি যখন আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন তখন পাহাড়-পর্বত ও পাখীরা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে সমস্বরে সে দোয়ায় শামিল হতো।

এরপর আজকের এই আয়াতে বলা হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা অন্য সব নবীর মতো হযরত দাউদ (আ.)কেও প্রজ্ঞা দান করেছিলেন। সেইসঙ্গে এই মহান নবীকে দান করেছিলেন বিশাল সাম্রাজ্য ও বিচার করার ক্ষমতা। অন্য কথায় আল্লাহ তায়ালা যেসব নবীকে নবুওয়াতের পাশাপাশি শাসনক্ষমতাও দান করেছিলেন তাদের অন্যতম হলেন হযরত দাউদ (আ.)।

এখান থেকে বোঝা যায়, ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে এবং নবী-রাসূলগণ শুধু আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি সেইসঙ্গে যেখানে যতটুকু সম্ভব তাঁরা সমাজে আল্লাহর হুকুম-আহকাম বাস্তবায়নও করেছেন। তাঁরা শুধু মসজিদে বসে থেকে মানুষকে উপদেশই দেননি সেইসঙ্গে প্রয়োজনে সমাজ ও রাষ্ট্র শাসন করেছেন এবং বিচারকের আসনে বসে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রায় ও ফয়সালা দিয়েছেন।

এই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- রাষ্ট্র পরিচালিত হতে হবে ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞা দিয়ে; তাহলে আল্লাহ এবং তাঁর বান্দা উভয়ের অধিকার সমুন্নত থাকবে।

২- ন্যায়পরায়ণ শাসক হতে হলে একজন মানুষকে সৎ ও খোদায়ী গুণে গুণান্বিত হতে হয়।

সূরা সোয়াদের ২১ থেকে ২৫ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَهَلْ أَتَاكَ نَبَأُ الْخَصْمِ إِذْ تَسَوَّرُوا الْمِحْرَابَ (21) إِذْ دَخَلُوا عَلَى دَاوُودَ فَفَزِعَ مِنْهُمْ قَالُوا لَا تَخَفْ خَصْمَانِ بَغَى بَعْضُنَا عَلَى بَعْضٍ فَاحْكُمْ بَيْنَنَا بِالْحَقِّ وَلَا تُشْطِطْ وَاهْدِنَا إِلَى سَوَاءِ الصِّرَاطِ (22) إِنَّ هَذَا أَخِي لَهُ تِسْعٌ وَتِسْعُونَ نَعْجَةً وَلِيَ نَعْجَةٌ وَاحِدَةٌ فَقَالَ أَكْفِلْنِيهَا وَعَزَّنِي فِي الْخِطَابِ (23) قَالَ لَقَدْ ظَلَمَكَ بِسُؤَالِ نَعْجَتِكَ إِلَى نِعَاجِهِ وَإِنَّ كَثِيرًا مِنَ الْخُلَطَاءِ لَيَبْغِي بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ إِلَّا الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَقَلِيلٌ مَا هُمْ وَظَنَّ دَاوُودُ أَنَّمَا فَتَنَّاهُ فَاسْتَغْفَرَ رَبَّهُ وَخَرَّ رَاكِعًا وَأَنَابَ (24) فَغَفَرْنَا لَهُ ذَلِكَ وَإِنَّ لَهُ عِنْدَنَا لَزُلْفَى وَحُسْنَ مَآَبٍ (25)

“আপনার কাছে কি দাবিদারদের বৃত্তান্ত পৌছেছে, যখন তারা (দাউদের) প্রাচীর ডিঙিয়ে ইবাদত খানায় প্রবেশ করেছিল?” (৩৮:২১)

“যখন তারা (অকস্যাৎ) দাউদের কাছে অনুপ্রবেশ করল, তখন সে (তাদের দেখে) সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। তারা বলল: ভয় করবেন না; আমরা বিবদমান দুটি পক্ষ, একজন অপরের প্রতি বাড়াবাড়ি করেছি। অতএব, আমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করুন ও অবিচার করবেন না। আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করুন।” (৩৮:২২)

“সে আমার ভাই, সে নিরানব্বই দুম্বার মালিক আর আমি মালিক একটি দুম্বার। এরপরও সে বলে: এটিও আমাকে দিয়ে দাও। সে কথাবার্তায় আমার উপর বল প্রয়োগ করে।” (৩৮:২৩)

“(দাউদ) বলল: সে তোমার দুম্বাটিকে নিজের দুম্বাগুলোর সাথে সংযুক্ত করার দাবি করে তোমার প্রতি অবিচার করেছে। (অবশ্য সব ক্ষেত্রেই যেকোনো কিছুর) শরীকদের অনেকেই একে অপরের প্রতি জুলুম করে থাকে। তবে তারা করে না, যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ও সৎকর্ম সম্পাদনকারী। অবশ্য এমন লোকের সংখ্যা অল্প। দাউদের খেয়াল হল যে, (এই ঘটনার মাধ্যমে) আমি তাকে পরীক্ষা করছি। অতঃপর সে তার পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল, সেজদায় লুটিয়ে পড়ল এবং তওবা করল।” (৩৮:২৪)

