কুরআনের আলো
সূরা সোয়াদ: আয়াত ৩৪-৩৮ (পর্ব-৭)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সোয়াদের ৩৪ থেকে ৩৮ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৩৪ ও ৩৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَلَقَدْ فَتَنَّا سُلَيْمَانَ وَأَلْقَيْنَا عَلَى كُرْسِيِّهِ جَسَدًا ثُمَّ أَنَابَ (34) قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ مِنْ بَعْدِي إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ (35)
“আমি সোলায়মানকে পরীক্ষা করলাম এবং তার সিংহাসনের উপর রেখে দিলাম একটি নিষ্প্রাণ দেহ (যে দেহ ছিল তার সন্তানের)। অতঃপর সে আল্লাহর দরবারে তওবা করল।” (৩৮:৩৪)
“সোলায়মান বলল: হে আমার পালনকর্তা! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে এমন সাম্রাজ্য দান করুন যা আমার পরে আর কেউ পেতে পারবে না। নিশ্চয় আপনি মহাদাতা।” (৩৮:৩৫)
গত আসরে আমরা হযরত সোলায়মান (আ.)’র প্রতি আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহের কথা বর্ণনা করেছিলাম। এরপর আজকের এই দুই আয়াতে আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত সোলায়মানকে একটি কঠিন পরীক্ষায় ফেলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরীক্ষাটি কি ছিল সেকথা কুরআনে পাকের আয়াতে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। হাদিসের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত যেসব বর্ণনা পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বর্ণনাটি তুলে ধরছি।
হযরত সোলায়মান (আ.)’র স্বপ্ন ছিল তাঁর অনেকগুলো সন্তান থাকবে এবং তাদের মধ্য থেকে তিনি সবচেয়ে সাহসী ও শক্তিশালী সন্তানকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যাবেন। তিনি আশা করতেন, ওই শক্তিশালী সন্তান তার অবর্তমানে সাম্রাজ্য শাসন করবে।
কিন্তু মনে মনে এই স্বপ্ন বোনার সময় তিনি আল্লাহ তায়ালার ওপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করেননি। বিষয়টি আল্লাহর অসন্তুষ্টির উদ্রেক করে; ফলে সোলায়মানের কোনো স্ত্রীর ঘরেই কোনো সন্তান জন্ম নেয়নি। শুধু একজন স্ত্রীর গর্ভে একটি সন্তান আসে যা ছিল বিকলাঙ্গ এবং সেই সন্তানের জন্মের পর তাকে তার সিংহাসনের ওপর নিষ্প্রাণ দেহের মতো ফেলে রাখা হয়। এ দৃশ্য দেখার পর হযরত সোলায়মান বুঝতে পারেন যেহেতু তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করার পরিবর্তে সম্ভাব্য সন্তানকে ঘিরে আশার আলো দেখেছিলেন তাই মহান আল্লাহ তাকে এই কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছেন। একথা উপলব্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তওবা করে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করেন।
কোনো কোনো বর্ণনায় আবার একথাও এসেছে যে, হযরত সোলায়মান (আ.) নিজে কঠিন অসুখে ভুগেছিলেন এবং তিনি নিজে নিষ্প্রাণ দেহের মতো সিংহাসনের উপর পড়েছিলেন।
পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার পর হযরত সোলায়মান (আ.) তার শাসনক্ষমতায় এমন একটি অলৌকিক শক্তি কামনা করেন যা হবে অন্যান্য নবীর মতো তার নবুওয়্যাতের প্রমাণ। তিনি আল্লাহ তায়ালার কাছে বলেন, তাঁকে যেন এমন শক্তি দান করা হয় যা পরবর্তীতে আর কোনো শাসক পাবে না।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ করে দেয়ার জন্য তাদের সবাইকে পরীক্ষা করেন। এই পরীক্ষা থেকে কেউ রক্ষা পায় না; এমনকি নবী-রাসূলগণ পর্যন্ত আল্লাহর চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হন।
