আগস্ট ২৭, ২০২০ ১৪:৫১ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সোয়াদের ৪৪ থেকে ৪৮ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৪৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَخُذْ بِيَدِكَ ضِغْثًا فَاضْرِبْ بِهِ وَلَا تَحْنَثْ إِنَّا وَجَدْنَاهُ صَابِرًا نِعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ (44)

“(আমি আইয়্যুবকে বললাম) তুমি তোমার হাতে এক মুঠো তৃণশলা নাও, তদ্বারা আঘাত কর (যাতে তোমার স্ত্রী ব্যথা না পায়) এবং শপথ ভঙ্গ করো না। আমি আইয়্যুবকে ধৈর্যশীল পেয়েছি। কি চমৎকার বান্দা সে! নিশ্চয় সে ছিল (আমার কাছে) প্রত্যাবর্তনশীল।” (৩৮:৪৪)

গত আসরে আমরা বলেছি, মহান আল্লাহ তাঁর নবী হযরত আইয়্যুব (আ.)’র কাছ থেকে কঠিন পরীক্ষা নেন এবং চরম ধৈর্যের এই পরীক্ষায় আল্লাহর নবী সাফল্য অর্জন করেন। হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, হযরত আইয়্যুবের কঠিন অসুখের সময় তাঁর স্ত্রী তাঁকে একা ফেলে যাননি। কিন্তু তিনি আল্লাহর নবীর সেবা করতে করতে একদিন ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং শয়তানের ধোকায় পা দেন। তিনি বলে ফেলেন, আল্লাহ তায়ালা আইয়্যুবকে ভুলে গেছে কাজেই এই কঠিন বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তাককে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে আশ্রয় নিতে হবে।  নাউজুবিল্লাহ।  আল্লাহর নবী নিজ স্ত্রীর মুখে একথা শুনে চরম ক্ষুব্ধ হন এবং মনে মনে আল্লাহর নামে শপথ করেন, সুস্থ হয়ে ওঠার পর স্ত্রীকে শাস্তি দেবেন।

কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহর ইচ্ছায় সুস্থ হওয়ার পর হযরত আইয়্যুব (আ.) চরম কঠিন দিনগুলোদে স্ত্রীর আত্মোৎসর্গের কথা বিবেচনা করে তাকে শাস্তি দেয়ার শপথ বাস্তবায়ন করা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এই আয়াতে বলা হচ্ছে, এ অবস্থায় আল্লাহ তায়ালা হযরত আইয়্যুবকে বলেন, তুমি আমার নামে যে শপথ করেছ তা ভঙ্গ করো না। কিন্তু যেহেতু তোমার স্ত্রী ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য তাই শপথ পালন করার জন্য এক মুঠো গম গাছের খড় বা এ ধরনের নরম কিছু হাতে নাও এবং তা দিয়ে তোমার স্ত্রীকে মৃদু আঘাত করো যাতে সে ব্যথা না পায়। এতে করে স্ত্রীকে শাস্তি দেয়ার শপথও পালন হবে আবার তোমার স্ত্রী ব্যথাও পাবে না।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- মহান আল্লাহ নিজে যেমন কিয়ামতের দিন পুণ্যবান ব্যক্তিদেরকে খারাপ কাজের শাস্তি কমিয়ে দেবেন তেমনি তিনি চান পার্থিব জীবনে আমরাও যেন অন্যদের ভালো কাজ বিবেচনায় নিয়ে তাদের শাস্তি কমিয়ে দেই।

২- আল্লাহ তায়ালার নামে শপথ করলে তা রক্ষা করা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য।

৩- নবী-রাসূলের ঘনিষ্ঠজন হওয়ার কারণে কেউ আল্লাহর বিধান থেকে মুক্তি পাবে না।

সূরা সোয়াদের ৪৫ থেকে ৪৮ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَاذْكُرْ عِبَادَنَا إبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ أُولِي الْأَيْدِي وَالْأَبْصَارِ (45) إِنَّا أَخْلَصْنَاهُمْ بِخَالِصَةٍ ذِكْرَى الدَّارِ (46) وَإِنَّهُمْ عِنْدَنَا لَمِنَ الْمُصْطَفَيْنَ الْأَخْيَارِ (47) وَاذْكُرْ إِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَذَا الْكِفْلِ وَكُلٌّ مِنَ الْأَخْيَارِ (48)

