ইসলাম ধর্ম সাম্প্রদায়িক হওয়ার অনুমোদন দেয় না: সৈয়দ আবুল মকসুদ
https://parstoday.ir/bn/news/bangladesh-i25339-ইসলাম_ধর্ম_সাম্প্রদায়িক_হওয়ার_অনুমোদন_দেয়_না_সৈয়দ_আবুল_মকসুদ
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র সহসভাপতি ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, কোনো ধর্ম বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম সাম্প্রদায়িক হওয়ার অনুমোদন দেয় না।
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
নভেম্বর ১০, ২০১৬ ১৭:০১ Asia/Dhaka

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র সহসভাপতি ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, কোনো ধর্ম বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম সাম্প্রদায়িক হওয়ার অনুমোদন দেয় না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে যা ঘটছে তাতে দুর্বৃত্তরা ধর্মের নাম ব্যবহার করছে। নাসিরনগরে হিন্দুদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে না পারার দায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার মন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উচিত তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ করা। তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনার জন্য মূলত আমাদের নষ্ট রাজনীতিকে দায়ী করেন। রেডিও তেহরানের সঙ্গে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। আর সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ, বাংলাদেশে গত কিছুদিন ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের কিছু ঘটনা ঘটেছে। সামগ্রিক পর্যালোচনায় কেন এসব ঘটনা ঘটছে বলে আপনার মনে হয়?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, আপনি ঠিকই বলেছেন, বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের ঘটনার পেছনে মূলত দায়ী আমাদের নষ্ট রাজনীতি। বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান যে অবস্থা তাতে কোনো ধরনের মূল্যবোধ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চিহ্ন পাওয়া যাবে না। সুতরাং এখানে দুর্বৃত্তরাই এসব করছে। আর তাদের নানাধরনের উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে তাদেরকে আইনের আওতায় আনাটা খুব একটা কঠিন কাজ বলে আমি মনে করি না। কিন্তু আমাদের দেশের সরকার এইসব ঘটনার পেছনে যে দুর্বৃত্তরা রয়েছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনেনি।

আরেকটা বিষয় দেখুন-আমরা সেই বৃটিশ আমল থেকে দেখে আসছি এ দেশে যেসব সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো ঘটনা ঘটছে বা এ ধরনের গোলোযোগ হচ্ছে বা হয়েছে তার পেছনে সাধারনত যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের নেতাকর্মীদের একটা ভূমিকা থাকে।

আমরা ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় দেখেছি-তখন বাংলায় ক্ষমতায় ছিল মুসলিম লীগ। সোহরাওয়ার্দী সাহেব ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তখন সেই দাঙ্গায় তাদের সম্পৃক্ততা ছিল। বিহারে কংগ্রেসের শাসনামলে যে দাঙ্গা হয়েছে তাতে দলটির মদত ছিল। নোয়াখালীতে যে দাঙ্গা হয় তখন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সেই দাঙ্গায় মদত দেয়। সুতরাং বাংলাদেশে এখন যে ধরনের ঘটনা ঘটছে তাতে সরকারি দলের মদত-সমর্থন বা যোগসাজশ ছাড়া এই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে না।

রেডিও তেহরান: সাম্প্রদায়িক যেকোনো ঘটনার সঙ্গে ধর্মের একটা যোগসাজশ দেখানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু আসলে কোনো ধর্ম কী এভাবে মানুষকে সাম্প্রদায়িক হওয়ার অনুমতি দেয়?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: না, এককথায় বলা যায় কোনো ধর্মই সাম্প্রদায়িক হওয়ার অনুমতি দেয় না। আর ইসলামে এ ধরনের কোনো বিধান নয়। আসলে ধর্মকে তারা ব্যবহার করছে। কোনো ধার্মিক লোক এ ধরনের কাজ করে না।  আসলে ধর্ম আর ধর্মাবলম্বী এক বিষয় নয়।

এখানে নাসিরনগরে হিন্দুদের মন্দির ভাঙচুর, বাড়ি ঘরে আগুন দেয়ার যে সহিংসতা দেখছি বছর দুয়েক আগে রামুতেও এ ধরনের ঘটনা দেখেছি। এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে চাইলে একটা অজুহাত লাগে। রামুতেও অজুহাত হিসেবে বলা হয়েছে ধর্ম অবমাননা এখানে নাসিরনগরেও একই কথা বলছে যে ধর্ম অবমাননা করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ধর্ম অবমাননার মতো কোনো ছবি যদি কেউ পোস্ট করে থাকে সেক্ষেত্রে তাকে তো আইনের আওতায় আনা যেত। কিন্তু তা না করে নিরীহ মানুষের ওপর হামলা, তাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর-আগুন লাগিয়ে দেয়া, মন্দিরে আঘাত করার মতো ঘটনা তো সম্পূর্ণ ফৌজদারি অপরাধ। এরসাথে যদি কেউ ধর্মকে মেলানোর চেষ্টা করে সেক্ষেত্রে আমি বলব সেটা একেবারেই অনুচিত হবে। এটা সম্পূর্ণভাবে মারাত্মক  ফৌজদারি অপরাধ।

