কুরআনের আলো
সূরা সোয়াদ: আয়াত ৭৫-৭৮ (পর্ব-১৩)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সোয়াদের ৭৫ থেকে ৭৮ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৭৫ ও ৭৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
قَالَ يَا إِبْلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ أَسْتَكْبَرْتَ أَمْ كُنْتَ مِنَ الْعَالِينَ (75) قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ (76)
“(আল্লাহ) বললেন, হে ইবলীস! আমি (নিজে আমার কুদরতি) হাতে যাকে সৃষ্টি করেছি, তার সম্মুখে সেজদা করতে তোকে কিসে বাধা দিল? তুমি অহংকার করলে, নাকি তুমি তার চেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন?”(৩৮:৭৫)
“সে বলল: আমি তার চেয়ে উত্তম; আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দ্বারা।” (৩৮:৭৫)
গত আসরে আমরা বলেছি, আল্লাহ তায়ালা প্রথম মানুষ হযরত আদমকে সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাদেরকে বলেন সিজদা করতে। এ সময় ইবলিস ছাড়া আর সব ফেরেশতা মাটির আদমকে সিজদা করে। এরপর এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: এ সময় মহান আল্লাহ রাগান্বিত স্বরে ইবলিসের কাছে নির্দেশ অমান্য করার কারণ জানতে চান। তিনি বলেন, তুমি কি নিজেকে আদমের চেয়ে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন মনে করো নাকি তোমার অহংকার ও আত্মম্ভরিতা তোমাকে সিজদা করা থেকে বিরত রাখল?
এ অবস্থায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে অনুশোচনা ও তওবা করার পরিবর্তে ইবলিস হযরত আদমকে নিজের চেয়ে নিকৃষ্ট হিসেবে বর্ণনা করে। সে দাবি করে আদম তার সিজদা পাওয়ার যোগ্য নয়। নিজের বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য সে যে বক্তব্য তুলে ধরে তা হচ্ছে: আমি জ্বিন জাতির এবং আমাকে আপনি আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আদম সামান্য মাটির তৈরি। আগুনের মর্যাদা অবশ্যই মাটির চেয়ে বেশি।
ইবলিসের এই তুলনামূলক বক্তব্য সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। প্রথমত, এই তুলনার কোনো ভিত্তি নেই। মাটির চেয়ে আগুনের মর্যাদা বেশি বলে দাবি করলেও সে এর পক্ষে কোনো যুক্তি বা দলিল উপস্থাপন করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, যদি ইবলিসের এই যুক্তি সত্য প্রমাণ করাও যায় তারপরও যখন আল্লাহ তায়ালা সিজদা করার নির্দেশ দিয়েছেন তখন সিজদা না করার অর্থ আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা। আর আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার পক্ষে কোনো দলিল বা যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। তৃতীয়ত, মাটি দিয়ে তৈরি করার কারণে আদমকে সিজদা করার নির্দেশ দেয়া হয়নি বরং আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আমি আদমের মধ্যে নিজের রুহ ফুঁকে দিয়েছি বলে তার মর্যাদা সবার চেয়ে উঁচু হয়ে গেছে; কাজেই তাকে সিজদা করো।
এই দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হলো:
১- বিচারের সময় যত বড় অপরাধীই হোক না কেন তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে যাতে সে নিজেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে যুক্তি তুলে ধরতে পারে।
২- অন্য সব কিছু সৃষ্টির সঙ্গে মানুষের সৃষ্টির মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। শুধু ভূপৃষ্ঠের উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলই নয় বরং আসমানের অদৃশ্য ফেরেশতা ও জিন জাতিও মর্যাদার দিক দিয়ে মানুষের সমকক্ষ নয়।
৩- আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ সুস্পষ্ট হয়ে গেলে তা মানুষের জন্য অবশ্যপালনীয় কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। এ সময় অযৌক্তিক কারণ বা ব্যাখ্যা তুলে ধরা যাবে না।
৪- যারা আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পন না করে তার নির্দেশ অমান্য করে তারা আসলে অহংকারী ও আত্মম্ভরী। অহংকারী মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
৫- বর্ণবাদী চিন্তাভাবনা বা নিজের বর্ণ ও সমাজকে অন্য সমাজের তুলনায় বড় মনে করা ইবলিসি মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
সূরা সোয়াদের ৭৭ ও ৭৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
قَالَ فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَجِيمٌ (77) وَإِنَّ عَلَيْكَ لَعْنَتِي إِلَى يَوْمِ الدِّينِ (78)
“আল্লাহ (ইবলিসকে) বললেন: বের হয়ে যা এখান থেকে। কারণ, তুই অভিশপ্ত।” (৩৮:৭৭)
“এবং তোর প্রতি আমার এ অভিশাপ বিচার দিবস পর্যন্ত স্থায়ী হবে।” (৩৮:৭৮)
ইবলিস ছিল জ্বিন জাতি থেকে আগত। কিন্তু সে অনেক বেশি আল্লাহর ইবাদত করে ফেরেশতাদের কাতারে শামিল হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। কিন্তু আদমকে সিজদা না করার ঘটনায় প্রমাণিত হয়, সে অনেক বেশি ইবাদত করলেও আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পন করেনি বরং সে তার নিজের খেয়ালখুশি মতো চলেছে। তার এই আচরণকে এমন ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করা যায় যে অনেক কষ্ট করে দুর্গম কোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে সক্ষম হলেও এক মুহূর্তের অসতর্কতার কারণে পাহাড়ের চূড়া থেকে সোজা পাহাড়ের পাদদেশে পতিত হয়। এখানে ইবলিস শুধু আল্লাহর দরবার থেকেই বহিস্কৃত হয়নি সেইসঙ্গে কিয়ামত পর্যন্ত তাকে আল্লাহ তায়ালার অভিশাপ বহন করতে হবে।
কারো কারো মনে এ প্রশ্ন জাগতে পারে, মাত্র একটি নির্দেশ অমান্য করার কারণে এত বড় শাস্তি হয়? তাও আবার আল্লাহকে সিজদা করার নির্দেশ অমান্য করার কারণে নয় বরং আদমকে সিজদা করার নির্দেশ পালন না করার কারণে। এ প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়: আল্লাহর নির্দেশ পালন না করা মস্তবড় গুনাহ বা অপরাধের কাজ। তারপর সেই অপরাধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা আরেক বেয়াদবি। পরবর্তীতে হযরত আদমও জান্নাতে আল্লাহর নির্দেশ সঠিকভাবে পালনে ব্যর্থ হন এবং নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ফেলেন। কিন্তু এই ঘটনায় ইবলিস ও আদমের মধ্যে পার্থক্য ছিল এই যে, হযরত আদম নিজের এই অপরাধের কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেননি; বরং তিনি সত্যিকার অর্থে কায়মনোবাক্যে তওবা করেছেন এবং নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার জন্য অনুতপ্ত হয়েছেন। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা তাঁর তওবা কবুলে করে তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
এই দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১- গর্ব, অহঙ্কার ও আত্মম্ভরিতা করলে মানুষ আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয় এবং তার মর্যাদা এত বেশি নীচে নেমে যায় যে, তার পক্ষে আর জান্নাতে প্রবেশ করা সম্ভব হয় না।
২- সমাজে যারা আল্লাহর অবাধ্যতা করে তাদের সঙ্গে বাকি মানুষের উচিত সম্পর্ক ছিন্ন করা। যেকোনো কাজের দায়িত্ব ঈমানদার ও পরহেজগার মানুষকে দেয়া উচিত।#
পার্সটুডে/এমএমআই/এআর/১৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।