কুরআনের আলো
সূরা সোয়াদ: আয়াত ৫৯-৬৬ (পর্ব-১১)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সোয়াদের ৫৯ থেকে ৬৬ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৫৯ থেকে ৬১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
هَذَا فَوْجٌ مُقْتَحِمٌ مَعَكُمْ لَا مَرْحَبًا بِهِمْ إِنَّهُمْ صَالُوا النَّارِ (59) قَالُوا بَلْ أَنْتُمْ لَا مَرْحَبًا بِكُمْ أَنْتُمْ قَدَّمْتُمُوهُ لَنَا فَبِئْسَ الْقَرَارُ (60) قَالُوا رَبَّنَا مَنْ قَدَّمَ لَنَا هَذَا فَزِدْهُ عَذَابًا ضِعْفًا فِي النَّارِ (61)
“এই তো একদল (যারা তোমাদের অনুসারী ছিল তারা) তোমাদের সাথে জাহান্নামে প্রবেশ করছে। (তারা জবাবে বলবে) তাদের জন্য অভিনন্দন নেই, কারণ তারা তো জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (৩৮:৫৯)
“(তখন অনুসারীরা নেতাদের) বলবে, বরং তোমাদের জন্য অভিনন্দন নেই। তোমরাই আমাদেরকে আগে থেকে এ বিপদের সম্মুখীন করেছ এবং এটি কতই না ঘৃণ্য আবাসস্থল।” (৩৮:৫৯)
“এবং তারা বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! যে আমাদেরকে এই আজাবের সম্মুখীন করেছে, আপনি জাহান্নামে তার শাস্তি দ্বিগুণ করে দিন।” (৩৮:৬০)
এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: জাহান্নামের অধিবাসীরা সেখানে তাদের পরে আগমনকারীদের স্বাগত জানাতে চাইবে না। বরং তারা তাদেরকে ভর্ৎসনা করবে। সেদিন পাপাচারে লিপ্ত নেতারা এই কঠিন পরিণতির জন্য তাদের অনুসারীদের দায়ী করবে এবং অনুসারীরা দায়ী করবে নেতাদের। এ সময় জাহান্নামের রক্ষীরা নেতাদের বলবে: এরা পার্থিব জীবনে তোমাদের অনুসারী ছিল বলে আজ তোমাদের সঙ্গে তারাও জাহান্নামবাসী হয়েছে। দুনিয়াতে তারা যেমন তোমাদের অনুসারী ছিল আজ জাহান্নামেও তারা তোমাদের অনুসারী হয়েছে। এখন দুই দল একসঙ্গে আগুনে জ্বলবে।
এটি একটি সাধারণ প্রথা যে, কোথাও নতুন কেউ প্রবেশ করলে যারা সেখানে আগে থেকে ছিল তারা নতুনদের স্বাগত জানায়। কিন্তু জাহান্নামে আগে প্রবেশকারী পাপাচারী নেতারা নবাগতদের বলবে: জাহান্নামে তোমাদের স্বাগত জানানো হবে না। অন্যদিকে অনুসারীরা তাদের নেতাদের বলবে: তোমাদেরকেও স্বাগত জানানো হবে না। তোমাদের কারণেই আমাদেরকে আজ এই কঠিন শাস্তিতে নিপতিত হতে হয়েছে। এরপর তারা তাদের নেতাদের জন্য আল্লাহর কাছে দ্বিগুণ শাস্তি কামনা করবে।
এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১- জাহান্নামবাসীদের একদল আরেকদলকে ভর্ৎসনা করবে। তারা সেদিনের ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য পরস্পরকে দায়ী করার পাশাপাশি একে অপরকে গালিগালাজ করবে।
২- কেউ নিজের গোনাহের ভার অন্যের কাধে চাপাতে পারবে না। কাফের ও মুশরিক নেতাদের অপরাধ বেশি এবং তারা বেশি শাস্তি ভোগ করলেও এর অর্থ এই নয় যে, তাদের অনুসারীরা সেদিন পার পেয়ে যাবে। বিবেক খাটিয়ে সত্য অনুসন্ধান না করে পাপাচারীদের অন্ধ অনুসরণ করার কারণে তারাও সেদিন জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
এই সূরার ৬২ থেকে ৬৪ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَقَالُوا مَا لَنَا لَا نَرَى رِجَالًا كُنَّا نَعُدُّهُمْ مِنَ الْأَشْرَارِ (62) أَتَّخَذْنَاهُمْ سِخْرِيًّا أَمْ زَاغَتْ عَنْهُمُ الْأَبْصَارُ (63) إِنَّ ذَلِكَ لَحَقٌّ تَخَاصُمُ أَهْلِ النَّارِ (64)
“তারা আরও বলবে, আমরা যাদেরকে মন্দ লোক বলে গণ্য করতাম, তাদেরকে কেন (জাহান্নামের আগুনে) দেখছি না।” (৩৮:৬২)
“আমরা কি (অহেতুক) তাদেরকে ঠাট্টার পাত্র করে নিয়েছিলাম, নাকি (তারা জাহান্নামেই আছে কিন্তু আমাদের) দৃষ্টি তাদের দিকে পড়ছে না?” (৩৮:৬৩)
“জাহান্নামীদের এই পারস্পরিক বাক-বিতণ্ডা অবশ্যম্ভাবী।” (৩৮:৬৪)
