আগস্ট ১৭, ২০২০ ১৫:৩৮ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সোয়াদের ২৬ থেকে ২৮ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ২৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّ الَّذِينَ يَضِلُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ (26)

“হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে আমার স্থলাভিষিক্ত (ও প্রতিনিধি) করেছি, অতএব, তুমি মানুষের মাঝে ন্যায়সঙ্গতভাবে রাজত্ব করো এবং খেয়াল-খুশি’র অনুসরণ করো না; (খেয়াল খুশির অনুসরণ) তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি, এ কারণে যে, তারা হিসাবদিবসকে ভুলে যায়।” (৩৮:২৬)

গত আসরে আমরা বলেছি, আল্লাহর নবী হযরত দাউদ (আ.) দুই ভাইয়ের বিরোধ নিষ্পত্তি করতে গিয়ে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন। পরে বিষয়টি বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আল্লাহর দরবারে তওবা করেন। মহান আল্লাহ হযরত দাউদের আন্তরিক তওবা কবুল করে তাকে ক্ষমা করে দেন।

এরপর আজকের এই আয়াতে মহান আল্লাহ হযরত দাউদকে উদ্দেশ করে বলছেন: হে দাউদ! আমি তোমাকে রিসালাতের দায়িত্ব অর্পন করে কার্যত তোমাকে পৃথিবীতে নিজের স্থলাভিষিক্ত করেছি। কাজেই তোমাকে মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ করতে হবে যা ঐশী গুণে গুণান্বিত হয়। মানুষের মাঝে বিচার করার সময় ন্যায়নীতি অনুসরণ করবে এবং আল্লাহ তায়ালার নির্দেশের ওপর নিজের ইচ্ছা বা খেয়ালখুশিকে প্রাধান্য দেবে না। কারণ, এ কাজ করলে আল্লাহর নির্ধারিত সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে।

নবী-রাসূল বা আল্লাহর প্রেরিত পুরুষগণ নিষ্পাপ এবং তারা কখনো সরল পথ থেকে বিচ্যুত হন না। তারপরও একজন নবীকে ন্যায়ের পথ থেকে সরে না যাওয়ার এই সতর্কতামূলক বাণী থেকে বোঝা যায়, নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও নবী-রাসূলদের কাছ থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করার এবং গুনাহ করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়নি। বরং আর দশজন মানুষের মতো তারাও গুনাহ করতে পারেন। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, তিনি যেন নিজের নফ্‌স বা আত্মার লাগাম কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখেন। তা না হলে যেকোনো মুহূর্তে এই নফ্‌সের খেয়াল-খুশি তাঁকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করতে ফেলতে পারে।

এই আয়াতে আগের আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতায় উদাহরণ হিসেবে মানুষের মধ্যে বিচারকাজ পরিচালনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, পৃথিবীতে যাকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সে বিচার করার সময় যেন ন্যায়নীতি অনুসরণ করে চলে। এটি করতে হলে শাসককে আল্লাহর নির্দেশাবলী সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকতে হয়। কেউ যদি নিজের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করার একই সময়ে এটা ভেবে বসে থাকে যে, আল্লাহর বিধান মানার কোনো প্রয়োজন নেই বরং সে তার ইচ্ছা অনুযায়ী বিচার করলেই ন্যায়বিচার হয়ে যাবে তাহলে সে ভুলের মধ্যে রয়েছে। সমাজের শাসক শ্রেণি যদি তাদের মনের ইচ্ছা অনুযায়ী সমাজ পরিচালনা করতে চায় তাহলে সাধারণ মানুষের অধিকার পদদলিত হবেই।

এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- রাজনীতি থেকে ধর্ম আলাদা কোনো বিষয় নয়। নবী-রাসূলদের অন্যতম দায়িত্ব ছিল সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করা; যদিও তাদের মধ্যে অল্প সংখ্যক নবীকে রাষ্ট্রক্ষমতার মালিক বানানো হয়েছিল।

২- রাষ্ট্র ও বিচারকাজ পরিচালনায় আল্লাহর আইন অনুসরণ করতে হবে।

৩- যেকোনো কাজে মনের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিলে আল্লাহর নির্দেশ উপেক্ষিত হবে। এ কারণে বুদ্ধিমান মানুষেরা জীবনের প্রতিটি পদে আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তাদের মনের ইচ্ছাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন।