রেডিও তেহরান: সংখ্যালঘুদের বিষয়ে ধর্মের বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের কী ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, ইসলাম ধর্মের অর্থই হচ্ছে শান্তি। ফলে সংখ্যালঘুদের ওপর এ ধরনের হামলা বা আক্রমণের অনুমোদন করা তো দূরের কথা-কোনো মুসলমান কাউকে এধরনের কাজ করতে দেবে না। বরং মুসলমানরা এ ধরনের ঘটনাকে আরো প্রতিহত করেন। আর এই প্রতিহত করার জন্য যদি কোনো মুসলমানের জীবনও যায় তবুও তাতে সে পিছপা হবে না। এ ধরনের ঘটনা অনেক আছে। ভিন্ন ধর্মের লোকদেরকে এ ধরনের দাঙ্গা হাঙ্গামার হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে অনেক মুসলমানের জীবনও চলে গেছে।

নাসিরনগরে দ্ত্ত বাড়ি নামে একটি বাড়ি দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা করেছে একজন মুসলমান। আরেকটা বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে- আমাদের সংস্কৃতি হচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ফলে নাসিরনগরের ঘটনা প্রতিহত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেউ যায়নি বরং তারা মদত দিয়েছে। আর রাজনৈতিক নেতাদের কথা আর কি বলব বলুন..

আমি সম্প্রতি একটা টেলিভিশন চ্যানেলে টকশোতে বলেছি, যদি আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হতাম বা ঐ এলাকার মন্ত্রী হতাম তাহলে এরকম একটি ঘটনা থামাতে না পারার কারণে পদত্যাগ করতাম।

এ প্রসঙ্গে বলব, আমাদের নাসিরনগর এলাকার যে স্থানীয় মন্ত্রী আছেন তার উচিত ছিল ওই ঘটনায় এলাকার মানুষকে রক্ষা করতে না পারার দায় কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করা। কিন্তু তিনি তা করেন নি। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘটনা ঘটার ৭ দিন পর গতকাল গিয়ে সেখানে বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি যে কথাবার্তা বলেছেন তাতে সংখ্যালঘু তো দূরের কথা সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষও সন্তুষ্ট হতে পারেনি।

এদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কেউ কোনো দায় নিতে চায় না। আর আমাদের দেশে যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে তাতে মন্ত্রী হওয়াটা একটা ব্যবসা বিশেষ। মন্ত্রীদের যদি নৈতিক বল ও গণমুখী চেতনা থাকত তাহলে নাসিরনগরের ওই ঘটনার পর মন্ত্রী তাৎক্ষণিক না যেতে পারলেও পরে গিয়ে পদত্যাগ করতে পারতেন। তিনি হিন্দুদের কাছে এ ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইতেন। তিনি বলতেন- এমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা থেকে আমি আপনাদের রক্ষা করতে পারিনি বিধায় আমি পদত্যাগ করলাম। সে কাজটি তিনি করেন নি। সুতরাং এখনকার ঘটনাগুলো আসলে সুবিধাবাদি ও নষ্ট রাজনীতি ফলশ্রুতি।

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশের নাসিরনগরের ঘটনায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন। ভারতের এই উদ্বেগকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, এটার  সাথে আসলে উপমহাদেশের রাজনীতি জড়িত। এখানে যদি হিন্দুদের ওপর ঘটনা না ঘটে অন্য কারো ওপর ঘটতো বা অত্যাচার হতো তাহলে সুষমা স্বরাজ এ কথা বলত না। যদি বৌদ্ধদের ওপর অত্যাচার হতো যেমন রামুর ঘটনার কথা বলা যায়। সেখানে তো ভারতের পক্ষ থেকে এধরনের কোনো উদ্যোগ দেখা যায় নি। রামুর ঘটনা ঘটার পরই আমি সেখানে গেছি, ড. কামাল হোসেন গেছেন এবং পরে প্রধানমন্ত্রী ওখানে ভিজিট করেন।

তবে দেশের ভেতরে এ ঘটনার ব্যাপারে দায় দায়িত্ব এ দেশের সরকারের। এখানে সুষমা স্বরাজ কি বললেন না বললেন সেটা বড় কথা নয়- এর দায়িত্ব সরকারের। আমাদের সরকারের উচিত ছিল দেশের নাগরিকদের জানমাল রক্ষা করার ব্যবস্থা নেয়া।  কিন্তু আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে আমরা সেধরনের তৎপরতা দেখিনি।

তারপরও আমি বলব এখনও সময় আছে-যারা এই ঘটনার সাথে জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা। তবে সেটা ভারতের কথা মতো আমাদের সরকার করবে এমনটি হলে তা আমাদের জন্য গৌরবের নয়। যদিও ভারত আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখতেই পারেন। তবে এখানে তাদের নাক গলানোর বিষয় নয়; তবে হিন্দুদের ওপর হয়েছে বলেই হয়তো তারা এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১০