আগস্ট ৩১, ২০২০ ১৬:৫০ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সোয়াদের ৪৯ থেকে ৫৮ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৪৯ থেকে ৫১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

هَذَا ذِكْرٌ وَإِنَّ لِلْمُتَّقِينَ لَحُسْنَ مَآَبٍ (49) جَنَّاتِ عَدْنٍ مُفَتَّحَةً لَهُمُ الْأَبْوَابُ (50) مُتَّكِئِينَ فِيهَا يَدْعُونَ فِيهَا بِفَاكِهَةٍ كَثِيرَةٍ وَشَرَابٍ (51)

“এ এক (মহৎ) আলোচনা। খোদাভীরুদের জন্য রয়েছে উত্তম ঠিকানা।” (৩৮:৪৯)

“তথা স্থায়ী বসবাসের জান্নাত; যার দ্বার তাদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।” (৩৮:৫০)

“সেখানে তারা (সিংহাসনে) হেলান দিয়ে বসবে (এবং) তারা সেখানে চাইবে অনেক ফল-মূল ও পানীয়।” (৩৮:৫১)

আজকের এই তিন আয়াতের শুরুতে আগের আয়াতগুলোর উপসংহার টেনে বলা হচ্ছে: অতীতের জাতিগুলোর ইতিহাস বর্ণনা করার উদ্দেশ্য মানুষকে মনে করিয়ে দেয়া বা সতর্ক করা। কারণ, কুরআন নাজিলের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে তার দায়িত্ব-কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাকে সতর্ক করা।  আয়াতের পরের অংশে বলা হচ্ছে: শুধুমাত্র নবী-রাসূলগণ আল্লাহর দয়ালাভে ধন্য হবেন না বরং যারা তাকওয়া অবলম্বন করবে তাদের সবাই উত্তম প্রতিদান লাভ করবে। পার্থিব জীবনে তারা যে কষ্ট ভোগ করেছেন কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার পুরস্কার প্রদান করবেন। হালাল-হারাম মেনে চলতে গিয়ে তারা দুনিয়ায় যেসব আরাম-আয়েশ ও ইন্দ্রিয়সুখ ত্যাগ করেছেন কিয়ামতের দিন তাদেরকে সেসব আরাম-আয়েশ শত সহস্রগুণ বেশি প্রদান করা হবে। 

পার্থিব জীবনের সুখ ও আরাম-আয়েশ ক্ষণস্থায়ী এবং রোগব্যাধি ও মৃত্যুর মাধ্যমে তা মানুষের হাতছাড়া হয়ে যায়। কিন্তু পরকালে জান্নাতের সুখের শুরু থাকবে কিন্তু শেষ থাকবে না। সেখানে মানুষ হবে অমর।

এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১- অতীতের ইতিহাস আমাদের জন্য বিনোদনের কোনো মাধ্যম নয় বরং তাতে আমাদের জন্য রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

২- মানুষ কত বছর বেঁচে থাকল তা গুরুত্বপূর্ণ নয়;বরং তার মৃত্যু কিভাবে হলো সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। তাকওয়া অবলম্বন করলে মানুষের শেষ পরিণতি সুন্দর হয়। মহান আল্লাহ শুধুমাত্র মুত্তাকি বা তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুন্দর পরিণতির সুসংবাদ দিয়েছেন।

৩-  জান্নাতবাসীর জন্য আল্লাহর রহমতের দরজা সব সময় খোলা এবং সেখানে চাওয়ামাত্র তাদের জন্য সবকিছু হাজির করা হবে।

সূরা সোয়াদের ৫২ থেকে ৫৪ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَعِنْدَهُمْ قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ أَتْرَابٌ (52) هَذَا مَا تُوعَدُونَ لِيَوْمِ الْحِسَابِ (53) إِنَّ هَذَا لَرِزْقُنَا مَا لَهُ مِنْ نَفَادٍ (54)

“তাদের পাশে থাকবে সমবয়স্কা স্ত্রীগণ যাদের দৃষ্টি থাকবে শুধুমাত্র তাদের স্বামীদের দিকে।” (৩৮:৫২)

“তোমাদেরকে এরই প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে বিচার দিবসের জন্য।” (৩৮:৫৩)

“প্রকৃতপক্ষে এটা আমার দেয়া রিযিক যা (কোনোদিন) শেষ হবে না।” (৩৮:৫৪)