২- আল্লাহ তায়ালার রেসালাতের বাণী পৌঁছে দেয়ার পাশাপাশি কোনো কোনো নবী-রাসূলকে বিশাল সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা বানানো হয়েছিল। এসব নবী অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে তাঁদের শাসনকাজ পরিচালনা করেন।
৩- আমরা যখন আল্লাহ তায়ালার কাছে চাইব, তখন যেন ছোটখাট কিছু না চাই। আমাদের উচিত এক্ষেত্রে হযরত সোলায়মান (আ.)’র কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে আল্লাহর কাছে অনেক বড় কিছু চাওয়া।
সূরা সোয়াদের ৩৬ থেকে ৩৮ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে বলা হয়েছে:
فَسَخَّرْنَا لَهُ الرِّيحَ تَجْرِي بِأَمْرِهِ رُخَاءً حَيْثُ أَصَابَ (36) وَالشَّيَاطِينَ كُلَّ بَنَّاءٍ وَغَوَّاصٍ (37) وَآَخَرِينَ مُقَرَّنِينَ فِي الْأَصْفَادِ (38)
“তখন আমি বাতাসকে তার অনুগত করে দিলাম, যা তার হুকুমে অবাধে প্রবাহিত হতো (সেখানে) যেখানে সে পৌঁছাতে চাইত।” (৩৮:৩৬)
“আর সকল কুচক্রী জিনকে তার অধীন করে দিলাম অর্থাৎ, যারা ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী।” (৩৮:৩৭)
“এবং অন্য আরও অনেক জিনকে তার অধীন করে দিলাম, যারা থাকত ডান্ডাবেড়ি পরা অবস্থায়।” (৩৮:৩৮)
এই তিন আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ তায়ালা হযরত সোলায়মানের ইচ্ছা পূরণ করেন এবং তাঁকে বিশেষ ক্ষমতা ও উপকরণ দান করেন। এমন ক্ষমতা হযরত সোলায়মান (আ.)’র আগেও যেমন কাউকে দেয়া হয়নি তেমনি তাঁর পরেও কাউকে দেয়া হয়নি। এসব ক্ষমতা ছিল এমন অলৌকিক যা ছিল তার নবুওয়্যাতের দলিল। আল্লাহ তায়ালা প্রথম যে দয়া তার প্রতি করেছিলেন তা ছিল তিনি বাতাসকে তাঁর অনুগত করে দিয়েছিলেন। বাতাস আল্লাহর ইচ্ছায় হযরত সোলায়মানের সিংহাসনকে ভূপৃষ্ঠ থেকে তুলে ফেলত এবং আল্লাহর নবী যেখানে যেতে চাইতেন সেখানে তাঁকে নিয়ে যেত। বর্তমানে যেমন বিমান আকাশে উড্ডয়ন করে অল্প সময়ে অনেক দূরের পথ পাড়ি দিতে পারে বিষয়টি ছিল অনেকটা তেমনই।
হযরত সোলায়মানের প্রতি আল্লাহর দ্বিতীয় অনুগ্রহ ছিল এই যে, তিনি রাষ্ট্রীয় জনসেবামূলক কাজ করার জন্য জিনকে এই নবীর অনুগত করে দিয়েছিলেন। এই আয়াত অনুযায়ী, খারাপ জিনগুলো হযরত সোলায়মানের বাধ্য ছিল। কিছু জিনকে ভবন ও বাঁধ নির্মাণের কাজে নিয়োজিত করা হয়েছিল। অন্য একদল জিন সাগরে ডুবুরির কাজ করত। পাশাপাশি হযরত সোলায়মানের নির্দেশ অমান্য করায় আরকদল জিনকে কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। তাদেরকে অন্যান্য কয়েদির মতো ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখা হতো। এভাবে আল্লাহ তায়ালা মানুষের পাশাপাশি জিন এবং প্রকৃতিকে হযরত সোলায়মানের আজ্ঞাবহ করে দিয়েছিলেন।
এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হলো:
১- মানুষের মতো জিনদেরও চিন্তাশক্তি রয়েছে এবং তারাও বিভিন্ন কাজে পেশাদারিত্ব অর্জন করতে পারে।
২- রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে দক্ষ ও পেশাদার জনগোষ্ঠীকে ব্যবহার করা ইসলাম অনুমোদিত কাজ।
৩- যেসব মানুষ সমাজে ধ্বংসাত্মক তৎপরতায় লিপ্ত এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তাদেরকে বন্দি করে রাখতে হবে যেভাবে হযরত সোলায়মান (আ.) অবাধ্য জিনদেরকে বন্দি রেখেছিলেন। #