সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২০ ১৫:২৫ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সোয়াদের ৭৯ থেকে ৮৩ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৭৯ ও ৮১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

قَالَ رَبِّ فَأَنْظِرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ (79) قَالَ فَإِنَّكَ مِنَ الْمُنْظَرِينَ (80) إِلَى يَوْمِ الْوَقْتِ الْمَعْلُومِ (81)

“ইবলিস বলল: হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমাকে (মানুষের) পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন।” (৩৮:৭৯)

“আল্লাহ বললেন: তোকে অবকাশ দেয়া হল।” (৩৮:৮০)

“সে সময় পর্যন্ত যা নির্ধারিত ও সুস্পষ্ট।”(৩৮:৮১)

গত আসরে আমরা বলেছি, আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে ইবলিস হযরত আদমকে সিজদা করতে অস্বীকার করে। এরপর সে অনুতপ্ত হয়ে ভুল স্বীকার করার পরিবর্তে আরেকটি অপরাধ করে। সে আদমের চেয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে আল্লাহর সঙ্গে তর্ক জুড়ে দেয়। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা তাকে ফেরেশতাদের দল থেকে বহিষ্কার করেন।

এরপর এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: ইবলিস শয়তান আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হওয়ার আগে কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকার এবং সে পর্যন্ত অবকাশ দেয়ার আবেদন জানায়। সে নিজের ভুল সংশোধন ও ক্ষমা লাভের আশায় এই অবকাশ চায়নি বরং আদম সন্তানদের পথভ্রষ্ট করে নিজের অভিশপ্ত হওয়ার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য এই অবকাশ চেয়েছে।

এটা ছিল ইবলিসের তৃতীয় অপরাধ। সে আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হওয়ার জন্য নিজেকে দায়ী করার পরিবর্তে হযরত আদমকে দায়ী করে এবং বলে: এই আদমের কারণে আজ আমি বিতাড়িত হলাম।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- দম্ভ ও অহংকারের কারণে ইবলিস আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা চাওয়ার পরিবর্তে প্রতিশোধ গ্রহণের লক্ষ্যে অবকাশ প্রার্থনা করে।

২- কোনো কোনো জীবকে দীর্ঘজীবন দান করা আল্লাহর জন্য অত্যন্ত সহজ কাজ।  পুন্যবান হোক অথবা পাপী- তিনি যাকে ইচ্ছা দীর্ঘজীবন দান করতে পারেন।

৩- আল্লাহ তায়ালা এবং কিয়ামতকে চিনতে না পেরে ইবলিস পথভ্রষ্ট হয়নি বরং এসব বিষয় ছিল তার কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। সে আত্মঅহমিকার কারণে নিজেকে আদমের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবে এবং এ কারণেই আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘন করে অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হয়।

সূরা সোয়াদের ৮২ ও ৮৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ (82) إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ (83)

“ইবলিস বলল, আপনার ইযযতের কসম, আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে বিপথগামী করে দেব।” (৩৮:৮২)

“তবে তাদের (মধ্যে) যারা আপনার খাঁটি বান্দা, তাদেরকে ছাড়া।” (৩৮:৮৩)

আল্লাহ তায়ালা ইবলিসকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অবকাশ দেয়ার পর শয়তান কসম খেয়ে জানায়, আদম সন্তানদের পথভ্রষ্ট করার জন্য সে এই সময় ও সুযোগ চেয়েছে। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য ইবলিস আল্লাহ তায়ালার ইজ্জতের কসম খায়। সে সকল মানুষকে পথভ্রষ্ট করার ঘোষণা দিয়ে প্রকারান্তরে সর্বোচ্চ পর্যায়ের দম্ভ প্রকাশ করে আল্লাহর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। সেইসঙ্গে সে মাটির মানুষকে অত্যন্ত দুর্বল ও অক্ষম বলে মনে করে। তবে কুরআনের অন্য বহু জায়গায় আল্লাহ বলেন, যারা শয়তানের অনুসরণ করবে তারাই শুধু পথভ্রষ্ট হবে এবং ইবলিস কাউকে পথভ্রষ্ট করতে বাধ্য করতে পারবে না। কাজেই  দেখা যাচ্ছে, মানুষ নিজের পথ বাছাই করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন। সে ইচ্ছা করলেই শয়তানের প্ররোচনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে। সূরা সাবা’র ২০ নম্বর আয়াতে যেমনটি বলা হয়েছে, মুমিনদের একটি দল শয়তানের অনুসরণ করে না।