জাহান্নামবাসীরা পৃথিবীতে নিজেদেরকে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও শ্রেষ্ঠ মানুষ বলে মনে করত। তারা ভাবত, ঈমানদারদের বেশিরভাগ সমাজের গরীব ও নিম্নশ্রেণির মানুষ এবং তাদের জ্ঞান-বুদ্ধির অভাব রয়েছে। এসব মানুষকে নিয়ে ঠাট্টা-মস্করা করার সুযোগ তারা হাতছাড়া করত না।
এই তিন আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হচ্ছে: তারা জাহান্নামে প্রবেশ করে ভাবতে থাকবে তাদের মতো সেই ঠাট্টার শিকার মুমিন ব্যক্তিরাও বুঝি জাহান্নামেই তাদের পাশে থাকবে। কিন্তু তাদেরকে দেখতে না পেয়ে তারা বলবে, তাহলে কি দুনিয়াতে আমরা তাদেরকে অহেতুক ঠাট্টা করতাম এবং তারা কি এখন জান্নাতে চলে গেছে? নাকি তারা আমাদেরই চারপাশে আছে কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি না?
এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. পৃথিবীতে মানুষের উপহাসের পাত্র হওয়া বহু মানুষ কিয়ামতের দিন জান্নাতে চলে যাবে। অন্যদিকে যারা তাদেরকে নিয়ে ঠাট্টা করত তারা জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে।
২. আমরা যেন পৃথিবীতে কারো বাহ্যিক চেহারা ও বেশভুষা দেখে তার সম্পর্কে মন্তব্য না করি। আজ যাকে আমাদের চোখে নীচু শ্রেণির মানুষ বলে মনে হচ্ছে কাল কিয়ামতের ময়দানে তার অনেক উঁচু মর্যাদা হতে পারে।
এই সূরার ৬৫ ও ৬৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক বলেছেন:
قُلْ إِنَّمَا أَنَا مُنْذِرٌ وَمَا مِنْ إِلَهٍ إِلَّا اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ (65) رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا الْعَزِيزُ الْغَفَّارُ (66)
“বলুন, আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র এবং মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই।” (৩৮:৬৫)
“তিনি আসমান-যমীন ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সব কিছুর পালনকর্তা, পরাক্রমশালী এবং মার্জনাকারী।” (৩৮:৬৬)
জাহান্নামবাসীদের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কিত আয়াতগুলোর শেষে এই দুই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে উদ্দেশ করে বলছেন: আপনি কাফির, মুশরিক ও তাদের নেতাদের বলে দিন: আমি তোমাদেরকে সতর্ক করছি এবং অতীতের মানুষদের পরিণতি থেকে শিক্ষা নিয়ে কুফর ও শিরক পরিত্যাগ করার আহ্বান জানাচ্ছি। তোমরা জেনে রাখো, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই। তিনি মহাপরাক্রমশালী এবং তার সামনে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাধ্য কারো নেই। তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং এগুলোর মধ্যবর্তী গোটা বিশ্বজগত পরিচালনা করছেন। তবে মহাপরিক্রমের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তওবাকারী গুনাহগার বান্দাকে তিনি ক্ষমা করে দেন। তাঁর চেয়ে বড় ক্ষমাকারী আর কেউ নেই।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি বিষয় হচ্ছে:
১- মানুষকে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়ার পাশাপাশি জাহান্নামের ব্যাপারে সাবধান করে দিতে হবে। অন্তরে জাহান্নামের ভয় না থাকলে মানুষের পক্ষে বেশিরভাগ সময় দ্বীনের পথে থাকা কঠিন হয়ে যায়।
২- গোটা বিশ্বজগত এক আল্লাহর ইচ্ছায় পরিচালিত হচ্ছে এবং এখানে তার সমকক্ষ আর কেউ নেই।
৩- আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতা ও শক্তির যেমন শেষ নেই তেমনি তাঁর দয়ার ভাণ্ডারও অপরিসীম। কাজেই গুনাহগার বান্দার জন্য তওবা করে তাঁর দিকে ফিরে আসার সুযোগ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খোলা থাকে। কিন্তু মৃত্যুর আলামত স্পষ্ট হয়ে গেলে আর তওবা কবুল হয় না।#