“স্মরণ করুন, আমার বান্দা ইব্রাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুবের কথা যারা ক্ষমতা ও অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী ছিল।” (৩৮:৪৫)

“আমি তাদের এক বিশেষ গুণ তথা পরকালের স্মরণ দ্বারা স্বাতন্ত্র্য দান করেছিলাম।” (৩৮:৪৬)

“নিঃসন্দেহে তারা আমার কাছে মনোনীত ও সৎলোকদের অন্তর্ভুক্ত।” (৩৮:৪৭)

“স্মরণ করুণ, ইসমাইল, আল ইয়াসা ও যুলকিফলের কথা। তারা প্রত্যেকেই সৎকর্মশীল।” (৩৮:৪৮)

এই চার আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সংক্ষেপে ছয়জন নবীর কথা বর্ণনা করে বলেছেন: তাঁরা ছিলেন আল্লাহর সৎকর্মশীল বান্দা। মহান আল্লাহ তাদেরকে সব রকম অপবিত্রতা থেকে মুক্ত রেখে সর্বোচ্চ নিষ্ঠাবান বান্দার মর্যাদা দান করেছিলেন। এখানে এসব নবীর প্রথম যে বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে তা হচ্ছে তারা ছিলেন আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা। অর্থাৎ বেশি বেশি আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করার মাধ্যমে তারা এই মর্যাদা লাভ করেছিলেন। শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রেই যে তারা অগ্রগামী ছিলেন তা নয় সেইসঙ্গে তারা আল্লাহর প্রতিটি আদেশ ও নিষেধের সামনে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পন করেছিলেন। অথচ সাধারণ মানুষ আল্লাহর আদেশ-নিষেধের চেয়ে নিজের মনের বাসনা পূর্ণ করার দিকে বেশি মনোযোগী হয় এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলতে গেলে তারা অনেক মনোকষ্টে ভোগে।

কিন্তু ঐশী পুরুষরা সব সময় আল্লাহর আদেশ-নিষেধকে নিজেদের মনোবাসনার উপরে স্থান দেন। তাঁরা প্রবল আকর্ষণ নিয়ে আল্লাহর আদেশ পালন করেন এবং এ কাজ করতে পেরে তাঁরা গর্ববোধ করেন।  স্বাভাবিকভাবেই এ পর্যায়ে উপনীত হওয়ার জন্য একজন মানুষকে প্রচণ্ড রকমের চেষ্টা ও সাধনা করতে হয়। মনের ইচ্ছা ও জৈবিক চাহিদাকে সম্পূর্ণভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে হয়। এরকম চেষ্টা ও সাধনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে তবেই নবী-রাসূলরা আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে এত উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছেন।

এই চার আয়াতে আল্লাহর বান্দেগির পর নবীদের পরবর্তী যে বৈশিষ্ট্যটি বর্ণনা করা হয়েছে তা হলো তাদের প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টি।  এ ছাড়া, দায়িত্ব শনাক্ত করার জন্য নবীদের উচ্চ মাত্রার উপলব্ধি ক্ষমতা ও অন্তর্দৃষ্টি এবং নিজ অনুসারীদের নিয়ে আল্লাহর পথে অগ্রসর হওয়ার ক্ষমতাও এসব আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।  

পাশাপাশি এসব আয়াতে পার্থিব জীবনের মোহ কাটিয়ে আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দায় পরিণত হওয়ার জন্য কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।  এছাড়া, এসব আয়াতে দুইবার একথা উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবী-রাসূলগণ ছিলেন আল্লাহর মনোনিত ও সৎকর্মশীল বান্দা।

এই চার আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেয়ার জন্য পবিত্র কুরআনে নবী-রাসূল ও তাদের জাতিগুলোর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে।

২- নবী-রাসূলগণ একনিষ্ঠ চিত্তে আল্লাহর ইবাদত করে ইনসানে কামেল বা পরিপূর্ণ মানবে পরিণত হয়েছিলেন।

৩- পার্থিব জীবনের মায়া ত্যাগ ও সারাক্ষণ কিয়ামতকে স্মরণ করার মাধ্যমে যেকোনো মানুষ গুনাহমুক্ত জীবন যাপন করতে পারে। এটি করতে পারলে মানুষের অন্তর্দৃষ্টিও খুলে দেন আল্লাহ তায়ালা।#