নতুন কমিশনের ধারাবাহিক সংলাপের দ্বিতীয় দিন
দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়: নির্বাচন কমিশনের সংলাপে বিশিষ্টজনেরা
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কর্মপদ্ধতি নির্ধারণের উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশনের ডাকা সংলাপে অংশ নিয়ে বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে এবং দলগুলোর আস্থা অর্জন করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে সক্ষমতার পরিচয় দিতে হবে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনের সভাকক্ষে বিশিষ্ট নাগরিককে সাথে সংলাপে বসেছিল । নতুন কমিশনের ধারাবাহিক সংলাপের দ্বিতীয় দিনে ৩৯ জন বিশিষ্ট নাগরিককে আমন্ত্রণ জানানো হলেও এতে অংশ নিয়েছেন ১৯ জন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের সভাপতিত্বে সংলাপে অংশগ্রহণকারী বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্যে ছিলেন— টি আই বি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ট্রাষ্টি ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন , সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুবায়েত ফেরদৌস, লিডারশীপ স্টাডিজ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. সিনহা এম এ সাঈদ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, বাংলাদেশ ইনডিজিনিয়াস পিপলস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, উন্নয়ন ও মানবাধিকার নেত্রী খুশী কবির প্রমুখ।
কী বলেছেন অংশীজনেরা
আলোচনায় অংশ নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার ও আস্থা অর্জনে অন্যতম পরিমাপক হবে কমিশনের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সরকারি আনুগত্য ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে তার অবস্থান ও কর্মকাণ্ডে নিজেকে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কতটুকু প্রমাণ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে, সরকারি আনুগত্যমূলক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান পরিহার করে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের চর্চা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কমিশনের দায়িত্ব পালনে যে আইন ও বিধিমালা রয়েছে, তা পর্যাপ্ত কি-না, তা বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের প্রস্তাব করুন। এ ক্ষেত্রে, এমন প্রস্তাব বিবেচিত হতে পারে যেন নির্বাচনকালীন সরকার, জনপ্রতিনিধি হিসেবে অধিষ্ঠিত থেকে নির্বাচন করা, এ ধরনের বিতর্কিত বিষয়ে সমঝোতা অর্জন সম্ভব হয়।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, গণসংহতি আন্দোলনের নিবন্ধন হয়নি, হাইকোর্টেরও রায় হয়েছে। আমাদের আবেদন থাকবে আপনারা দ্রুত ছেড়ে দেন। রাজনীতিতে সৎ লোককে আনতে হবে। অনেক বেশি অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।
নির্বাচনে খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, আমার মতে খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার পথে কোনো বাধা থাকা উচিত নয়। উনি নির্বাচন করতে পারবেন। কেননা, উনার মামলার ফয়সালা এখনো হয়নি। আমি সব সময় বলেছি জামিন পাওয়া উনার অধিকার। ছয় মাসের এই খেলা দেখানো ঠিক নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন জানান, ভোটের আগে-পরে ৬ মাস নির্বাচনকালীন কর্তৃত্ব কমিশনের কাছে থাকা উচিত। ২০২৩ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর থেকে একাদশ সংসদের অধিবেশন থাকবে না। এ জন্য ভোটের আগে চার মাস, ভোটের পরে দুই মাস- এই ৬ মাসের জন্য ক্ষমতা ইসির হাতে থাকতে পারে। আস্থা অর্জন করতে পারলে সবাইকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ ভোট করা সম্ভব।
সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ভোটাররা নির্বাচন-বিমুখ হয়ে পড়েছে। ইসি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অতীতের ভুলভ্রান্তি স্বীকার করে কাজ এগিয়ে নিতে হবে। ক্ষমতায় থেকে নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। গত দু’টি নির্বাচনে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করার বিষয়টি সরকার প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন এককভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে না। নির্বাচনকালীন সরকার, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন অংশীজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। যেহেতু আইনগতভাবে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এ সকল প্রতিষ্ঠান নির্বাচনকালে সুনির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত, সেজন্য কমিশনকেই সৎসাহসের সঙ্গে যথাযথভাবে তাদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য আগ্রহী সকল দেশি-বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাকে অবাধে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নির্ভরযোগ্য সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণ উপেক্ষা করে ঢালাওভাবে ব্যাপক বিতর্কিত নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পেরেছি-এরূপ অবাস্তব দাবি করা ও বিব্রতকর অস্বীকারের চর্চা পরিহার করতে হবে। নিজেকে আয়নার মুখোমুখি করে, ব্যর্থতার ক্ষেত্রে দায় স্বীকারের সৎসাহসের পরিচয় দিতে হবে।
ভিন্ন এক অনুষ্ঠানে নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপি’র মনোভাব পুনর্ব্যক্ত করে দলের মহাসচিব বলেছেন, আমরা আগেও বলেছি বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠ নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। ইসি’র সাথে সংলাপে তারা যাবে না।
গতকালের সংলাপ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, ‘যারা ডিক্লেয়ার করে দিয়েছেন নির্বাচনে অংশ নেবেন না, কিন্তু তাদের অংশগ্রহণ করাটা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কীভাবে আস্থায় আনা যায়, আমন্ত্রণ জানিয়ে ভদ্রভাবে আসার কথা বলে, তাদের কিছুটা পরিবর্তন করা যায় কি না- সেই আলোচনা এসেছে। কমিশনকে সাহসী হতে হবে। সাহসের সঙ্গে সততাও থাকতে হবে।’
কাজী হাবিবুল আউয়াল আরও বলেন, ‘যে দল সরকারে থাকে তাদের কিছুটা বাড়তি এডভান্টেজ থাকে। কারণ, প্রশাসন, পুলিশ সবই তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। ইসি তাদের ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে, সেটাই ব্যাপার। আইনের কোনো অভাব নেই। কিন্তু প্রয়োগের দিক থেকে বাস্তব ঘাটতি রয়েছে। আমরা এনফোর্সমেন্টটা যেন ভালোভাবে করতে পারি, সেটা চেষ্টা করবো। এনফোর্সমেন্ট ক্যাপাসিটি আরও বাড়াতে পারলে তৃণমূলে ভোটারদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি হয়। তাহলে কেন্দ্রে কেন্দ্রে গণ্ডগোল হবে না; আমরা অনুকূল পরিবেশ পাব।’
এর আগে সংলাপের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন কাজী হাবিবুল আউয়াল। বিশিষ্টজনদের উদ্দেশে সিইসি বলেন, ‘ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ভোটাররা ভোট দিতে না পারলে, বাধা এলে, পোলিং অফিসারদের কেন্দ্র থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয় না। নির্বাচনটা অসম প্রতিযোগিতার হয়ে যায়। ভোটে সহিংসতার ব্যাপকতা থাকলে, ভোটাররা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এটা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ এসেছে।’
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের প্রসঙ্গ টেনে কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘এটা একটা কষ্টসাধ্য কাজ। আমাদের চেষ্টা করতে হবে। আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, আমরা চেষ্টা করবো।’#
পার্সটুডে/এমএএইচ/২৩