বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনার ঝড়
-
ড. এ কে আব্দুল মোমেন
শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে যা যা করা দরকার, তা করতে ভারতবর্ষের সরকারকে অনুরোধ করেছি- এমন স্বীকারোক্তির পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এখন রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতকে অনুরোধ আওয়ামী লীগ করে না, করেনি। শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকেও কাউকে এমন দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। যিনি (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) এ কথা বলেছেন, সেটা তার ব্যক্তিগত অভিমত হতে পারে। সেটা আমাদের সরকারের বক্তব্য না, দলেরও না।
এদিকে, বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আজ (শনিবার) অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না, যারা অন্যে দেশে আনুকূল্যে নিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকে তাদের এ দেশ শাসন করার কোনো অধিকার নেই।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম শহরের জে এম সেন হলে জন্মাষ্টমী উৎসবের অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারকে টিকিয়ে রাখতে যা যা করা দরকার, সেটি করতে ভারতবর্ষ সরকারকে অনুরোধ করছি।’ তার এমন মন্তব্যের পর দেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
আজ (শনিবার) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে মির্জা ফখরুল বলেন, দেশের মানুষ যুদ্ধ করে নিজেদের স্বাধীন করেছে এবং নিজেদের স্বাধীন বলে পরিচয় দিতে গর্ব বোধ করে। আর আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সরকারের নিকট সাহায্য চান শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার জন্য। অর্থাৎ তারা এ কথা বলতে চান যে, ভারত সরকারের আনুকূল্যে এই সরকার টিকে আছে।'
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আজকে একটা লুটেরা শ্রেণি ভালো আছে। এরা হচ্ছে- আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা পর্যন্ত; আমলা, আমি দুঃখের সঙ্গে বলতে চাই, আরও আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু উচ্ছিষ্টভোগী শিক্ষক, কিছু বুদ্ধিজীবী। তারাও যখন টকশোতে গিয়ে যেভাবে কথা বলেন তাতে মনে হয় দেশের মানুষ পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ভাষায় বেহেশতে আছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সব কিছুর সংকটের মূলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। আওয়ামী লীগ জোর করে, বিনা ভোটে, নির্বাচিত না হয়ে শুধুমাত্র রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে তারা আজকে ক্ষমতা দখল করে বসে আছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে সরিয়েছিলাম, নব্বইয়ের অভ্যুত্থানে যেভাবে স্বৈরাচারকে সরানো হয়েছিল, এখন আমাদের দায়িত্ব জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ ধ্বংসকারী এই ফ্যাসিস্ট সরকারকে সরিয়ে একটা সত্যিকার অর্থে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিতর্কিত বক্তব্যের দায়ভার আওয়ামী লীগ নেবে না
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের বিতর্কিত মন্তব্যে বিব্রত ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে। দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান আজ বলেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন আওয়ামী লীগের কেউ না। তার বক্তব্যের দায়ভার আওয়ামী লীগ নেবে না।
এ প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এই সদস্য বলেন, আজ (শনিবার) দুপুরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ১৫ আগস্ট উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনাসভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রামে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত প্রসঙ্গে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা আওয়ামী লীগের দলীয় বক্তব্য নয়। আওয়ামী লীগ জনগণের দল। সুতরাং কোনো দেশের সমর্থনে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসা নির্ভর করে না। তিনি বলেন, আমাদের দল সবসময় মনে করে ভারত আমাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও পরীক্ষিত বন্ধু। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে তাদের অবদান আমরা কোনো অবস্থাতেই ভুলতে পারব না।
অপরদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে কাউকে ক্ষমতা দেওয়া হয়নি, দায়িত্ব দেওয়া হয়নি পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের কাছ থেকে কোনো সাহায্য নিতে। আওয়ামী লীগ হচ্ছে স্বদেশ নির্ভর দল। আওয়ামী লীগ মাটি ও মানুষে বিশ্বাস করে। বিদেশ নয়, দেশের মানুষই আওয়ামী লীগের শক্তি।
আজ (শনিবার) দুপুরে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি বলেন, যদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিছু বলে থাকেন তাহলে সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার, এটা কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের বক্তব্য নয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ষড়যন্ত্রমূলক ও অমর্যাদাকর: আবদুর রব
এর আগে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে ষড়যন্ত্রমূলক ও অমর্যাদাকর দাবি করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী চক্রান্তে জড়িয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর সাংবিধানিক শপথ ভঙ্গ করেছেন। মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনে অযোগ্য হয়ে পড়েছেন তিনি। তাঁর ওই বক্তব্যে সরকার জনগণের সমর্থন ও সম্মতি ছাড়াই যে আবারও রাষ্ট্র ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চায়, সেই চক্রান্তের ব্লু প্রিন্ট উন্মোচিত হয়েছে।’
শুক্রবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে আ স ম রব আরও বলেন, ‘ক্ষমতায় টিকে থাকতে ভারতের কাছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই হীন আকুতি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বার্থ ও মর্যাদার পরিপন্থি। তাঁর বক্তব্য সরকারের অবস্থানের প্রতিফলন। এই অবস্থানের কারণে সরকারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে।’
সরকারের পায়ের তলায় মাটি নেই: মান্না
অপরদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ‘সরকারের পায়ের তলায় মাটি নেই। এ জন্য ক্ষমতায় টিকে থাকতে তারা বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের জন্য অনুরোধ করছে।’
শুক্রবার এক বিবৃতিতে মান্না আরও বলেন, ‘সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অন্য দেশের সঙ্গে দেন-দরবার করলেও জনগণের কাছে আসে না। তারা যে জনগণের রায়ের তোয়াক্কা করে না, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে তা আবারও স্পষ্ট হলো।’ তিনি বলেন, ‘সাহস থাকলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতায় থাকতে জনগণের সামনে আসেন।’
মান্না বলেন, ‘কিছুদিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে অনুরোধ করেছেন- তারা যেন বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যবস্থা করে। আর এখন জানালেন, শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে ভারতের কাছে অনুরোধ করেছেন। তাঁর এই বক্তব্য অসাংবিধানিক, রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।’#
পার্সটুডে/আব্দুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/২০
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।