কুরআনের আলো
সূরা সোয়াদ: আয়াত ৩৯-৪৩ (পর্ব-৮)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সোয়াদের ৩৯ থেকে ৪৩ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৩৯ ও ৪০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
هَذَا عَطَاؤُنَا فَامْنُنْ أَوْ أَمْسِكْ بِغَيْرِ حِسَابٍ (39) وَإِنَّ لَهُ عِنْدَنَا لَزُلْفَى وَحُسْنَ مَآَبٍ (40)
“(এবং আমি সোলায়মানকে বললাম) এগুলো আমার অনুগ্রহ, অতএব, এগুলো যাকে খুশি দাও এবং ইচ্ছা না করলে নিজের কাছে রেখে দাও-এর কোন হিসাব দিতে হবে না।” (৩৮:৩৯)
“এবং নিশ্চয় তার জন্য আমার কাছে রয়েছে উন্নত মর্যাদা ও শুভ পরিণতি।” (৩৮:৪০)
এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালা হযরত সোলায়মানকে অনেক ধন-সম্পদ ও প্রাচুর্য দান করেন। তিনি তাঁর নবীকে এই নির্দেশ দেন যে, সমাজের দরিদ্র ও অভাবী মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করার কাজে যেন এই সম্পদ খরচ করা হয়। হযরত সোলায়মান (আ.) দরিদ্রদের মধ্যে যার যতটুকু প্রয়োজন তাকে ততটুকু দান করেন; সবার মাঝে সম্পদ সমানভাবে বণ্টন করে দেননি কারণ সেটি করলে তা হতো ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।
পরের আয়াতে হযরত সোলায়মানের শুভ পরিণতির প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: এত বিশাল সাম্রাজ্য ও ধনদৌলতের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনো জনগণের ওপর বিন্দুমাত্র অত্যাচার করেননি। সম্পদ ও ক্ষমতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার কারণে আল্লাহর কাছে তিনি অতি উচ্চ মর্যাদা লাভ করেন এবং অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে এই নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করেন।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- ঐশী শাসনব্যবস্থায় শাসকের হাতে যত ক্ষমতা ও সম্পদ থাকুক তিনি তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে দান বলে মনে করেন যা জনস্বার্থে ব্যবহার করতে হবে।
২- আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে ক্ষমতা ও ধন-সম্পদ কোনো অন্তরায় নয়।
সূরা সোয়াদের ৪১ থেকে ৪৩ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَاذْكُرْ عَبْدَنَا أَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الشَّيْطَانُ بِنُصْبٍ وَعَذَابٍ (41) ارْكُضْ بِرِجْلِكَ هَذَا مُغْتَسَلٌ بَارِدٌ وَشَرَابٌ (42) وَوَهَبْنَا لَهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُمْ مَعَهُمْ رَحْمَةً مِنَّا وَذِكْرَى لِأُولِي الْأَلْبَابِ (43)
“স্মরণ করুন, আমার বান্দা আইয়্যুবের কথা, যখন সে তার পালনকর্তাকে আহবান করে বলল: শয়তান আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্ট দিয়েছে।” (৩৮:৪১)
“(তাকে বললাম) তুমি তোমার পা দিয়ে ভূমিতে আঘাত কর (তাহলে আমি সেখান থেকে ঝরণা ধারা নির্গত করব)। এই ঝরণার শীতল পানি (দেয়া হলো) গোসল ও পান করার জন্য।” (৩৮:৪২)
“এবং আমি আমার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ তাকে ফিরিয়ে দিলাম (দীর্ঘ রোগভোগের কারণে বিছিন্ন হয়ে যাওয়া) পরিবারবর্গ ও তাদের মত আরও অনেককে যাতে বুদ্ধিমানরা এখান থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।” (৩৮:৪৩)