সূরা সোয়াদের ২৭ ও ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا بَاطِلًا ذَلِكَ ظَنُّ الَّذِينَ كَفَرُوا فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ كَفَرُوا مِنَ النَّارِ (27) أَمْ نَجْعَلُ الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَالْمُفْسِدِينَ فِي الْأَرْضِ أَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِينَ كَالْفُجَّارِ (28)

“আমি আসমান-যমীন ও এ দুইয়ের মধ্যবর্তী কোন কিছু অযথা সৃষ্টি করিনি। এটা কাফেরদের ধারণা। অতএব, কাফেরদের জন্যে রয়েছে দুর্ভোগ অর্থাৎ জাহান্নাম।” (৩৮:২৭)

“আমি কি বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীলদেরকে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কাফেরদের সমতুল্য করে দেব? নাকি খোদাভীরুদেরকে পাপাচারীদের সমান করব?” (৩৮:২৮)

আগের আয়াতে আল্লাহ তায়ালা হযরত দাউদকে উদ্দেশ করে বলেন: পৃথিবীতে ন্যায়সঙ্গতভাবে বিচার ও শাসনকাজ পরিচালনা করো। কারণ, তুমি ভূপৃষ্ঠে আমার প্রতিনিধি ও স্থলাভিষিক্ত। এরপর এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: আমি যেহেতু পৃথিবীকে ন্যায়সঙ্গতভাবে সৃষ্টি করেছি এবং কোনো অন্যায় তাতে স্থান পায়নি তাই এখানে ন্যায় ছাড়া অন্য কোনো কিছুর স্থান হওয়া উচিত নয়। অবশ্য যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না এবং এ বিশ্বজগত পরিচালনায় তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্যকে অস্বীকার করে তাদের বিশ্বাস, বিশ্বজগত কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া পরিকল্পনাহীনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা আরো মনে করে, এই বিশ্বজগতের সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ও ভবিষ্যত নেই। তাই তারা ‘খাও দাও ফুর্তি করো’ ঢংয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়। এ ধরনের মানুষকে যেদিন জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে সেদিন তারা তাদের এ ভ্রান্ত ধারনার স্বরূপ উপলব্ধি করবে।

আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে: শুধুমাত্র যে বিশ্বজগতই ন্যায়সঙ্গতভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে তা নয় সেইসঙ্গে এই জগতে বসবাসকারী মানুষের পুরস্কার এবং শাস্তিও দেয়া হবে ন্যায়বিচারের মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা পুণ্যবানদেরকে কখনোই পাপাচারীদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না এবং তাদের সঙ্গে সমান ব্যবহার করবেন না।

যারা আল্লাহকে নিজেদের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা মনে করে এবং কিয়ামতে বিশ্বাস করে পৃথিবীতে তাদের আচরণ হবে আল্লাহ ও পরকালে অবিশ্বাসীদের চেয়ে ভিন্নতর। প্রথম দলের মানুষ নিজের পাশাপাশি সমাজ সংশোধনে আত্মনিয়োগ করে। কিন্তু দ্বিতীয় দলের লোকেরা সমাজে পাপাচার ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বেড়ায়। প্রথম দলের মানুষ তাদের পালনকর্তার বিধিবিধানকে নিজেদের জীবন চলার গাইডলাইন হিসেবে মেনে নেয়। অন্যদিকে দ্বিতীয় দল একেবারেই ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে। 

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- ধর্মীয় বিশ্বাস বলে, বিশ্বজগত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে সৃষ্টি ও পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু ধর্মহীনদের বিশ্বাস, কোনো ধরনের কর্মপরিকল্পনা ও লক্ষ্য ছাড়াই বিশ্বজগত সৃষ্টি করা হয়েছে।

২- যিনি এ বিশ্বজগতের পাশাপাশি সব মানুষ সৃষ্টি করেছেন রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনায় তাঁর দেয়া বিধিবিধানকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

৩- দুনিয়া ও আখেরাতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা মহান আল্লাহর লক্ষ্য। কাজেই সমাজের ভালো ও মন্দ মানুষকে একচোখে দেখা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।

৪- আল্লাহ তায়ালার আদেশ-নিষেধ মেনে না চললে সমাজে পাপাচার ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। #