আগস্ট ১৯, ২০২০ ১৪:৪১ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সোয়াদের ২৯ থেকে ৩৩ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ২৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آَيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ (29)

“(এটি) একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসূহ নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এবং বুদ্ধিমানগণ যেন তা থেকে শিক্ষা নেয়।” (৩৮:২৯)

গত আসরে আমরা বলেছি, এই বিশ্বজগত সৃষ্টির পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালা মানুষকে পুরস্কার ও শাস্তি দেবেন সূক্ষ্ম ন্যায়বিচারের মাধ্যমে। তিনি পূণ্যবান ও পাপী বান্দাদেরকে সমান চোখে দেখেন না। এরপর আজকের এই আয়াতে বলা হচ্ছে: পবিত্র কুরআন হচ্ছে এমন একটি গ্রন্থ যাতে বিশ্বজগত সৃষ্টির উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে যেন মানুষ তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পূর্ণতা অর্জন করতে পারে। তবে এই কিতাব থেকে সবাই সমানভাবে উপকৃত হবে না। যারা নিজেদের জ্ঞান ও বিচারবুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে এই কিতাবের আয়াতগুলো উপলব্ধি করার চেষ্টা করবে তারা মহান আল্লাহর প্রজ্ঞাপূর্ণ আদেশ-নিষেধের গভীর মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারবে। এ ধরনের মানুষ নিজেদের জীবনে আল্লাহর বিধিবিধান মেনে চলে এবং এর পরিণতিতে তারা পরকালে জান্নাতলাভের উপযুক্ত হয়। কিন্তু যারা আল্লাহ তায়ালার নির্দেশাবলীর ব্যাপারে উদাসীন তারা প্রকৃতপক্ষে মৃত অন্তরের অধিকারী; যদিও বাহ্যিকভাবে তারা জীবিত এবং সুঠাম দেহের অধিকারী।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- পবিত্র কুরআন শুধু তেলাওয়াত করলেই মানুষের জীবন বরকতময় হয়। কিন্তু এই কিতাব নাজিল করার মূল উদ্দেশ্য এর আয়াতগুলো সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করার পাশাপাশি এতে বর্ণিত বিধিবিধান মেনে চলা।

২- কিছু খোদাদ্রোহী মানুষ আল্লাহর বাণীকে মানুষের বিচারবুদ্ধির পরিপন্থি বলে মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে কুরআনের আয়াত মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি ও বিচারবুদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।  মূলত কুরআন নাজিলই হয়েছে মানুষের চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহকে চেনার জন্য; খোদাদ্রোহী হওয়ার জন্য নয়।

সূরা সোয়াদের ৩০ থেকে ৩৩ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন:

وَوَهَبْنَا لِدَاوُودَ سُلَيْمَانَ نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ (30) إِذْ عُرِضَ عَلَيْهِ بِالْعَشِيِّ الصَّافِنَاتُ الْجِيَادُ (31) فَقَالَ إِنِّي أَحْبَبْتُ حُبَّ الْخَيْرِ عَنْ ذِكْرِ رَبِّي حَتَّى تَوَارَتْ بِالْحِجَابِ (32) رُدُّوهَا عَلَيَّ فَطَفِقَ مَسْحًا بِالسُّوقِ وَالْأَعْنَاقِ (33)

“(এবং) আমি দাউদকে সোলায়মান দান করেছি। সে (ছিল) কতো উত্তম বান্দা! সে ছিল (আল্লাহর দিকে) প্রত্যাবর্তনশীল।” (৩৮:৩০)

“(স্মরণ করুন) যখন তার সামনে অপরাহ্নে (অর্থাৎ সূর্যাস্তের আগে) উৎকৃষ্ট অশ্বরাজি পেশ করা হল (এবং সে অশ্বারোহীদের কুচকাওয়াজ প্রত্যক্ষ করতে লাগল), (৩৮:৩১)

“তখন সে বলল: আমি তো আমার পরওয়ারদেগারের জন্য এই ঘোড়াগুলোকে ভালোবাসি। (সে ঘোড়াগুলোর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকল) যাতে (সেগুলো তার দৃষ্টিসীমার) আড়াল হয়ে গেল।” (৩৮:৩২)

“(তখন সে নির্দেশ দিল) এগুলোকে আমার কাছে ফিরিয়ে আন। অতঃপর সে ঘোড়াগুলোর পা ও গলদেশে হাত বোলাতে শুরু করল।” (৩৮:৩৩)