সার্বিকভাবে সব আল্লাহর বান্দাকে পথভ্রষ্ট করার হুমকি দেয়ার পর ইবলিস নিজেও একথা স্বীকর করে যে, আল্লাহ তায়ালার খাঁটি বান্দাদের কাছে সে ঘেঁষতে পারবে না এবং তাদেরকে কোনোরকম ধোকা দেয়ার ক্ষমতাও তার থাকবে না। নবী-রাসূল ও আউলিয়াগণ  আল্লাহ তায়ালার খাঁটি বান্দা। তাঁরা সব ধরনের গোনাহ থেকে মুক্ত। তাদের ছাড়া অন্য মানুষদের মধ্যে যে যতখানি দুনিয়ার মোহ থেকে দূরে থাকতে পারবে সে ততখানি শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচতে পারবে।

আল্লাহ তায়ালা কেন মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য ইবলিসকে সুযোগ দিলেন সে সম্পর্কে নানা ধরনের বক্তব্য রয়েছে। তবে সবাই যে উপসংহারে পৌঁছেছেন তা হলো- মানুষকে আল্লাহ স্বাধীনভাবে সৃষ্টি করেছেন।  সামনে নানা ধরনের পথ খোলা থাকা অবস্থায় তার যেকোনো একটি বেছে নেয়ার ক্ষমতা আছে বলেই সে স্বাধীন। অন্যদিকে মহান আল্লাহ চান মানুষ পূর্ণতায় পৌঁছাক। পূর্ণতায় পৌঁছাতে হলে মানুষকে চেষ্টা, সংগ্রাম করতে হবে এবং শয়তানের প্ররোচনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। লেখাপড়া ও জ্ঞান শিক্ষা করার জন্য যেমন মানুষকে আরাম-আয়েশ পরিত্যাগ করে কষ্টসাধ্য জীবন বেছে নিতে হয় তেমনি আত্মিক উন্নতি লাভের জন্যও তাকে ঋপুর চাহিদা পূরণের পরিবর্তে প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

ইবলিসের প্রধান কাজই হচ্ছে, সারাক্ষণ মানুষের প্রবৃত্তির চাহিদা ও ঋপুর তাড়নাকে উসকে দেয়া। এ অবস্থায় কিছু দুর্বল চিত্তের মানুষ শয়তানের ধোকায় পড়ে যায় এবং কেউ কেউ আরেক ধাপ অগ্রসর হয়ে নিজেই শয়তানের বাহিনীতে নাম লেখায়। কিন্তু এরকম কঠিন পরিস্থিতিতে চরম ধৈর্য্য অবলম্বন করে যারা কিয়ামতের ভয়াবহ বিপদের কথা স্মরণ করতে এবং প্রবৃত্তির তাড়না থেকে বাঁচতে পারবে তারাই সফলকাম। আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করে রেখেছেন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মানুষকে শয়তানের ধোকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়। সে যেন কখনোই নিজেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিরাপদ না ভাবে।  শয়তান আল্লাহর ইজ্জতের কসম খেয়ে সব মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে কোমর বেধে নেমেছে।  

২- ছোট ছোট গোনাহ সাধারণত অনেক বড় গোনাহর পথ উন্মুক্ত করে দেয়। কাজেই আমাদেরকে ছোট গোনাহ থেকেও বেঁচে থাকতে হবে।

৩- ইবলিসের ধোকা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় হচ্ছে অন্তর থেকে আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছুকে মুছে ফেলা এবং একনিষ্ঠ চিত্তে আল্লাহর ইবাদত করা। মৃত্যু এবং কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা মনে করেও শয়তানের ধোকা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।  আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তৌফিক দান করুন।  #

পার্সটুডে/এমএমআই/এআর/১৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।