এই তিন আয়াতে আল্লাহর আরেক নবী হযরত আইয়ুব (আ.)’র ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে; যে নবী ছিলেন মহা বিপদের মধ্যে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার প্রতীক। এখানে আল্লাহ তায়ালা শেষ নবীর উম্মতের জন্য আইয়্যুব নবীর ঘটনা বর্ণনা করার নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তারা ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে চরম বিপদে ধৈর্যধারণ করতে পারে।
বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তায়ালা হযরত আইয়্যুব (আ.)’কে অনেক ধন-সম্পদ ও লোকবল দান করেছিলেন। এতসব প্রাচুর্যের জন্য তিনি আল্লাহর দরবারে অনেক বেশি শোকর আদায় করতেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁর এই নবীর কাছ থেকে কঠিন পরীক্ষা নেন সবার সামনে এটা প্রমাণ করার জন্য যে তিনি সব অবস্থায় আল্লাহর শোকর আদায় করেন।
পরীক্ষার শুরুতে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে হযরত আইয়্যুবের ব্যবসার সম্পদ, গবাদি পশু ও কৃষিক্ষেত ধ্বংস হয়ে যায় এবং তিনি নিজে কঠিন অসুখে পড়েন। এ অবস্থায় হযরত আইয়্যুবের সন্তানরা পর্যন্ত তাকে ত্যাগ করে চলে যায়। কিন্তু তাঁর স্বামীভক্ত স্ত্রী তাঁকে ত্যাগ করেননি বরং এই বিপদে স্বামীর সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
এ অবস্থায় ইবলিস শয়তান জনগণের মধ্যে এই গুজব রটিয়ে দেয় যে, আইয়্যুব আল্লাহর নাফরমানি করার কারণে এই বিপদে পড়েছে। সে যদি আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা হতো তাহলে এমন বিপদে পড়ত না যে, সন্তানরা পর্যন্ত তাকে ত্যাগ করে চলে যায়। একদিকে নিঃস্ব অবস্থা ও কঠিন অসুখ এবং অন্যদিকে প্রতিবেশীদের ভর্ৎসনায় হযরত আইয়্যুবের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
কিন্তু এত বিপদ সত্ত্বেও তিনি আল্লাহর ইবাদত বা শোকরগুজারি থেকে বিরত থাকেননি। তিনি একদিন আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলেন, শয়তান তাকে কষ্ট দিচ্ছে। মহান আল্লাহ জনগণের ভর্ৎসনা থেকে তাঁর নবীকে রক্ষা করার জন্য অলৌকিকভাবে তাঁর রোগ ভালো করে দেন যাতে সবাই বুঝতে পারে তিনি আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা; নাফরমান বান্দা নন। আল্লাহ তায়ালা হযরত আইয়্যুবকে পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করতে বলেন যাতে সেখান থেকে ঝর্নাধার প্রবাহিত হয়। এরপর তাঁকে ওই ঝর্নার পানিতে গোসল করে সেখান থেকে পানি পান করতে বলা হয়। এভাবে আল্লাহ তাঁর রোগমুক্তি দান করেন।
এই ঐশী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হযরত আইয়্যুব (আ.) সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে আবার তরতাজা যুবকে পরিণত হন। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সন্তানরা তার কাছে ফিরে আসে এবং ধীরে ধীরে আগের সেই প্রাচুর্য ও ধন-সম্পদও তিনি ফিরে পান। একইসঙ্গে আল্লাহ তাঁকে আরো অনেক সন্তান দান করেন।
এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- আমরা যেন আমাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি নিয়ে অহংকার না করি; কারণ আল্লাহর এসব দান মুহূর্তের মধ্যে তিনি নিয়ে নিতে পারেন।
২- আমাদের সামনে যত বিপদ-আপদ ও রোগ-শোক আসুক না কেন আমরা যেন আল্লাহর রহমতের কথা ভুলে হতাশ হয়ে না যাই। তাঁর ওপর বিশ্বাসে অটল থাকলে যত বড় বিপদই আসুক না কেন তা দূর করা আল্লাহর জন্য মোটেই কঠিন ব্যাপার নয়। #