এই চার আয়াতের শুরুতেই আল্লাহ জানিয়ে দেন, তিনি হযরত দাউদ (আ.)কে সোলায়মান নামক একজন সন্তান দান করেছিলেন। এই সন্তান ছিলেন পিতার মতো আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা এবং তিনি সব সময় আল্লাহর কাছে তওবা করতেন ও বারবার তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতেন।

এরপর সোলায়মান (আ.)’র বিশাল রাজত্ব এবং দ্রুতগামী অশ্ব ও ঘোড়সওয়ারদের কুচকাওয়াজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, যখন অশ্ব ও অশ্বারোহীরা তাঁর সামনে কসরত প্রদর্শন করছিল তখন তিনি ক্ষমতার দম্ভে আত্মবিসৃত হয়ে যাননি। নিজের মধ্যে যাতে অহংবোধ জন্ম না নেয় সেজন্য তিনি তার পারিষদবর্গকে বলেন: আমি একমাত্র আল্লাহর জন্য এই ঘোড়াগুলোকে ভালোবাসি। তিনি দেশের নিরাপত্তা রক্ষা ও শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য এ ঘোড়াগুলো দান করেছেন।

হযরত সোলায়মান (আ.) মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঘোড়াগুলোর ছুটে যাওয়া উপভোগ করছিলেন এবং এক সময় এগুলো তার দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে যায়। এ সময় তিন ঘোড়াগুলোকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে আনতে বলেন। সেগুলোকে ফিরিয়ে আনা হলে তিনি এগিয়ে গিয়ে ঘোড়াগুলোকে আদর করতে থাকেন এবং সেগুলোর পা ও গলায় হাত বুলিয়ে দেন। সাধারণত অশ্বারোহীরা ঘোড়া থেকে নামার সময় ঘোড়ার সঙ্গে এ আচরণ করেন। ঘোড়ার প্রতি ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনের জন্য ঘোড়সওয়াররা এ কাজ করে থাকেন। 

অবশ্য দুঃখজনকভাবে কিছু ভুল বর্ণনার কারণে কেউ কেউ এই আয়াতগুলোর তর্জমা ও তাফসির ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন। তারা এই ঘটনা তুলে ধরে হযরত সোলায়মান (আ.)’র মর্যাদা হানিকর কিছু কথাবার্তা বলেছেন।  যেমন তারা বলেন: হযরত সোলায়মান অশ্বারোহীদের কুচকাওয়াজ দেখতে এতটাই মশগুল হয়ে যান যে কখন সূর্য অস্ত যায় তা তিনি টের পাননি। ফলে তাঁর আসরের নামাজ কাজা হয়ে যায়। এ অবস্থায় তিনি আল্লাহর কাছে সূর্যকে ফিরিয়ে আনার আবেদন জানান যাতে তিনি আসরের নামাজ আদায় করতে পারেন। এটা কিভাবে মেনে নেয়া সম্ভব যে, আল্লাহর একজন নবী কুচকাওয়াজ দেখতে গিয়ে নামাজ কাজা করে ফেলবেন?

একটু চিন্তা করলেই একথা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ ধরনের বক্তব্য অসঙ্গত। কারণ, হযরত সোলায়মানের মতো আল্লাহর একজন নবী ও উত্তম বান্দা তো দূরের কথা একজন সাধারণ মুমিন মুসলমানের কাছ থেকেও এ ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তায়ালা নিজে যাকে উত্তম ও তওবাকারী বান্দা হিসেবে উল্লেখ করেছেন তার নামে এ ধরনের বক্তব্য চালিয়ে দেয়া সত্যিই অনুচিৎ।

এই চার আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করার মাধ্যমে তাঁর খাঁটি বান্দা হতে পারা একজন মানুষের জন্য সর্বোচ্চ মর্যাদা বহন করে। এ কারণে পবিত্র কুরআনে নবীদেরকে বারবার ‘আব্দ’ বা বান্দা বলে সম্মোধন করা হয়েছে।

২- সমাজপতি বা রাষ্ট্রপ্রধানদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ কারণে সামরিক বাহিনীকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান ও কুচকাওয়াজের আয়োজন করা ইসলামে উত্তম কাজ হিসেবে বিবেচিত।  

৩- যদি আল্লাহর কোনো উত্তম বান্দা শাসনক্ষমতার অধিকারী হন তাহলে তিনি স্বেচ্ছাচারী ও জালিম হন না। তিনি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য শাসনকাজ পরিচালনা করেন। #