আগের আয়াতগুলোতে জান্নাতের কিছু নেয়ামত বর্ণনা করার পর এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: মানুষের জীবনে স্ত্রীর প্রয়োজনীয়তা কখনো শেষ হয়ে যায় না বরং জান্নাতেও তাদের স্ত্রীর প্রয়োজন হবে। বলা হচ্ছে: জান্নাতী পুরুষদেরকে অপরূপ সুন্দরী ও পুতপবিত্র সমবয়সী স্ত্রী দান করা হবে যারা নিজেদের স্বামী ছাড়া আর কারো দিকে দৃষ্টিপাত করবে না। পার্থিব জীবনে যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছেন অর্থাৎ প্রতিটি কাজ করার সময় যাদের অন্তরে আল্লাহভীতি কাজ করেছে তারাই এই পুরস্কার পাবেন। আল্লাহ তায়ালার এ প্রতিশ্রুতি সত্য।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে:

১- উত্তম স্ত্রীর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি স্বামী ছাড়া আর কারো প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবেন না। তার অন্তরে স্বামী ছাড়া আর কারো স্থান হবে না।

২- পার্থিব জীবনে তাকওয়া অবলম্বনের জন্য পরকালে যে পুরস্কার পাওয়া যাবে তা হবে চিরস্থায়ী।

৩- মানুষের পরকাল হবে শারিরীক।  কিয়ামতের দিন পার্থিব জীবনের মতো শরীর নিয়েই মানুষের পুনরুত্থান হবে। জান্নাতিরা সেখানে বিভিন্ন ধরনের ফলমূল ও সুস্বাদু পানীয় কামনা করবে। সেইসঙ্গে তাদের চিত্তসুখ মেটানোর জন্য থাকবে পরমাসুন্দরী স্ত্রীগণ।

এই সূরার ৫৫ থেকে ৫৮ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে বলা হয়েছে:

هَذَا وَإِنَّ لِلطَّاغِينَ لَشَرَّ مَآَبٍ (55) جَهَنَّمَ يَصْلَوْنَهَا فَبِئْسَ الْمِهَادُ (56) هَذَا فَلْيَذُوقُوهُ حَمِيمٌ وَغَسَّاقٌ (57) وَآَخَرُ مِنْ شَكْلِهِ أَزْوَاجٌ (58)

“এটা (জান্নাতিদের পুরস্কার) এবং সীমা লঙ্ঘনকারীদের জন্যে রয়েছে নিকৃষ্ট ঠিকানা।” (৩৮:৫৫)

“তথা জাহান্নাম। তারা সেখানে প্রবেশ করবে।  কত নিকৃষ্ট সেই আবাসস্থল।” (৩৮:৫৬)

“এটা উত্তপ্ত পানি ও পুঁজ; যা তাদেরকে আস্বাদন করতে হবে।” (৩৮:৫৭)

“(এবং তাদের জন্য রয়েছে) এ ধরনের আরও কিছু শাস্তি।” (৩৮:৫৮)

পবিত্র কুরআনের অসংখ্য জায়গায় পুন্যবান ও পাপী ব্যক্তিদের পরিণতির কথা পাশাপাশি বর্ণনা করা হয়েছে যাতে মানুষ দু’টির মধ্যে তুলনা করে নিজের জন্য একটি পথ বেছে নিতে পারে। এখানেও জান্নাতিদের নানা রকম নেয়ামতের কথা বর্ণনা করার পর বলা হচ্ছে: কিন্তু যারা সীমা লঙ্ঘন করেছে পরকালে তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি। জান্নাতিদের সুস্বাদু পানীয়’র পরিবর্তে সীমা লঙ্ঘনকারীরা পান করবে ফুটন্ত পানি ও পুঁজ। তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম যেখান সব অপরাধী ও পাপী ব্যক্তিকে থাকতে দেয়া হবে। তাদের শরীর থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বের হবে। অবশ্য তাদের শাস্তি শুধু ফুটন্ত পানি ও পুঁজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাদেরকে নানা রকমের শাস্তি এমনভাবে দেয়া হবে যাতে তারা এক মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে থাকতে না পারে।

এই চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- মানুষকে দূরদর্শী চিন্তা নিয়ে জীবনের জন্য সঠিক পথ বাছাই করতে হবে এবং মহান আল্লাহর নির্দেশাবলী মেনে চলার ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না।

২- পুরস্কারের মতো আল্লাহ তায়ালার শাস্তিও হবে নানা ধরনের। এ কারণে জাহান্নামবাসী কখনো একদণ্ড স্বস্ত্বিতে থাকতে পারবে না।

৩- দুনিয়ার কিছুক্ষণের জীবনে ফুর্তি ও আরাম-আয়েশ করতে গিয়ে আমরা যেন পারলৌকিক স্থায়ী জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য হারিয়ে না বসি সেদিকে আমাদেরকে বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে।#