“সুতরাং আমি তার সে অপরাধ (অর্থাৎ সংক্ষিপ্ত বিচারের অপরাধ) ক্ষমা করলাম। নিশ্চয় আমার কাছে তার জন্যে রয়েছে উচ্চ মর্যাদা ও সুন্দর পরিণতি।” (৩৮:২৫)

আগের আয়াতে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ হযরত দাউদ (আ.)কে বিচারপতির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিলেন। এরপর এই আয়াতগুলোতে বলা হচ্ছে: দুই ব্যক্তি তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করে দেয়ার জন্য হযরত দাউদের কাছে আবেদন জানায়। কিন্তু আল্লাহর নবীর কাছে তাদের আগমনের পদ্ধতি সঠিক ছিল না। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে তাঁর প্রাসাদে প্রবেশ করার প্রচলিত নিয়ম মেনে তারা হযরত দাউদের কাছে আসেনি। কারণ, তারা জানত, যখন তখন বাদশার কাছে যাওয়ার অনুমতি হযরত দাউদের প্রহরীরা তাদেরকে দেবেন না।

ওই দুই ব্যক্তি এমন সময় আল্লাহর নবীর কাছে যায় যখন হযরত দাউদ ইবাদতখানায় আল্লাহর ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল ছিলেন। তারা ইবাদতখানার দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে পড়ে। হযরত দাউদ (আ.) যেহেতু এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না তাই তিনি হঠাৎ ইবাদতখানার মধ্যে দুই ব্যক্তিকে লাফিয়ে পড়তে দেখে কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেন এরা তাঁকে হত্যা করতে এসেছে।

এটি বুঝতে পেরে আগন্তুকরা বলে ওঠে: হে আল্লাহর নবী আপনি ভয় পাবেন না। আমরা দু’জন আপনার কাছে বিচার চাইতে এসেছি। আগন্তুকদের উদ্ভট আচরণে কিছুটা বিরক্তবোধ করছিলেন হযরত দাউদ (আ.)। তাই তিনি বাদীর বক্তব্য শোনার পর বিবাদীর বক্তব্য শোনার প্রয়োজন মনে না করে হুট করে বিচারের রায় দিয়ে দেন। তিনি বলেন, বিবাদী জুলুম করেছে এবং যেটার ওপর তার অধিকার নেই সেটা সে দাবি করছে। এখানে আরো মজার ব্যাপার হলো, অভিযুক্ত ব্যক্তি এসময় কোনো প্রতিবাদ বা বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত না হয়ে বিচারের রায় শুনে চলে যায়। কিন্তু তারা চলে যাওয়ার পর হযরত দাউদের মনে পড়ে, তিনি বিচারের সঠিক নিয়ম পালন করেননি। অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য না শুনে তাকে দায়ী করে রায় ঘোষণা করা উচিত হয়নি।  এ কারণে সঙ্গে সঙ্গে তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং আল্লাহ তায়ালা তাঁর তওবা কবুল করেন।

এই পাঁচ আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- মতবিরোধে লিপ্ত ব্যক্তিদের উচিত বিচারকের কাছে ন্যায়বিচার কামনা করা সে রায় যার পক্ষেই যাক না কেন। বিচারককে এটা বলা উচিত নয় যে, আমার পক্ষে রায় দিন।

২- সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হচ্ছে মানুষের সরল পথে পরিচালিত হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষের মধ্যে বাড়াবাড়ি বা ছাড়াছাড়ির প্রবণতা কমে যায় এবং বিপথগামিতা কমে যায়।

৩- মানুষের মধ্যে থাকা লোভ তাকে ধন-সম্পদ অর্জনের দিকে ধাবিত করে এবং লোভী ব্যক্তি সম্পদের যত পাহাড়ই গড়ুক না কেন সে কখনো তৃপ্ত হতে পারে না। এ কারণেই দেখা যায়, যার যত বেশি সম্পদ তার তত বেশি সম্পদ আহরণের নেশা।

৪- বিচার করার জন্য উপযুক্ত ও শান্ত পরিবেশ প্রয়োজন।  সন্ত্রস্ত বা উদ্বিগ্ন মনে বিচার করা উচিত নয়। কারণ, এমন অবস্থায় বিচারে ভুল হতে পারে যা পরবর্তীতে বিচারকের অনুশোচনার কারণ হয়।

৫- ঈমান ও সৎকর্মের সঙ্গে সুস্থ অর্থনীতির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। একটি সমাজের মানুষের যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান না থাকে তাহলে সে সমাজের মানুষ সম্পদ আহরণ করতে গিয়ে অপরের প্রতি জুলুম করবে এটাই স্বাভাবিক।#